শনিবার, ০৬ মার্চ ২০২১, ০৯:৩১ পূর্বাহ্ন

আমীরের ইতায়াতে সাহাবাদের পরীক্ষা

আমীরের ইতায়াতে সাহাবাদের পরীক্ষা

সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ

বদরের জিহাদ ছিল উম্মতের ইতায়াতের প্রথম পরীক্ষা। রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে হাজারে ঘাত-প্রতিঘাতের পর মাত্র ৩১৩ জন আনসার আর মুহাজির সাহাবী। সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত এক কাফেলা। ঈমানের বলে বলিয়ান তারা। ১৩ বছর রাসূল তাদের পেছনে ঈমানের মেহনত করে পাহাড়ের মতো সাহাবিদের ঈমানকে তৈরি করেছেন। এখন আল্লাহ পাক তাদের ঈমানের পরীক্ষা নিতে চান। নিতে চান ইতায়াত/আনুগত্যের পরীক্ষা। রাসূলের নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে সাহাবারা ইতায়াতের একটা নজিরবিহীন নজরানা পেশ করলেন। ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, লোক-লস্কর পর্যাপ্ত নেই। পেটে খাবার নেই। পরনে কাপড় নেই। ঘোড়া, কামান, যুদ্ধের বর্ম নেই। নেই বলতে কিছুই নেই। আছে কেবল নবীজীর আনুগত্য। রাসূলের ভালবাসা। আমীরের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালনের এক ঈমানী জজবা। ইতায়াতে পাহাড়সম হিম্মত। নবীজীর নির্দেশে যুদ্ধ কেন! আরো বড় কোন পরীক্ষা এলেও এই কাফেলা অবলীলায় প্রস্তুত। আমীরের নির্দেশে তারা সাগরে ঝাপ দিতে পারেন নিঃসংকোচে, পাহাড়ের চূড়া থেকে চোখের ইশারায় লাফ দিয়ে পড়তে পারবেন কোন প্রশ্ন আর সংশয় ছাড়াই। এমনি এক দুর্বল ক্ষুদ্র ইতায়াতের জামাত তৈরি করেছিলেন ঈমানী মেহনত করে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। বদর দিবসকে স্মরণ করে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেন,‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেছেন বদরের যুদ্ধে। অথচ তোমরা ছিলে দুর্বল। অতএব আল্লাহকে ভয় কর যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পার।’ (আলে ইমরান : ৩/১২৩)।

এই কুরবানীর নজরানার ফলেই মুসলমানদের আল্লাহ পাক গায়েবী সাহায্য করেছিলেন ফেরেশতা পাঠিয়ে। ইতায়াত ওয়ালাদের জন্য মহাপুরস্কার ঘোষণা করেছেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা। এই তিনশ তেরজন ইতায়াতি জানবাজ কুরবানীওয়ালা সাহাবীর জীবনের আগে ও পরের সকল গোনাহকে আল্লাহ মাফ করে দেন। তারা এতোটাই সম্মানীত সাহাবী হন যেন, ৩১৩ জনের নাম পড়ে দোয়া করলে তার কবুল হয়। বদরের কঠিন পরীক্ষার সময় যারা রাসূলের আনুগত্য করে কুরবানী দিয়েছিলেন, তাদের ও পরবর্তী সাহাবীদের মর্যাদা ও ফজিলত একটা নয়। তারা ছিলেন বিশেষ সম্মানী ও মর্যাদাবান। এই আনুগত্যশীল জামাতের কুরবানীর ফলে সহসা মাথা উঁচু করে ভবিষ্যতের নতুন জগতের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপের যোগ্যতা অর্জন করেন