শনিবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৯, ০৫:০১ অপরাহ্ন

ভুল সংশোধনের নববী তরীকা : মাওলানা সাদ কান্ধলবী দা.বা.

হামদ ও সানার পর, এটা কবুলিয়তের মেহনত, কাবিলিয়তের মেহনত নয়। যোগ্যতার দ্বারা এই কাজ হবে না বরং গ্রহণযোগ্যতার দ্বারা হবে। কাজ করানেওয়ালা যাকে গ্রহণ করবেন, কবুল করে নিবেন সেই কাজ করতে পারবে। তাই দাওয়াতের এই মেহনতের দ্বারা নিজেকে কবুল করাতে হবে। একাজের উদ্দেশ্য হল, আমি আমাকে আল্লাহর দরবারে কবুল করাব।
আম্বিয়াদের আ. আল্লাহ হিকতে কবুলিয়াত দিয়ে পাঠিয়েছেন। নবীদের কবুল করে আল্লাহ নির্বাহিত করে কাজ দিয়েছেন। তবুও আল্লাহর তার মকবুল বান্দাদের কাজের উপর পরীক্ষা নিয়েছেন। কবুল হওয়ার জন্য দুনিয়াবী কোন ডিগ্রী পদ মর্যাদা প্রভাব, মাল- দৌলত বা ( ছেলাহিয়ত) যোগ্যতার দরকার নেই। দরকার কিছু গুণের। এই গুণগুলো হলো আমি কবুল হব। এই কবুলিয়াতের গুণের উপর আল্লাহ আমাদের পরীক্ষা নিবেন। আল্লাহ ……….. থেকেই এই পরীক্ষাগুলো নিয়েছেন।
আল্লাহ প্রথম পরীক্ষা নিয়েছেন ফেরেশতাদের। ২য় পরীক্ষা নিয়েছেন আম্বিয়া আ.। ৩য় পরীক্ষা নিয়েছেন উম্মতের।

ফেরেশতাদের পরীক্ষা
আল্লাহ যে গুণের জন্য প্রথম পরীক্ষা নিয়েছেন, তা হল আনুগত্য বা এতায়াতের পরীক্ষা। এতায়াত দ্বীনের বুনিয়াদ। এটাই ইসলামের আসল। এবাদতের জন্য এতায়াত জরুরী। এতায়াত ছাড়া কোন এবাদত গ্রহণযোগ্য নয়। এতায়াত হেদায়তের দরজা। এতায়াত ইসলামের রুহ।
(১) ফেরেশস্তাদের প্রথম পরীক্ষা : হযরত আদম আ. কে সৃষ্টি করে আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের সামনে ঘোষণা করলেন-
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَىٰ وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ
অর্থ : তোমরা আদমের সামনে সেজদা কর, অত:পর তারা আদমের সামনে সেজদা করলেন, শুধু ইবলিস ছাড়া, সে সেজদা করতে (আনুগত্য প্রকাশে) অস্কিকার করল এবং অহংকার করল এবং সে নাফরমান দলে শামলি হয়ে গেল। (সূরা বাকারা : ৩৪)
শয়তান সেখানে তার যোগ্যতাকে প্রকাশ করতে চাইল। সে বানানোর দিক থেকে আদম হতে উত্তম। আগুনের তৈরি হয়ে কিভাবে মাঠির মানুষকে সেজদা করবে। এতায়াতের পরীক্ষাতে সে অকৃতকার্য হয়ে মারদুদ হল। আর ফেরেশতারা নিসংকোচে আনুগত্য করে আল্লাহ তায়ালার মাহবুব হয়ে গেলেন।

আম্বিয়াদের পরীক্ষা
(২) আল্লাহ হযরত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামদের কাজের পরীক্ষা নিয়েছেন। নবীরা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। এটা পুরানো সাথীদের বলছি, আপনারা মনোযোগ দিয়ে শুনন, এটা কারে নবুয়ত। নবীওয়ালা মেজাজে একাজ করতে হবে। নবীওয়ালা পদ্ধতিতে এই কাজ চলবে। কাজ করনেওয়ালাদের এটা সবচেয়ে প্রথম বুঝতে হবে, এটা কারে নবুওয়াত। নবীদের উপর যতো হালত এসেছে এটা এই কাজ করনেওয়লাদের উপর আসবে। এজন্য প্রথম কবুল হতে হবে। কবুল হলে পরীক্ষা যতো কঠিনই হোক না কেন, আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে গেলে তা তার জন্য সহজ হয়ে যাবে।
আল্লাহ তায়ালা হযরত ইবরাহীম আ. কে পরীক্ষা নিলেন। তিন লাইনে হযরত ইবরাহীম আ. কে পরীক্ষা নিলেন-
(১) দাওয়াতের লাইনে
(২) জজবার লাইনে
(৩) আহকামাতের লাইনে
ইবরাহীম আ. আল্øাহর মকবুল নির্বাচিত বান্ধা ছিলেন, তাই তিনি পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তার জন্য সমস্ত পরীক্ষা ছিল খুব সহজ। ইবরাহীম আ. কে আল্লাহ পরীক্ষা নিয়েছিলেন। কারণ, তাকে দিয়ে আল্লাহ তায়ালা একটি মিল্লাত, একটি ধর্ম কায়েম করবেন। মুসলিম জাতির পিতা হযরত আদম আ. কে তাই আল্লাহ পরীক্ষা নিলে। কুরআন পাকে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِذِ ابْتَلي‏ إِبْراهيمَ رَبُّهُ بِکَلِماتٍ فَأَتَمَّهُنَّ
যখন ইবরাহীম আ. কে তার কতিপয় বিষয়ে (তার আনুগত্যের/ এতায়াতের) পরীক্ষা নিলেন, অত:পর তিনি পুরোপুরি পূর্ণ করলেন।
(১) ইবরাহীম আ. কে প্রথম তাওহীদের দাওয়াতের লাইনে আল্লাহ পরীক্ষা নিলেন। পরিবেশ, স্রোত, সমাজ, সবকিছুর বিপরীত তিনি তাওহিদের বানী একত্ত্ববাদের দাওয়াত দিতে গিয়ে নানা মসিবতের সম্মুখীন হলেন। তাকে দাওয়াত দেওয়ার অপরাধে নমরুদ আগুনে নিক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নিল। একজন মানুষকে পুড়ানোর জন্য এতো বড় আগুনের কুন্ডুলী তৈরি করলো যে এর উপর দিয়ে কোন পাখি উড়ে গেলে তা পুড়ে ছাই হয়ে যেত।
তাকে আগুনে নিক্ষেপের মুহুর্তে হযরত ইবরাহীম আ. আসলেন, বললেন, আমি কি আপনাকে সাহায্য করতে পারি। আমার সাথে বাতাস ও ফেরেশতা আছেন তারা আগুনকে নিভিয়ে দিবে। তিনি জবাব দিলেন- ‘আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।’ আল্লাহ কোন মাধ্যম ছাড়াই আগুনকে নির্দেশ দিলেন

