শনিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১১:৪৩ অপরাহ্ন

হক ও বাতিলের লড়াই যুগে যুগে

-মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ|

হক বাতিলের দন্দ চিরন্তন। বাতিল যে রূপেই এসেছে আল্লাহ হককে আরো শক্তিশালী করে প্রেরণ করেছেন। বাতিল যুগে যুগে নানান চটকদার নাম আর রূপে আল্লাহর বান্দাদের সীরাতে মুস্তাকীমের পথ থেকে বিচ্যুতি করতে এসে হাজির হয়েছে। বর্তমান যুগে উম্মতে মুহাম্মদীকে “ما أنا  عليه و أنا أصحابي”  তথা আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত থেকে বিচ্যুতি করতে নব্য বাতিল ফেতনা হিসাবে আবির্ভাব হয়েছে “ইমারত বিরোধী আলমী শূরা”।  এভাবেই নিকট অতীতে বাতিল এসেছিল চটকদার ” দ্বীনে এলাহি” নামে। কিন্তু বাতিল যে নামেই আসুক তারা সত্যের সামনে মিথ্যা নিয়ে বেশিদিন ঠিকতে পারে নাই। আল কুরআনে আল্লাহর ঘোষণা- جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوْقًا ‘সত্য সমাগত হয়েছে এবং মিথ্যা অপসৃত হয়েছে; মিথ্যা তো অপসৃত হওয়ারই বিষয়’ (সুরায়ে বনি ইসরাঈল  ৮১)। তাই সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব চিরকালীন। কিন্তু মিথ্যার পরাজয় অবশ্যম্ভাবী।

 

আর বাতিল কী? মিথ্যা কী?  হক বাতিল চিনার পথ ও পদ্ধতি কী? এবিষয়ে মহান আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন,

 

وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوْا ‘

আর রাসূল তোমাদের জন্য যা নিয়ে এসেছেন, তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা করতে নিষেধ করেছেন তা হতে বিরত থাক (হাশর ৫৯/৭)।  এখন রাসুলের ত্বরীকা ও সীরাতে সাহাবার বাহিরে যে নতুন পথ ও পদ্ধতি আসবে তাই বাতিল। আর সীরাত ও সুন্নাহকে আকড়ে থেকে আল্লাহ ও তার রাসুলের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করাই হল হক। রাসুল সা. বলেছেন, “ما أنا  عليه و أنا أصحابي”   তোমরা আমাকে ও আমার সাহাবাদেরকে অনুসরণ কর। এর বাহিরে হলেই বাতিল। আর এর সাথে সামাঞ্জস্য মেহনতই হল হক।

 

যুগে যুগে যখনি বাতিল নব্য কৌশলে এভাবে জগদ্দল পাথরের মতো মানুষের উপর চেপে বসতে চেয়েছে তখনি আল্লাহ তাআলা তার নির্বাচিত মাহবুব বান্দা ও দুস্তদের দিয়ে বাতিলকে পরাস্থ করেছেন। ইতিহাস থেকে আমাদের সেই শিক্ষা নিতে হবে। হক আসে ভয়কর স্লাইকোন, সিডর আর টনেডো হয়ে। আর বাতিল ধীরে ধীরে যখন উদ্ভাসিত হতে থাকে একদিন হকের কাছে বাতিল নাস্তেনাবুদ হয়ে যায়। হকের আগমনে বাতিলের লজ্জাষ্কর বিতাড়ন সংক্রান্ত অসংখ্য ঘটনায় ইসলামের ইতিহাস ভরপুর রয়েছে।

 

আমরা দেখতে পাই যে, যখন দুনিয়ার শুরুতে বাতিল  এসেছে চির অভিশপ্ত ইবলিস শয়তানের রূপ লাভ করে, তখন হক এসেছে হযরত আদম আ: এর রূপ ধারণ করে।  যকন বাতিল এসেছে হস্তরেখা ও জ্যোতিষ শাস্ত্র রূপে, তখন হক এসেছে হযরত ইদ্রিস আ. হয়ে। বাতিল এসেছে সুমেরীয় মূর্তি পূজকরী হয়ে, তখন হক এসেছে হযরত নূহ আ. রুপ লাভ করে। বাতিল  এসেছে ক্বওমে আ’দ হয়ে, হক এসেছে হযরত হুদ আ: এর রূপ ধারণ করে। বাতিল  এসেছে সামূদ জাতির নামে তখন হক এসেছে হযরত সালেহ আ. এর রূপ ধরে এসে বিজয় লাভ করেছে।

 

এভাবে নমরূদ যখন বাতিলের তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছিল সমগ্র বিশ্বে, ঠিক সেই মুহূর্তে ইবরাহীম আ. এর হকের আওয়াজে তার সেই বাতিল শক্তি নিঃশেষিত হয়ে গিয়েছিল। তেমনিভাবে ফেরআউনের বাতিল শক্তি নিঃশেষিত হয়েছিল হযরত মূসা আ. হক নিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে। তারপর বাতিল যখন বনী ইসরাঈলের রক্তপিপাসু রূপ নিয়ে এসেছিল, তখন হযরত ঈসা আ. এর হকের দাওয়াতে তা বিলুপ্ত হয়েছে। বাতিল যখন  আইয়ামে জাহেলিয়াত হয়ে এসেছে ঠিক তখনই আখেরী নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হকের আওয়াজে তা নিঃশেষিত হয়েছে।

 

বাতিল যখন মুসাল্লাতুল কাজ্জাব ও ভন্ড নবীদের রূপ নিয়ে হাজির হয়,  হক তখন হযরত সিদ্দীকে আকবর রাযি এর রূপে হাজির হয়। বাতিল যখন রূম পারস্যের দোর্দণ্ড প্রতাপে সীমা ছাড়িয়ে হাজির হয় তখন হক হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রূপ ধারণ করে হাজির হয়। যখন  বাতিল মুনাফিক আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাহ এবং মোনাফেক গোষ্ঠীর রূপ লাভ করে  হাজির হয় তখন হক হয়ে হযরত উসমান রা.