মুসলমান। তাই কুরআনে বদর যুদ্ধের দিনকে ‘ইয়াওমুল ফুরকান’ তথা ছাটাই-বাছাইয়ের কষ্ঠিপাথর বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই বদরের অভিযান সাহাবাদের মধ্যে ছাটাই-বাছাই হয়েছিল। কারা ইতায়াতের পরীক্ষায় ঠিকবেঠিক আর কারা আমীরের পাশ থেকে পরীক্ষায় ছিটকে পড়বে। আল্লাহ পাক ৩১৩ জনকে বাছাই করলেন তার দ্বীন বিজয়ের জন্য। রাসূলের আনুগত্যের জন্য। তাদের কুরবানীর ফলে তাদের সম্মানীত করার জন্য। বদর যুদ্ধের পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনছার ও মুহাজির সাহাবাদের একত্র করলেন এবং তাদের সামনে পরিস্থিতি পরিষ্কার করে তুলে ধরলেন। তাদের অভিপ্রায় জানতে চাইলেন। তারা সকলেই রাসূলের সিদ্বান্তকে মেনে নিয়ে শেষ সময় পর্যন্ত রাসূলের সাথে থাকার ওয়াদা দিলেন। তখন মুসলমানদের সংখ্যা ছিলো ৩১৩ জন। সাহাবারা আনসার ও মুহাজিরদের পক্ষ থেকে রাসূলের কাছে আনুগত্য ও ইতায়াতের পূনরায় শপথ নিলেন এবং বাইয়াত হলেন।
হযরত মেকদাদ (রাযি.) মুহাজিরদের পক্ষ হতে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর নির্দেশে আপনি যেখানে খুশি চলুন, আমরা আপনার সাথে থাকবো। আমরা বনী ইসরাইলের ন্যায় এমন কথা বলবো না যে, ‘হে মুসা, তুমি আর তোমার প্রভু গিয়ে যুদ্ধ কর, আমরা এখানে বসে তামাশা দেখি। আমাদের কথা হলো, আপনি আল্লাহর নামে যুদ্ধে চলুন। আমরাও আপনার সাথে যুদ্ধে যাব এবং ততক্ষণ পর্যন্ত লড়তে থাকাবো যতক্ষণ আমাদের চোখের পলকগুলো নড়াচড়া করতে থাকবে।’ আনসারদের পক্ষ হতে হযরত সা’দ বিন মুআ’জ (রাযি.) উঠে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের ব্যাপারে কোন চিন্তা করবেন না। জীবনে, মরণে, সুখে, দুঃখে ছায়ার ন্যায় আমরা আপনাকে অনুসরণ করবো। যেখানে থামতে বলেন সেখানে থামবো। সাগরে ঝাঁপ দিতে বলেন দেব, ডুবতে বলেন ডুববো আর মরতেবলেন মরবো।
এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছিল মুহাজিরদেরকে। এদের প্রতিপক্ষ ছিল আপন ভাই, পুত্র, কারো বাবা এবং অন্যান্য নিকট আত্মীয়-স্বজন। কারো বাপ, কারো চাচা, কারো মামা আর কারো ভাই ও পুত্র ছিল তার তলোয়ারের লক্ষ্যবস্তু এবং নিজ হাতে তাদের হত্যা করতে হয়েছিল এসব কলিজার টুকরাকে। বদর যুদ্ধ ছিল আত্মত্যাগের এক বিরাট নিদর্শন। বদরের যুদ্ধ আরম্ভ হলে দেখা গেল, পিতা পুত্রের বিরুদ্ধে, ভাই ভাইয়ের বিরুদ্ধে, বন্ধু বন্ধুর বিরুদ্ধে দ-ায়মান। আল্লাহ পাক কেয়ামত পর্যন্ত রাসূলের আনুগত্যশীল উম্মতকে শিক্ষা দিলেন, দ্বীনের জন্য কখনো বাবা ছেলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে, ভাই ভাইয়ের বিরুদ্ধে, দীর্ঘদিনের বন্ধু, ইতায়াতের পরীক্ষা দিতে গিয়ে দ্বীনের জন্য তলোয়ার নিয়ে বন্ধুর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। এটি ছিল রাসূলের আনুগত্যের সবচেয়ে কঠিনতম