হে আগুন তুমি আমার ইবরাহীমের জন্য আরামদায়ক হয়ে যাও।
এতো বড়ো কঠিন পরীক্ষায় ইবরাহীম আ. সহজেই পাস করে ফেললেন।

(২) তারপর আল্লাহ তায়ালা হযরত ইবরাহীম আ. কে জজবার লাইনে পরীক্ষা নিলেন। স্ত্রী সন্তানের ব্যাপারে পরীক্ষা নিলেন। সন্তান ………….. মহব্বতের। সন্তান মানুষের শরীরের অংশ হয়ে যায়। আল্লাহর কাছে দোয়া করে সন্তান পেয়েছেন। মানুষ সন্তান চায় দুনিয়ার উত্তরাধিকার হওয়ার জন্য। নবীরা সন্তান চেয়েছেন ইকামতের দ্বীনের জন্য।
সন্তান ভূমিষ্টের পর আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিলেন। তাদেরকে অমুক জন মানবহীন উপত্যকায় রেখে আসুন। ইবরাহীম আ. নিসংকোচ চিত্তে সে হুকুম পালন করলেন। যেখানে রেখে আসার কথা বললেন, সেখানেই রেখে এলেন। কোন যুক্তি দেখালেন না। কোন কম বেশি করলেন না।
মেরে দুস্ত বুযুর্গ এটাই কারে নবুওত। নবীদেরকে আল্লাহ যেভাবে হুকুম হুকুম করেছেন তারা সেভাবেই কাজ করেছেন। কমও করেন নি, বেশিও করেন নি। পুরানো সাথীদের বলছি, এই দাওয়াতের কাজ সেভাবেই করতে হবে। কমও করা যাবে না বেশিও করা যাবে না। যতটুকু বলা হবে ততো…. করা। যেভাবে বলা হবে সেভাবে বলা। নিজের থেকে কম বেশি না করা।
(৩) অত:পর আগ্রহ প্রশান্তি ….. তার হুকুম পালনের ক্ষেত্রে সর্ব্চো পরীক্ষা নিলে। ইবরাহীম আ. এর মহব্বতের সন্তান ইসমাইল। বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে এনেছেন। কিছুদিন পরে নির্দেশ এলো তার প্রিয় সন্তানকে কুরবানী করার। জবের করতে হবে। আল্লাহ ইবরাহীম আ. এর পরীক্ষা নিলেন। আর ইবরাহীম আ. তার সন্তানের পরীক্ষা নিলেন। নবী সন্তান বলে কথা। তিনিও জবাব দিলেন-

ইবরাহীম আ. বড় বড় নবীদের একজন। তার কাছে আল্লাহ বড় বড় পরীক্ষা নিয়েছেন। ইবরাহীম আ. ইসমাইল আ. এর হাত পা চোখ বেধে জবেহ করার জন্য হাতে ছুরি নিলেন। সন্তানের গলায় ছুরি চালালেন। আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশ করার জন্য। জমিন আসমান কেপে উঠলো। কত বড় নির্দেশ, সন্তানের গলায় ছুরি চালানো ইবরাহীম আ. সে পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হলেন সফলভাবে। এভাবে আল্লাহ তায়ালা সকল নবীদের কাছ থেকে পরীক্ষা নিয়েছেন। আল্লাহর নবী শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকেও আল্লাহ তায়ালা নানাভাবে পরীক্ষা নিয়েছেন। নবী সমস্ত পরীক্ষার একশ একশ সফল ও কামিয়াব হয়েছেন।