হাজির হন। বাতিল যখন বিশাল শক্তি ও প্রভাব নিয়ে খারিজী সম্প্রদায় হিসাবে হাজির হয়, তখন হক  হযরত আলী রা: এর রূপ ধারন করে হাজির হয়। বাতিল যখন  কুখ্যাত গভর্ণর উবাইদুল্লাহ বিন জিয়াদের বাহিনী হয়ে হাজির হয়, তখন হক  হিসাবে হাজির হন ইমাম হযরত হুসাইন রা.।

বাতিল যখন হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের রূপে প্রকাশ পেয়েছে তখন হক প্রকাশ পেয়েছে আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা. এর রূপ নিয়ে। সাহাবারা জীবন দিয়েছেন হককে বিজয়ী করারর জন্য কিন্তু মুহুর্তের জন্য বাতিলের সাথে আপোষ করেন নি। আল্লাহ তায়ালা এই কুরবানির বদৌলতে হককে বিজয়ী করেছেন আর বাতিলকে আস্তাখোড়ে নিপাতিত করেছেন।

বাতিল যখন খলীফা মনসূরের রূপে প্রকাশ পেয়েছে, তখন হক এসেছে ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর পোশাক পরিধান করে। যখন বাতিল এসেছে মুতাসিম বিল্লাহর রূপ ধারণ করে তখন হক এসেছে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের রূপে। বাতিল যখন মু’তাযিলী ফেতনার রূপ ধারণ করেছে, তখন আবুল হাসান আশআরী রহ হক হিসাবে হাজির হয়েছেন।শাহ্ আল-জুতী হয়ে যখন বাতিল এসেছে, হক তখন হযরত ইমাম গাযালী রহ. রূপ লাব করে এসেছে।  বাতিল  যখন আক্বীদায়ে ওয়াহদাতুল ওয়াজুদ নামে এসেছে হক তখন, শায়খ মুহিউদ্দীন ইবনুল আরবী রহ. দারণ করে এসেছে। বাতিল তাতারী ফেতনার আকার ধারণ করেছে, হক  তখন আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রহ. এর আকার ধারণ করে নির্যাতনের স্টিমরোলার ডিঙ্গিয়ে হাজির হয়েছে।

নিকট অতীতের প্রতি লক্ষ্য করলেও আমরা হক ও বাতিলের এ ধারাবাহিকতা বিদ্যমান দেখতে পাই। বাতিল “দ্বীনে এলাহি” চটকদার নামে ফেতনার রূপ ধারণ করে আসে, তখন হক এসেছিল হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানীর রূপ নিয়ে। বাতিল যখন ইসনা আশারিয়্যার ফেতনার রূপ নিয়ে এলো তখন হক আসল হযরত শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী রহ. এর রূপ ধারণ করে। বাতিল যখন রাজা রণজিৎ সিং এর আকার নিয়ে এলো, তখন হক এলো শাহ ইসমাঈল শহীদ রহ. এর রূপ ধারণ করে। বাতিল যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রূপ লাভ করেছে, হক তখন হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কীর রূপ লাভ করেছে।  বাতিল যখন শুদ্ধি ফেতনা ও কুসংস্কার আর বেদাতের রূপ লাভ করেছে তখন হক এসেছে হযরতজী মাওলানা মোহাম্মদ ইলিয়াস রহ এর আকার ধারণ করে। বাতিল যখন গোলাম আহমদ কাদিয়ানী হয়ে হাজির র হয়েছে, হক তখন আকাবীরে দেওবন্দের রূপ লাভ করে শক্তি এসেছে।  বাতিল যখন “আলমী শূরার” নব্য ফেতনার আকার ধারণ করে এসেছে, তখন হক এসেছে হযরতজী মাওলানা সাদ কান্ধালভীর রূপ ধারণ করে। যিনি শত বাঁধা আর জুলুমের পাহার ডিঙ্গিয়ে সীরাতে রাসুল সাঃ ও সীরাতে সাহাবা রাযি: এর আলোকে উম্মতকে চুড়ান্ত দিক নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন।

এভাবে বাতিল যখনই তার অস্তিত্ব কায়েম করার অপপ্রয়াস চালিয়েছে, তখনই আল্লাহর কুদরতে সত্য নিয়ে হকের আবির্ভাব ঘটেছে এবং বাতিলের বিনাশ সাধিত হয়েছে। আর এভাবে বাতিলের সাময়িক বিজয় ঘটলেও পরিণতিতে তা বিলুপ্তই হবে, নিক্ষিপ্ত হবে আস্তাকুড়ে।

হকের বিজয়ী হওয়া এবং বাতিলের নির্মূল হওয়ার জন্য শর্ত হল, হকপন্থী মুমিনদের কামিল মুমিন হতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বাতিলের উপর বিজয়ী হওয়ার জন্য যে শর্তসমূহ আরোপ করেছেন, সে অনুযায়ী নিজেদেরকে যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন যে,

وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ

হে মুমিনগণ! তোমরা মনোবল ভেঙ্গ না,  এবং চিন্তিত (দু:খিত) হবে না। যদি প্রকৃত মুমিন হও বিজয় তোমাদেরই হবে। (সূরা আলে ইমরান : ১৩৯)

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!