পরীক্ষা। সবচেয়ে কঠিনতম কুরবানী আর আত্মত্যাগ্যের নজরানা। যা কেয়ামত পর্যন্ত আনুগত্যশীল মুসলমান ও মুমিনদের জন্য একটা মহা শিক্ষা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। ইতায়াতের পরীক্ষা কতটা কঠিন হতে পারে, কত নির্দয় ও কুরবানীর হতে পারে, আসহাব বদরীনদের দিয়ে আল্লাহ তায়ালা প্রথম পরীক্ষায় তা দেখিয়ে দিলেন। হজরত আবু বকর (রাযি.) তাঁর পুত্র আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, হুজায়ফা (রাযি.) তার পিতার উপর তলোয়ার চালিয়েছিলেন। এভাবে ৩১৩ জনের প্রত্যেকই তার আপনজনদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। এই কঠিন পরীক্ষায় কেবল তারাই টিকে থাকতে পেরেছিল, যারা সাচ্চা দিলে আল্লাহর সঙ্গে ওয়াদা করেছিল, যে সব সম্বন্ধকে তিনি বজায় রাখতে বলেছেন, তারা শুধু তাই বজায় রাখবে আর যেগুলোকে তিনি ছিন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন – তা যতোই প্রিয় হোক না কেন – তারা ছিন্ন করে ফেলবে।’

কিন্তু সেই সঙ্গে আনসারদের পরীক্ষাও কোনো দিক দিয়ে সহজ ছিল না। এ যাবত আরবের কাফির এবং মক্কার মুশরিকদের চোখে তাদের ‘অপরাধ’ ছিল এটুকু যে, তারা তাদের দুশমন অর্থাৎ মুসলমানদেরকে আশ্রয় দান করেছে। কিন্তু এবার তারা প্রকাশ্যেই ইসলামের সমর্থনে কাফের-মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছে। এর অর্থ হচ্ছে এই যে, তারা তাদের জনপদটির (মদিনা) বিরুদ্ধে গোটা আরবদেরকেই দুশমন বানিয়ে নিয়েছে। অথচ মদিনার জনসংখ্যা তখন সাকুল্যে এক হাজারের বেশি ছিল না । এতো বড় দুঃসাহস তারা এজন্যই করতে পেরেছিল যে, তাদের হৃদয় আল্লাহর ও রাসূলের মুহাব্বত এবং আখিরাতের প্রতি অবিচল ঈমানে পরিপূর্ণ হয়েছিল। নতুবা আপন ধন-দৌলত স্ত্রী-পুত্র-পরিবারকে এভাবে সমগ্র আরব ভূমির শত্রুতার ন্যায় কঠিন বিপদের মুখে কে নিক্ষেপ করতে পারে? ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় আমীরের আনুগত্য হচ্ছে দেহের ভেতর রুহের সমতুল্য। ইতায়াত হেদায়তের দরজা। ইসলামের রুহ। তাই আমীরের আদর্শের পরিপূর্ণ ও নির্ভেজাল আনুগত্যের জন্য মনকে প্রস্তুত করার নিমিত্ত বারবার মুসলমানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলো এই বদর যুদ্ধে। অল্প সাহাবী নবীর নির্দেশে জান দিতে অবলীলায় তৈরি হয়ে গেলেন ইসলামের জন্য। বদরের যুদ্ধ বাহ্যিকভাবে ছিল আত্মঘাতি। কিন্তু ইতায়াতের উপর জমে যেতেই আল্লাহ পাক ফেরেশতা পাঠিয়ে গায়েবী সাহায্য করলেন। যেন একথা বুঝিয়ে দেয়া যায়, যে যুগেই যারা এভাবে দ্বীনের জন্য আনুগত্যের কঠিন পরীক্ষা দিতে প্রস্তুত হবে, আল্লাহ পাক তাকে আসহাব বদরীনদের মতোই গায়েবী সাহায্য করবেন।