উম্মতের পরীক্ষা
এতায়াত এর ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালা এই উম্মতকেও পরীক্ষা নিয়েছেন। এতায়াতের সাথে উজতেমায়িত জরুরী। ইজতেমায়িত না থাকলে এবাদত করার পরেও আল্লাহর সাহায্য গাইবী মদদ ও পুসরত বান্দার কাছে আসবে না। আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার জন্য এতায়াতের সাথে ইজতেমায়িত প্রয়োজন। এজন্য আল্লাহ পাক কুরআন পাকে এরশাদ করেছেন-
০০০
তোমরা শক্তভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমার রজ্জুকে আকড়ে ধর। এতায়াতের পাশাপাশি আল্লাহ তায়ালার সাহাবাদের ইজতেমায়িতের পরীক্ষা নিয়েছেন। …….. বান্দা কোন দিকে ধাবিত হচ্ছে। মসিবতের সময় সে কোন দিকে যাচ্ছে কার দিকে ছুটছে। নবীর আনুগত্য কতটুকু করছে, না সে পরীক্ষার পরে আনুগত্য / এতায়াত ছেড়ে অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। হযরত সাহাবা রা.দেরকে আল্লাহ তায়ালা নবীর আনুগত্য ও ইজতেমায়িতের উপর পরীক্ষা নিয়েছেন। তারাও সে পরীক্ষায় সফল হয়েছেন।
হুজুর সা. বলেছেন আমি সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য আসে নি। সম্পর্ক জুড়ানোর জন্য এসেছি। এক সাহাবী ছিলেন। মদীনাতে যাদের বাপ- বেটার মহব্বতের সীমা মশহুর ছিল। বাবা যেমন ছেলের প্রতি সীমাহীন মহব্বত ছিল। তেমনি সন্তানেরও পিতার প্রতি এক প্রবল টান ছিল। ছেলেটি রাসূল সা. এর দরবারে প্রায়ই আসতো। একদিন হুজুর সা. হাতে তালোয়ার দিয়ে বললেন, যাও, তোমার বাবার গর্দানটি কেটে নিয়ে আস। বলার সাথে সাথেই তলোয়ার নিয়ে ছেলেটি দৌড় দিল। হুজুর সা. পেছন থেকে ডাক দিলেন। দাড়াও। তুমি কোথায় যাচ্ছ! ছেলেটি বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ আপনি না বললেন, আমার বাবার গর্দান কেটে আনতে? আমি আমার বাবার গর্দান কাটার জন্য যাচ্ছি। কসম খোদার আমার কাছে আমার পিতা-মাতা এবং নিজের চাইতে আপনার হুকুম প্রিয়।
রাসূল সা. বললেন, ঠিক আছে গর্দান কাটতে হবে না। তুমি পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ।
ভাই দোস্ত, বুযুর্গ, এটাকেই বলে আনুগত্য। নিসংকোচে মেনে নেয়া। নিদ্বির্ধায় এতায়াত করা। যার দ্বীলে এতায়াত আছে সে হেদায়াত পাবে। এতায়াত ছাড়া হেদায়াত আসবে না। এতায়াত ……… হবে ইজতেমায়িতের সাথে। বিছিন্ন হওয়া যাবে না। সাহাবাদের আল্লাহ এতায়াত ও ইজতেমায়িতের পরীক্ষা নিয়েছেন।

ঘটনা
হুজুর সা. ইসলামের প্রথম যামানার সাহাবাদের নিয়ে আল্লাহর হুকুমে বায়তুল মোকাদ্দসের দিকে কিবলা করে নামাজ পড়লেন।
সাহাবাদের নিয়ে চার রাকাত নামাজ পড়লেন। বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে কিবলা করে দু’রাকাত নামাজ পড়েছেন এমন অবস্থায় নামাজের মাঝে ওহী নাজিল হল।
০০০০
রাসূল সা. সাথে সাথে নামাজ অবস্থায় কিবলা পরিবর্তন করে ফেললেন। সাহাবারাও নামাজ অবস্থায় সে দিকে ঘুরে গেলেন। নবীর এই অবস্থায় নামাজের ঘুরে যাওয়াতে তারা নামাজ ভঙ্গ করলেন না বা নামাজের পরেও কোন এশকাল করলেন না কেন আপনি নামাজে এমন করলেন? কেন কেবলা পরিবর্তন করলেন। এটাকেই বলে আনুগত্য ও ইজতেমায়িত।
সাহাবা রা. আনুগত্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে গেলেন। আল্লাহর হুকুম স্বভাবত সমাজ, পরিবেশ, রুচি স্বভাবে ও মেজাজের উল্টো হয়ে থাকে। ইমতেহান বা পরীক্ষা এভাবেই হয়ে। যুক্তির বাহিরে। সাহাবা রা. আনুগত্যের ক্ষেত্রে কোন যুক্ত পেশ করেন নি। যখন যেভাবে রাসূল বলেছেন তারা সেভাবেই বুঝে না বুঝে নবীর আনুগত্য করেছেন। আর এই এতায়াত করতে হবে দুই জিনিষকে সাথে নিয়ে।
(১) সবর
(২) তাহাম্মুল (নিরবে বরদাশত করা)
এতায়াত যেমন এই কাজের রূহ তেমনি সবর ও বরদাশত করা এই কাজের জরুরী বিষয়। গাড়ীর জন্য যেমন ইঞ্জিল প্রয়োজন এই কাজের জন্য তেমনি সবর ও তাহাম্মুল দরকার।

ঘটনা
ইহুদীদের মতো মাত্র ৭/৮ জন মানুষ রাসূল সা. এর হাতে ইসলাম কবুল করেছিল। ইহুদী আলেমরা রাসূল সা. কে এভাবে চিনত যেমন পিতা-মাতা তার সন্তানকে চিনত। ইহুদী আলেম যায়েদ বিন ছানা হুজুর সা. এর কাছে এলা। সে তাকে দেখেই চিনে ফেলল যে তিনিই শেষ নবী মুহাম্মদ সা.।
তাওরাতের তার যে বর্ণনা আছে তা তার সাথে রয়েছে। বানানে ওয়ালা আর বর্ণনা দিয়েছেন তার ছেয়ে নিখুত বর্ণনা আর কে দিতে পারবে। কিন্তু যায়েদ বিন ছানা মনে মনে বলল, আরেকটি পরীক্ষা বাকী রয়ে গেছে। তাওরাতে আছে শেষ নবী মুহাম্মদ সা. সবর ও বরদাশত করনেওয়ালা হবেন এটা হবে তার বড় একটি গুণ। হুজুর সা. এক জামাত পাঠাবেন। তাদের কিছু অর্থের প্রয়োজন। তিনি বললেন, কেউ কি তাদের সাহায্য করতে পারবে। কেউ জবাব দিলেন। নবীজী বললেন, কেউ কি তাদের জন্য আমাকে খরজা দিতে পারবে। মজলিসে উপস্থিত ছিল জায়েদ বিন ছানা। সে ভাবলো পরীক্ষা করার এটাই সবচেয়ে বড় সুযোগ। সে রাজী হয়ে গেলো যে আমি খরজ / ঋণ দিতে প্রস্তুত আছি। সে একটি স্বর্ণের টুকরো দিয়ে বললো, এর বিনিময়ে এতো দিন পরে আপনি আমাকে এতো পরিমাণ খেজুর দিয়ে দিবেন।
দিন তারিখ ঠিক হল। রাসূল সা. খরজা গ্রহণ করলে। খরজা আদায়ের নিদৃষ্ট দিনের তিন দিন পূর্বেই জায়েদ বিন ছানা এসে হুজুর সা. এর জোব্বার বুকে খামছে ধরে তাকে দেয়ালের সাথে মাথায় চাপ দিল। আর বলতে থাকলো, তুমি আরো তিনদিন পূর্বে আমার ঋণ পরিশোধ করার কথা। তিনদিন পেরিয়ে গেছে এখনো কেন খরজা আদায় করছোনা? বল কেন আমার ঋণ দিচ্ছনা। হুজুর সা. বললেন, সময় তো আরো তিন দিন বাকী। সে বললো মিথ্যা কথা। এমন সময় হযরত উমর রা. সে স্থানে পৌছলেন। খাত থেকে তলোয়ার বের করলেন। বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সা. আপনি অনুমতি দিন, আমি তার গর্দান ফেলে দেই। জায়েদ বিন ছানা রাসূল সা. কে ছেড়ে দিল। মোহাম্মদ সা. বললেন, উমর তুমি তাকে নিয়ে যাও এবং তার প্রাপ্য খেজুর বুঝিয়ে দিও। আরো বিশ ছা বেশি দিবে।
হযরত উমর রা. তাকে তার খেজুরের অংশ মেপে দিলেন, সাথে আরো বিশ ছা বেশি দিলেন। জায়েদ বিন ছানা বললেন, আপনি বেশি কেন দিচ্ছেন। হযরত উমর রা. জবাব দিলেন, তোমাকে আমি হুকমী দিয়েছি গর্দান ফেলে দেয়ার তাই নবজী সা. তোমাকে খুশি করতে মাপে আরো বিশ ছা বেশি দিতে বলেছেন।
ভাই দোস্ত বুযুর্গ! পুরানো সাথীদের খাছ করে বলছি, হুজুর সা. হযরত উমর রা. কে যা বলেছেন তা আমাদের শিক্ষা দিয়ে গেছেন।
কাজ করনে ওয়ালা নিজের লোকদের নিরুৎসাহিত করতে হবে যেন তাদের জজবা তৈরি না হয়। আর অন্যকে উৎসাহিত করতে হবে। কেউ কষ্ট দিলে, অন্যায়, অবিচার বা জুলুম করলে তার প্রতি এহসান বা দয়া কর। যারা বিজা…. তাদের আপন কর। মর্যাদা দাও। এহসান কর। উম্মত এহসান থেকে তৈরি হয়েছে। ইনতেকাম বা বদলা থেকে বনে নি।
দাওয়াতের কাজের সাথীদের উপর অন্যায় জুলূম অবিচার, মিথ্যা তুহমত, বা এসংলগ্ন কোন কথা উঠলে তোমরা তাদের উপর এহসান কর। তাদের মহব্বত কর। বুকে আগলে নাও। তাদের প্রাপ্য থেকে বেশি দয়া এহসান ও একবাস কর। এটাই নববী তরীকা। রাসূল সা. তার উপর কোন অন্যায়ের প্রতিশোধ গ্রহণ করেন নি। ক্ষমা করে দিয়েছেন।