সম্মানিত পাঠক! আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশত বছর পূর্বে মক্কার আকাবা পাহাড়ের সুড়ঙ্গের ঘটনা শুনুন! আমীরের প্রতি ইতায়াতের নির্দেশ দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তোমরা আমার নিকটে এই মর্মে বায়‘আত কর যে, সন্তুষ্টি ও অলসতায় তোমরা আমার হুকুম শুনবে ও ইতায়াত করবে। সচ্ছল ও অসচ্ছলতায় সর্বদা আল্লাহর পথে ব্যয় করবে। সৎ কাজের আদেশ দিবে ও অসং কাজের নিষেধ করবে। সর্বদা আল্লাহর পক্ষে কথা বলবে, কোন নিন্দুকের নিন্দাবাদ পরোয়া করবে না। আমি যখন ইয়াছরিবে (মদীনায়) আগমন করব তখন তোমরা আমাকে সাহায্য করবে। তোমরা যেভাবে তোমাদের নিজেদের, সন্তানদের ও স্ত্রীদের নিরাপত্তা দাও সেভাবে আমাকেও নিরাপত্তা দিবে। (মুসনাদে আহমাদ হা/১৪৪৯৬, ছহীহাহ হা/৬৩)
উবাদা বিন ছামেত রাযি. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,
‘আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাতে ইতায়াতের বায়‘আত নিয়েছিলাম এই মর্মে যে, আমরা আমীরর কথা শ্রবণ করব এবং মান্য করব সচ্ছল অবস্থায় হোক অথবা অসচ্ছল অবস্থায় হোক। আনন্দে হোক অথবা অপছন্দে হোক। সন্তুষ্ট অবস্থায় হোক অথবা অসন্তষ্ট অবস্থায় হোক। আমাদের উপরে অন্যকে প্রাধান্য দেওয়ার ক্ষেত্রে হোক। আমরা নেতৃত্ব নিয়ে কখনোও ঝগড়া করব না। যেখানেই থাকি সদা হক কথা বলব, আল্লাহর জন্য নিন্দুকের নিন্দাবাদকে পরোয়া করব না’। (মুসলিম হা/৪০৭৪; মিশকাত ৩৬৬৬)
৯ম হিজরীর একটি ইতায়াতের ঘটনা :
৯ম হিজরীর রবীঊল আখের মাস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতে পারলেন যে, হাবশার কিছু নৌদস্যু জেদ্দা তীরবর্তী এলাকায় সমবেত হয়ে মক্কা আক্রমণের চক্রান্ত করছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শক্রদের চক্রান্তের কথা ঘোষণা দেওয়ার সাথে সাথেই আলক্বামা তিনশত সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। দ্বীপে পৌঁছে দেখলেন দস্যুরা তাদের খবর পেয়ে পালিয়ে গেছে। আলক্বামা পলাতকদের বিরুদ্ধে আব্দুল্লাহ বিন হুযায়ফাকে সৈন্যসহ প্রেরণ করেন। হুযায়ফা রাস্তায় এক স্থানে অবতরণ করেন। সেখানে তিনি একটি অগ্নিকুন্ড তৈরী করেন এবং তাঁতে সৈন্যদের ঝাঁপ দিতে বলেন। সৈন্যরা ঝাঁপ দিতে উদ্যত হলে তিনি বললেন, ‘থাম! হে সৈন্যগণ! আমি তোমাদের সাথে ঠাট্টা করছিলাম’। মদীনায় এসে একথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানালে তিনি বললেন, ‘যদি তারা আগুনে প্রবেশ করত তাহলে তারা ক্বিয়ামত পর্যন্ত সেখানেই থাকত’। এরপর তিনি বলেন, ‘আল্লাহর অবাধ্যতায় কোন ইতায়াত নেই। ইতায়াত কেবল ন্যায় কর্মে’। (বুখারী হা/৭২৫৭; মুসলিম হা/১৮৪০; যাদুল মা‘আদ পৃঃ ৪৫০)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘ধ্বংস হোক দীনার ও দিরহামের গোলামেরা, যাদেরকে কিছু দিলে খুশি হয়। না দিলে অখুশি হয়। আর জান্নাতের সুসংবাদ ঐ বান্দাদের জন্য, যে তার ঘোড়া নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় সদা প্রস্তুত থাকে। যদি তাকে পাহারা দিতে বলা হয় সে পাহারা দেয়। যদি তাকে পিছনে থাকতে বলা হয় সে পিছনে থাকে। সে ছুটি চাইলে ছুটি দেওয়া হয় না। সে কারোর জন্য সুপারিশ করলে তাও কবুল করা হয় না। তবুও সে আমীরের আদেশে আল্লাহর রাস্তায় সদা প্রস্তুত থাকে’। (মিশকাত, হা/৫১৬৯)