তাই কাজ করনেওয়ালাদের প্রথম এটা ভাল করে বুঝতে হবে এটা নবীওয়ালা কাজ। সবর ও বরদাশত এটা আলামতের নবুওত। রাসূল সা. ও সাহাবাদের মেজাজে বদলা নেয়ার কোন জজবা ছিল না। সেই মেজাজের সাথেই দাওয়াতের মেহনত করতে হবে। সমালোচকদের সমালোচনার পেছনে পড়া যাবে না। আখলাকের পেছনে দৌড়তে হবে। হুসনে আখলাকের মাধ্যমে একাজের বিরোধীতাকারীদের বুকে টেনে নিতে হবে। উম্মতকে কাজের সাথে জুড়তে হবে। তাদের সাথে ঝগড়া করে উম্মতকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। সবর ও বরদাশত না করতে পারলে ঝগড়া হবে। উম্মত দূরে সরে যাবে।
সে সবর করতে পারবে, বরদাশতের সাথে চলতে পারবে সে কাজ করতে পারবে। নিজেও এই কাজের সাথে জুড়তে উম্মতকেও এই কাজের সাথে জুড়াতে পারব।
কোন ফেৎনা, কোন মুশকিল, মসিবতে, সবরের চেয়ে উত্তম বড় কোন দরজা নেই। দা’য়ীর জীবনে সবর … (অভ্যাস) হবে। নিরবে বরদাশত করতে হবে। কোন শেকায়াত করা, পাল্টা পরীক্ষা করা চলবে না। সবর ও তাযাম্মুল না হলে কেউ একাজে ঠিকতে পারবে না। সবর ও বরদাশত করতে না পারলে সেও ধ্বংস হবে কাজকেও ধ্বংস করবে।
এজন্য আম্বিয়া আ. তায়াম্মুল (বরদাশত) ও সবরের জন্য বকরী ছড়িয়েছেন। বকরীকে শায়েস্তা করলে তার উপর চড়াও হলে চলবে না। বকরীদের তারা কোন শাস্তি দেন নাই। কারণ বকরী দুর্বল প্রাণী।
প্রতিশোধের জজবা একাজে থাকবে না। শেকায়াত করা যাবে না। তর্ক-বিতর্ক করা চলবে না। এটা এই কাজের মেজাজ। হুজুর সা. উমর রা. কে বলেছেন উমর তুমি এটা কি করলে। তুমি কেন জায়েদ বিন ছামার গর্দান উড়িয়ে দেয়ার কথা বললে? বরং তুমি এটা বলতে আমি যেন তার প্রাপ্য আদায় করে দেই, আর সে যেন এমন আচরণ না করে।” তাই তার উপর তুমি রহম কর। তার কষ্ট দেয়ার বদলায় তার উপর এহসান কর। তাকে আরো বেশি দিয়ে দাও।
প্রতিশোধের দ্বারা ইসলাম ঠিকবেও না ছড়াবেও না। ইসলাম ছড়াবে দয়ার দ্বারা। রহমের দ্বারা। মহব্বত আর এহসানের দ্বারা।
নবীওয়ালা কাজকে যারা স্থায়ী কাজ বানাবে, তাদের কাছ থেকে আল্লাহ এভাবে সময়ে সময়ে পরীক্ষা নিবেন। সামনে নানা হালত আসবে। নানা ঝড় ঝাপটায় তাদের পড়তে হবে। তখন সবর ও তায়াম্মুলকে সাথে নিয়ে চলতে হবে। কারো সাথে টাক্কর দেয়া বা বদলা নেয়া যাবে না।
সবর ও তায়াম্মুলের সাথে তাকওয়া ও থাকতে হবে। সবর ও তাকওয়ার কারণে আল্লাহ তায়ালা হযরত ইউসুন আ.কে বাদশাহী দান করেছিলেন।
হযরত ইউসুফ আ.এর ভাইরা তাকে কুয়াতে নিক্ষেপ করেছেন। ……….. বিক্রি করেছে।
তিনি সকল হালতে সবর ও তাকওয়ার উপর চলেছেন। কুরআন পাকে আল্লাহ তায়ালা এই উম্মতকে হযরত ইউসুফ আ.এর সবর ও তাকওয়ার ঘটনা শুনিয়েছেন। যাতে এই উম্মত সবর ও তাকওয়ার সাথে চলতে পারে। হযরত ইউসুফ আ. মিশরের বাদশা হলেন। ……… তখন তিনি তার উপর জুলুমকারী ভাইদের বদলা নিতে পারতেন। অবিচারের বদলা দিতে পারতেন। তাদের শায়েস্তা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নি। তিনি সবর করেছেন, বিনিময়ে আল্লাহ দুনিয়াতে আল্লাহর নবী ও বাদশাহী দিয়েছেন। এবং পরকালেও বড় নবীদের সে সম্মানীত স্থান হয়, সেখানে হযরত ইউসুফ আ. থাকবেন।
ভাই দুস্ত, বুযুর্গ- এই কাজে সবর তায়াম্মুল ও তাকওয়া ছাড়া অন্য কোন জায়গা নেই। বিকল্প কোন পথ নেই। এই উম্মতকে হুজুর সা. সবর ও তায়াম্মুলের দ্বারা তৈরি করেছেণ। এই উম্মত প্রতিশোধের দ্বারা হয় নি।
আমাদের উপর কোন মসিবত এলে, কোন পরীক্ষা এলে আমরা সবর, বরদাশত ও তাকওয়ার রাস্তায় দিয়ে বের হয়ে যাব। হুজুর সা. এর সবচেয়ে আপন চাচা। প্রিয় দোস্ত। রস্তের সম্পর্ক যার সাথে। সাইয়্যেদুশ শুহাদা হযরত হামযা রা.। তাকে ওয়াহশি হত্যা করল। হিন্দা তার হাত-পা, নখ, কান, নাক কেটে মুছলা করে গলার মালা পড়ে নাছলো। হযরত হামযা রা. বুক ছিড়ে কলিজা বের করে তা ছিবিয়ে খেল। এর চেয়ে বড় জুলুম, বড় অন্যায়, বড় অবিচার আর কী হতে পারে।