ইতায়াতের অনুপম দৃষ্টান্ত :
দামেশক, জর্ডান, মিশর, মুসলমানদের অধীনে চলে আসলে রোম স¤্রাট রডারিক রাগান্বিত হয়ে তার ভাই থিওডোরাসের নেতৃত্বে আর্মেনীয়, সিরীয়, মিশরীয়, রোমান ও আরব গোত্রীয় খৃষ্টানদের সমন্বয়ে দুই লক্ষ চল্লিশ হাজার সৈন্য নিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইয়ারমুক ময়দানে উপস্থিত হয়। এদিকে হযরত আবুবকর ছিদ্দীক্ব রাযি. খালেদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে ৩৫ হাজার সৈন্য তাদের প্রতিরোধের জন্য প্রেরণ করেন। সৈন্য প্রেরণের পর হযরত আবু বকর রাযি. মৃতবরণ করেন। ওমর ফারূক রাযি. খলীফা হন। তিনি শুনতে পেলেন- মদীনার মুসলমানগণ বলাবলি করছে, যেহেতু খালেদ সাইফুল্লাহ সেনাপতি, তাই জয় সুনিশ্চিত। ওমর ফারূক রাযি. মুসলমানদের গোপন শিরক থেকে রক্ষা করার জন্য এবং বিজয় একমাত্র আল্লাহর হাতে তা প্রমাণ করার জন্য এক ফরমান জারী করলেন।
৬৩৬ খৃঃ ২০শে আগষ্ট ইয়ারমুক ময়দানে তুমুল যুদ্ধ চলছে। খৃষ্টানদের ৭০ হাজার নিহত সৈন্যের রক্ত ও মুসলিম বাহিনীর তিন হাজার শহীদের রক্তে ইয়ারমুক ময়দান লালে লাল। ভীষণ যুদ্ধ, তরবারির আঘাতে যেন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। এমন সময় মুসলিম আমীরের ফরমান খালিদ বিন ওয়ালিদের হাতে। ‘আপনাকে সেনাপতির পদ থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হলো। তদস্থলে আবু ওবায়দা বিন জাররাহকে সেনাপতি নিয়োগ করা হলো’। ফরমান পাঠ মাত্রই সেনাপতির মুকুট খুলে আবু ওবায়দার মাথায় পরিয়ে দিয়ে পূর্বের চেয়ে বিপুল উদ্যমে যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লেন খালিদ বিন ওয়ালিদ। দুই লক্ষ চল্লিশ হাজার খৃষ্টান সৈন্যকে পরাজিত করে মুসলমানদের বিজয় ছিনিয়ে এনে খালিদ বিন ওয়ালিদ আমীরের ইতায়াতের যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ক্বিয়ামত পর্যন্ত মানুষের মনের মণিকোঠায় তা অমর হয়ে থাকবে।
প্রিয় পাঠক! এবার আর্থিক ইতায়াতের দৃষ্টান্ত দেখুন! ৯ম হিজরীর রজব মাসে গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহে মদীনা থেকে ৭৭৮ কিলোমিটার দূরে তাবূক প্রান্তরে অর্ধেক পৃথিবীর একচ্ছত্র অধিপতি রোম স¤্রাটের গোপন ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনের শেষ অভিযান। রোমকদের ৪০,০০০ (হাজার) সৈন্যের বিরুদ্ধে মুসলিম সৈন্য ৩০,০০০ হাজার। যাতায়াতের জন্য ৩০ দিন ও ২০ দিন অবস্থানের জন্য বিপুল খরচের এই অভিযানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিহাদ ফান্ডে দানের ঘোষণা দিলেন। ঘোষণা শোনামাত্র আবুবকর ছিদ্দীক্ব রাযি. তাঁর সমস্ত সম্পদ জিহাদ ফান্ডে জমা দিলেন। বলা হলো তোমার পরিবারের জন্য কি রেখে এসেছ? দৃঢ়তার সাথে উত্তর দিলেন আল্লাহ তা‘আলাও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে। ওমর ফারূক রাযি. তাঁর অর্ধেক সম্পদ নিয়ে এলেন। ওছমান গণী রাযি. ৯০০ উট, গদি ও হাওদা সহ ১০০ ঘোড়া, সাড়ে পাঁচ কেজি স্বর্ণমুদ্রা, ২৯ কেজি রৌপ্য মুদ্রা দান করলেন। এই বিপুল স্বর্ণমুদ্রা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উল্টে পাল্টে দেখছেন আর বলছেন, ‘আজকের দিনের পর কোন আমলই ইবনু আফফানের কোন ক্ষতিসাধন করতে পারবে না’ (মুসনাদে আহমাদ হা/২০৬৪৯)। তিনি তাকে যোগানদাতা খেতাব দেন (مُجْهِزُ جَيْشِ الْعُسْرَةِ)। তাবূক যুদ্ধের রসদ সংগ্রহকালে আছেম বিন আদী ১৩,৫০০ কেজি খেজুর জমা দেন। এ সময় উমায়রাহ দুই ছা‘, আবু খায়ছামা ১ ছা‘, আবু আকিল অর্ধ থলি খেজুর নিয়ে হাযির হন। আবু আকিল বলেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি সারা রাত দুই ছা‘ খেজুরের বিনিময়ে অন্যের জমিতে পানি সেচ করেছি। ১ ছা‘ বাড়ীর জন্য ও এক ছা‘ এখানে এনেছি। আল্লাহর রাসূল বললেন, খেজুরগুলো সমস্ত স্তূপের উপর ছড়িয়ে দাও। তারপর দো‘আ করলেন, ‘আল্লাহ তাতে বরকত দিন যা তুমি এনেছ এবং যা তুমি পরিবারের জন্য রেখেছ’। সবশেষে আব্দুর রহমান বিন আওফ এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! সদক্বাকারী কি কেউ বাকি আছে? আল্লাহর রাসূল বললেন, না। তখন তিনি মোট ৮০০০ দিরহামের অর্ধেক ৪০০০ দিরহাম এনে রাখলেন। আর বললেন, আমি আমার পরিবারের জন্য রাখলাম ৪০০০ দিরহাম এবং আমার প্রতিপালককে ঋণ দিলাম ৪০০০ দিরহাম। আল্লাহর রাসূল খুশি হয়ে দো‘আ করলেন, ‘তুমি যা দিয়েছ এবং যা রেখেছ আল্লাহ তা‘আলাতাতে বরকত দিন’। এভাবে কমবেশী দানের স্রোত চলতে থাকল। মহিলারা তাদের গলার হার, হাতের চুড়ি, নাকের ফুল, পায়ের অলংকার, কানের রিং-আংটি ইত্যাদি যার যা ছিল, তাই খুলে দিয়ে আর্থিক ইতায়াতের চরম দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।
অসুস্থতা, দরিদ্রতা, বাহন সংকট প্রভৃতি কারণে যারা জিহাদে যেতে পারেননি, তারা জান্নাত লাভের এই মহা সুযোগ হারানোর বেদনায় কাঁদতে থাকেন। উলবাহ বিন যায়েদ সারা রাত ছালাত আদায় করেন আর কাঁদেন, হে আল্লাহ! তুমি জিহাদের নির্দেশ দিয়েছ এবং তাতে উৎসাহিত করেছ। কিন্তু আমার তো কিছু নেই, যা দিয়ে আমি তোমার রাসূলের সাথে যাব। হে আল্লাহ! ইসলাম গ্রহণের কারণে আমার উপরে যে যুলুম হয়েছে তার প্রতিটি যুলুমের বিনিময়ে প্রত্যেক মুসলমানের উপর আমার সদকা কবুল কর। ফজরের ছালাতের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবার উদ্দেশ্যে বললেন, আজ রাতে সদকাকারী কোথায়? কেউ দাঁড়াল না। তিন বার বলার পর ঐ ব্যক্তি দাঁড়িয়ে সব ঘটনা বললে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘সুসংবাদ গ্রহণ কর যার হাতে মুহাম্মাদের জীবন, তার কসম করে বলছি, তোমার সদকা আল্লাহ তা‘আলাকবুল করেছেন। অন্য বর্ণনায় আছে, তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। (যাদুল মা‘আদ ৩/৪৬২ সনদ ছহীহ)
জীবন ও সম্পদ সবকিছুর চেয়ে ঈমানের হেফাযতের জন্য আমীরেরর আদেশ পালনে নিবেদিতপ্রাণ হওয়া যে সর্বাধিক জরুরি, তার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত দেখা গেছে তাবূক যুদ্ধের গমনকারী শাহাদত পাগল মুজাহিদগণের মধ্যে। ইসলামী বিজয়ের জন্য সর্বযুগে এরূপ নিবেদিতপ্রাণ আমীরকর্মী একান্তই দরকার।
ইতায়াত ও তওবার এক অনন্য দৃষ্টান্ত :
তাবূক যুদ্ধে ৫০ দিন অতিবাহিত করে বিজয়ী বেশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় ফিরে প্রথমে মসজিদে নববীতে দু’রাক‘আত নফল ছালাত আদায় করে সাধারণ জনগণের সাথে দেখা করার জন্য বসেন। এ সময় ৮০ জন লোক যুদ্ধে গমন না করার জন্য ওযর পেশ করে ক্ষমা নিয়ে চলে যায়। আনছারদের তিন জন শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব স্রেফ সাময়িক বিচ্যুতির কারণে যুদ্ধে গমন থেকে পিছিয়ে ছিলেন। (১) কা‘ব বিন মালেক (২) মুরারাহ বিন রবী‘ (৩) হেলাল বিন উমাইয়া। তারা তিন জন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে গিয়ে সত্য কথা বলে ক্ষমা চান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের ক্ষমার বিষয়টি আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়ে তাদেরকে বয়কট করেন। আপনজন, বন্ধু-বান্ধব, কেউ তাদের দিকে ফিরে তাকায় না। কথাও বলে না, সালাম দিলে জবাব দেয় না। মুখ ফিরিয়ে চলে যায়। এই দুর্বিসহ জীবনে দুঃখ-বেদনায় প্রাণ ওষ্ঠাগত হওয়ার উপক্রম। ৪০ দিনের মাথায় তাদের স্ত্রীগণও তাদের থেকে পৃথক হয়ে পিতার বাড়ী চলে যায়। জীবনের এই সংকটাপন্ন অবস্থায় তারা সর্বদা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে কেঁদে কেঁদে বুক ভাষায়। এমন সময় গাসসান অধিপতি কা‘ব বিন মালেকের নিকটে সহানুভূতি দেখিয়ে পত্র লিখে যে, হে কা‘ব ইবনে মালেক! আমরা জানতে পেরেছি, তোমাদের আমীর তোমাকে উপেক্ষা করেছে, তোমাকে বয়কট করে কষ্ট দিচ্ছে। আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে লাঞ্ছনা ও অবমাননার জন্য রাখেননি, তুমি আমাদের কাছে চলে এসো। আমরা তোমাকে খেয়াল রাখব এবং যথোপযুক্ত সম্মান দিব’। পত্র পড়েই কা‘ব বলেন, এটাও আমার জন্য একটি পরীক্ষা। তিনি পত্রটা জ্বলন্ত চুলায় নিক্ষেপ করে দুনিয়ার সমস্ত সম্মান আল্লাহর হাতে সোপর্দ করে ওয়াসওয়াসা দানকারী শয়তানকে পরাজিত করে আমীরের ইতায়াত ও তওবার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলাতার ইতায়াত ও ধৈর্য দেখে খুশি হয়ে আয়াত নাযিল করেন,