মুহাম্মদ সা. প্রিয় চাচার ক্ষত বিক্ষিত, টুকরো টুকরো লাশ দেখে এতো বেশি কেঁদেছেন যে সাহাবারা রাসূলকে এরা আগে কখনো এভাবে অঝোর দ্বারায় বেহুশ হয় কাঁদতে দেখেন নি। কতটা কষ্ট পেয়ে ছিলেন নবজী। হুজুর সা. তখন কসম খেয়ে বলেন, আমি আমার চাচাজানের হত্যার বদলে ওদের ৭০ জনকে হত্যা করব। এবং মুছলা করব। এরপর আল্লাহ তায়ালা ওহী নাযিল করলেন
০০০০০০০০০
রাসূল সা. কসমের কাফফারা আদায় করে হামযা রা. এর হত্যাকরী ওয়াহশীর নিকট দাওয়াতের পয়গাম পাঠান।
ভাই এটাই হলো দায়ীর আখলাক। তোমার উপর যে জুলুম করবে তাকে তোমার দিকে ঠেনে আনো। তাকে বুকে আগলে নাও। যারা বিরোধীতা করবে, কষ্ট দিবে, অন্যায় জুলূম করবে তাদের কাছে টেনে নিতে হবে। তাদের মর্যাদা দিতে হবে। এটাই হলো ইসলাম।
যে কষ্ট দেয়, তার প্রতিশোধ না নিয়ে তাকে ক্ষমা করে দিতে হবে। মাফ করে দিতে হবে। নবী মেজাজে কাজ করলে কাজ আমার কাছে থাকবে নতুবা ছুটে যাবে। যার সাথে এই মেজাজ এই নববী আখলাক আছে তার দ্বারা আল্লাহ এই কাজ নিবেন। এই কাজের মোকাফারা করো কারো মোযাকারা (আক্রমণ) করে না। হযরত উমর রা. বলতেন, মন্দের আলোচনা করছি। মন্দ খতম করার সবচেয়ে উত্তম পন্থা।
খোদার কসম, ঝগড়া আর সমালোচনার দ্বারা কখনো উম্মত কাজের সাথে জমবে না। এটাক পরিহার করতে হবে। বিবেকহীনদের জবাব দেওয়া যাবে না। তাদের সাথে ঝগড়া করা যাবে না। বুকে টেনে নিতে হবে। সমালোচনার চর্চা করা যাবে না। তাদের লজ্জা দেয়া যাবে না। কোন উম্মতকে তার ভুলের জন্য অপমান করা যাবে না। মাফ করে দিতে হবে। যে মানুষকে মাফ করতে পারবে না সে অন্তর থেকে আল্লাহর কাছে মাফ চাইতেও পারবে না।
ভুল কে না-করে। কোন মানুষই ভুলের উর্ধ্বে নয়। ভুলের উর্ধ্বে নবীরা। মানুষ মাত্রই ভুল হবে। তবে উত্তম মানুষ সেই যে ভুলের উপর জমে না থেকে ভুলকে স্বীকার করে নেয়। এবং সংশোধন করে ফেলে। ভুলের উপর শরমিন্দা হয়ে তওবা করে। ভুল মানুষই করে। আজ ভুল আমার হয়েছে কাল মানুষ হিসেবে ভুল তার হবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভুল করনেওয়ালাকে মাফ করে দিতে হবে। তাকে শরম দেয়া, লজ্জা দেয়া বা অপমান করা যাবে না। হযরত সাহাবায়ে কেরাম রা. তাই বলনে, আমার গোনাহকে ঘৃণাকরি, গুনাহগারকে নয়।
দুটি বিষয় থাকা চাই-
(১) মাফ চাওয়া
(২) মাফ করা।
মাফ করা নবীদের সিফত : হযরতজী মাওলঅনা মোহাম্মদ ইলয়াস রহ. বলনে, গোনাহগার মুসলমান হিসেবে কলিমার খাতিরে সম্মানের দেখার মশক করব। কোন মানুষকে অপমান করা যাবে না। কাউকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা যাবে না। কাউকে অপমান করার অধিকার ইসলামে কাউকে দেয় নি। এটা বহুত বড় অপরাধ। অনেক বড় গুনাহ।
হুজুর সা. বলেছেন, একজন মানুষের মর্যাদা বায়তুল্লাহর চাইতে বিশ। বায়তুল্লাহকে আমরা কত সম্মান করি। একজন মুসলমানের দাম তার ইজ্জত সম্মান সেও বায়তুল্লাহর থেকেও বেশি।
এটা খুব জরুরী জিনিস আমার দ্বারা যেন কেউ অপমানিত না হয় এই কাজ খাতা-ভুল করনেওয়ালাদের দ্বারাই হবে। ভুল হলে সেটাকে উত্তম পন্থায় সংশোধন করতে হবে। তাচ্ছিল্য বা অপমান করা যাবে না। সেও প্রকৃত মুমিন নয়।
রাসূল সা. আরো বলেছেন মুসলমানের মর্যাদার প্রতি লক্ষ করে
০০০০০০০
এটা খুব জরুরী জিনিস আমার দ্বারা যেন কেউ অপমানি না হয়। কোন মুসলমানকে তাচ্ছিল্য করা অনেক বড় গুনাহ।

ঘটনা
হুজুর সা. এর শেষ সফরে আরাফাতের ময়দানে যাবার সময় তিনি একজন সাহাবীর জন্য কাফেলা নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলেন। লোকজন ভাবলো হয়তো খুব গুরুত্বপূর্ণ কোন ব্যক্তি বা কোন বিশেষ পার্সনের জন্য নবীজী এতো অপেক্ষা করছেন। কিছুক্ষণ পর হযরত উসামা বিন যায়েদ রা. এলেন। রাসূল সা. কাফেলা নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন। সেই কাফেলায় ইয়ামানের কিছু লোক ছিল। তারা বিষয়টিকে খুবই তাচ্ছিল্যের সাথে দেখল। এই কালো ছেলেটার জন্য কি নবীজী এতো অপেক্ষা করলেন। কিছু দিন পর ইয়ামনের অধিবাসী এসব লোক মুরতাদ হয়ে গেল। আলেমরা বলেন, তাদের মুরতাদ হওয়ার কারণ এটাও হতে পারে যে, তারা সে দিন নবীজী যার জন্য অপেক্ষা করছিলেন, সেই ছিলেটিকে তাচ্ছিল্য করার পরিণাম এটি। এজন্য কাউকে এনকার করা যাবে না।

ঘটনা
হযরত উমর রা. এর মজলিসে এক লোক পেছনের রাস্তা দিয়ে দুর্গন্ধযুক্ত বায়ু ছাড়লো। হযরত উমর রা. খুব রাগ করলেন। বললেন, কার এতো বড়ো সাহস যে মজলিসকে নষ্ট করে দিয়েছেন। উঠে যাও। অযু করে এসো।
সেখানে হযরত জাবির রা. ছিলেন তিনি বললেন, হে খলিফাতুল মুসলিমীন যে উঠবে সে তো লজ্জা পাবে, অপমান বোধ করবে সবার সামনে। বরং এটা কি উত্তম নয় যে, আমরা সবাই মজলিস থেকে উঠে অযু করে এসে আবার বসি।
হযরত উমর রা. এই প্রস্তাবে খুব খুশি হলেন। আমির হয়েও নিজের রায়কে বাতিল করে জাবির রা. এর প্রস্তাবকে সমর্থন করে বললে। চলুন আমরা সবাই অযুকরে আসি। আরো বললেন, হে জাবির তুমি ইসলাম কবুলের আগেও সর্দার ছিলে ইসলাম কবুল করার পরেও সর্দার রয়ে গেলে।
উম্মতের দোষ, ত্রুটি, কমজোড়িকে প্রকাশ করা এর চেয়ে বড় ফেৎনা আর কিছু নেই। উম্মতের গোনাহকে চুপাও। মুসলমানদের গোনাহকে লুকানো এটা অনেক বড় নকীর বিষয়।
দু’জনের সম্পর্ক জুড়ানোর জন্য মিথ্যা বলাকেও আল্লাহ হালাল করেছেন। তবুও কারো সাথে বিছিন্নতা তৈরি করা যাবে না। খোদার কসম মুমিনের দ্বীলে দ্বিদ্বেষ থাকলে উম্মত তার সাথে জুরবেনা। কেউ ভুল করলে কি করতে হবে? তার সাথে কেমন আচরণ হওয়া চাই, কিভাবে তা সংশোধন করতে হবে তা রাসূল সা. উম্মতকে শিক্ষা দিয়েছেন। একজন মানুষের ভুলকে সংশোধনের নামে পুরো উম্মতের সামনে ছড়িয়ে দেয়ার কোন সুযোগ নেই। আমার জন্য যেন উম্মতের গোনাহ প্রকাশের জড়িয়া না হয়।
কারো কোন ভুল প্রকাশ হয়ে গেলে সেটাকে তাউইল করতে হবে। শিতল বা হালকা করে দিতে হবে। হুজুর সা. এটা করেছেন। হযরত মায়াজে আসলামী রা. এর এসে বললেন ইয়া আল্লাহর রাসুল আমি যিনা করে ফেলেছি। রাসূল সা. বললেন, তুমি মনে হয় স্পর্শ করেছ। তিনি আবার বললেন ইয়া রাসুলাল্লাহ আমি যিনা করেছি। নবীজী সা. বললেন তুমি মনে হয় চুম্বন করেছ।