‘আর ঐ তিন ব্যক্তির প্রতি, যারা (জিহাদ থেকে) পিছনে ছিল। অবশেষে প্রশস্ত পৃথিবী তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গেল এবং তাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠল। আর তারা বুঝতে পারল যে, আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত তাদের আর কোন আশ্রয়স্থল নেই। অতঃপর তিনি তাদের প্রতি সদয় হলেন যাতে তারা ফিরে আসে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা তওবা কবুলকারী ও অসীম দয়ালু’। (তওবা ৯/১১৮)। আল্লাহর ক্ষমাপ্রাপ্ত এই তিনজন বিখ্যাত আনছার ছাহাবী হলেন, কা‘ব বিন মালেক, মুরারাহ বিন রবী‘ ও হেলাল বিন উমাইয়া। দীর্ঘ ৫০ দিন পরে তাদের তওবা কবুল হয়। এই দিনগুলোতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সহ সকল ছাহাবী তাদেরকে বয়কট করেন এবং কথাবার্তা ও যাবতীয় লেনদেন বন্ধ রাখেন।
আয়াত নাযিলের সাথে সাথে মুসলমানদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। সকলেই দান-ছাদাক্বায় লিপ্ত হলেন। কা‘ব বিন মালেক বলেন, ‘আমি নিঃসঙ্গভাবে দুঃখ-বেদনায় ঘরের ছাদে বসে বুক ফাঁটিয়ে কাঁদছি। এমন সময় দূর থেকে ভেসে আসল ‘হে কাব বিন মালেক! সুসংবাদ গ্রহণ কর’। কা‘ব বলেন, এ সংবাদ শুনে আমি সিজদায় পড়ে যাই। চারিদিক থেকে বন্ধু-বান্ধব ছুটে আসে অভিনন্দন জানাতে থাকে। আমি দৌড়ে রাসূলের দরবারে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! এ ক্ষমা কি আপনার পক্ষ থেকে না আল্লাহর পক্ষ থেকে? তিনি বললেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! এর শুকরিয়া স্বরূপ আমার সমস্ত সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ছাদাক্বা করে দিলাম’। (বুখারী হা/৪৪১৮; মুসলিম হা/২৭৬৯)
আলোচ্য হাদীছে আমীরেরর প্রতি ইতায়াতের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত পরিস্ফূট হয়ে ওঠেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও ছাহাবীদের বয়কট সত্ত্বেও তারা বিদ্রোহ তো দূরে থাক সামান্যতম বিরোধিতা বা সমালোচনারও দুঃসাহস দেখাননি। এমনকি এ সময়ে গাসসান অধিপতির লিখিত লোভনীয় প্রস্তাবকেও আগুণে নিক্ষেপ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইতায়াতের উপর দৃঢ় থেকেছেন। আর মহান আল্লাহর কাছে কেঁদে কেটে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।
পরিশেষে বলব, অনুকূল-প্রতিকূল যেকোন অবস্থাই হোক না কেন আমীরের প্রতি ইতায়াত বজায় রেখে দাওয়াতী কাজ করে যেতে হবে। এতে পার্থিব ও পরকালীন জীবন কল্যাণময় হবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা ও ইতায়াত বজায় রাখার তাওফীক্ব দান করুন-আমীন!

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com