“এই সত্যের চেয়ে সেই মিথ্যা অনেক ভাল যার দ্বারা ( সে সত্যের) অন্যের দোষ প্রকাশ পায়।
স্বামী স্ত্রীর ঝগড়া মিটানোর আল্লাহ খুশি হন। এদিকে সতর্ক থাকতে হবে, আমার কোন কথায় যেন মানুষের দোষ বের না হয়।
গোমরাহ প্রকাশ হলে, তাবিল করবে। দেখেও না দেখার ভান করবে।
একারণে একব্যক্তির দোষ অন্যের নিকট চর্চা করে বেড়ানো শরীয়তে নেই। আমরা যেন মানুষের দোষ তালাশ করার পেছনে না পরি।
একজন মানুষের মাঝে ১০টি দোষ মভপ্ছ আর একটি গুণ আছে। কিন্তু তা অন্যের কাছে এমনভাবে প্রকাশ করো যেন তার উল্টো। তার মাঝে যেন ১০ টি গুণ আছে একটি দোষ আছে। একটি গুণের প্রশংসা এমনভাবে করতে হবে। এটা করতে পারলেই মানুষ। এটাই নববী মেজাজ। নবীওয়ালা কাজ এই নববী মোকামেই করতে হবে।

ঘটনা
মদীনাতে এক সাহাবীর জানাজা এলো। হুজুর সা. কে জানাজা নামাজ পড়ানোর জন্য খবর দেয়া হলো। হুজুর সা. এলেন, তখন হযরত উমর রা. বললেন ইয়া আল্লাহর রাসূল আপনি এই ব্যক্তির জানাজার নামাজ পড়াবেন না। কারণ সে ভাল মানুষ ছিল না। আমরা চাই না আপনি তার মতো ব্যক্তির জানাজা নামাজ পড়াবেন না।
হুজুর সা. বললেন, উমর কোন মুসলমানের আমল সম্পর্কে প্রশ্ন করার অধিকার তোমার নেই। তারপর জানাজা আগত মুসলমানদের হুজুর সা. বললেন, তোমরা কি তোমাদের ভাইয়ের কোন নেক আমল সম্পর্কে জান? সাহাবা রা. থেকে একজন বললেন, আমি তার একটি আমল সম্পর্কে জানি? তিনি মদীনার পাদদেশে এক রাত এক জামাতের পাহারাদী করে ছিলেন।
হুজুর সা. একথা জেনে বললেন, সে চোখ আল্লাহর রাস্তায় পাহারাদারী করেছে সে চোখ কখনো জাহান্নামের আগুনে পুড়বে না। হুজুর সা. তার জানাজা নামাজ পড়ালেন। নিজ হাতে কবরে লাশকে রাখলেন এবং বললেন দুনিয়ার মানুষ বলছে তুমি জাহান্নামী আর আমি আল্লাহর নবী মোহাম্মদ সা. বলছি তুমি জান্নাতি।
মানুষের দোষকে গোপন করতে হবে। তার ভাল বিষয়ের আলোচনা করতে হবে। তাহলে দুনিয়াতে ভালাইর প্রচার ও প্রসার গঠবে। এটাই ছিল নবীদের মেজাজ। তারা কারো দোষ চর্চা করতেন না। দোষের পেছনে পড়তেন না। তারা মানুষের ভাল বিষয়গুলো দেখতেন। কারো দোষ জানলেও তা প্রকাশ করতেন না। সাহাবাদের আমল এমনি ছিল। তারা মানুষের দোষকে ঢেকে রাখতেন। উম্মতের দোষকে তারা প্রকাশ করতেন না। ভূল সংশোধনে নববী তরীকায় না হলে এর দ্বারা ফেৎনা ছড়াবে। উম্মতের ভুল প্রকাশ ও সংশোধনের জন্য আমাদের নবী সা. ও সাহাবাদের তরীকা ও পদ্ধতিকে অনুসরণ করতে হবে।
হযরতজী ইউসুফ রহ. বলতেন, উম্মতের ভুল যদি চুপানো না হয় এবং এটাকে হালকা করে না দেখা হয় তাহলে ইজতেমায়িত পয়দা হবে না। তাইন কি?

ঘটনা
এক লোক উট চুরি করেছিল। কিছুদিন পরে সে এব্যাপারে অনুতপ্ত হয়ে হযরত আলী রা. এর কাছে এসে বললো, হে খলিফাতুল মুসলিমিন, আমি একটি উট চুরি করছি। হযরত আলী রা. বিষয়টিকে হালকা করার জন্য বললেন, তুমি মনে হয় তোমার উট ভেবে তুলে নিয়ে গিয়েছিলে। দেখতে মনে হয় রং এক ছিল। লোকটি বলল না আমিরুল মুসলিমিন আমি ইচ্ছে করেই অন্যের উট চুরি করে বিক্রি করে দিয়েছি। এখন নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি।
আলী রা. বললেন, জল্লাদকে ডাক এবং তার হাত কেটে দাও বলে তিনি উঠে গেলেন। জল্লাদ এলা। হযরত আলী রা. আবার সেখানে হাজীর হলেন। লোকটিকে দেখে এমনভাবে কথা বললেন, যেন তাকে চিনেনই না। কখনো তার সাথে কথা হয়নি। বললেন তুমি কি চাও। লোকজন বলল সে উট চুরি করেছে। আলী বললেন, তুমি কি সত্যই চুরি করেছ। লোকটি জল্লাদের ভয়ে এবার বলল আমিরুল মুমিনিন, আমি চুরি করি নি।
তিনি বললেন, চলে চাও। সে চলে গেল। লোকজন জিজ্ঞাসা করলো, আমিরুল মুমিনিন, লোকটি তো নিজেই অপরাধ স্বীকার করেছিল, তাহলে আপনি কেন তাকে ছেড়ে দিলেন।
আলী রা. বললেন, প্রথম সে স্বীকার করেছিল তাই জল্লাদ ডেকেছি। এখন সে অস্বীকার করেছে তাই ছেড়ে দিলাম।
এটাই ছিল সাহাবাদের নমুনা। সাহাবারা উম্মতের দোষকে গোপন রাখতেন। প্রকাশ পেলে তা হালকা করে দিতেন।
ভাই দোস্ত বুযুর্গ! এসব ঘটনা তরবিয়তের এলেম। এসব ঘটনা মানুষ গড়ার এলেম। আহকামাতের এলমের সাথে তরবিয়তের এলেম/ নৈতিকতার এলেম। আখলাকের এলেম জানতে হবে।
নতুবা কোন জায়গা কি প্রকাশ করতে হবে এবং কিভাবে করতে হবে তা জানা থাকবে না। ফলে উম্মত বিভ্রান্ত হবে, ফেৎনা তৈরি হবে। ইজতেমায়িত নষ্ট হবে। আমি আখলাফকে ছাড়ব কিভাবে। এটা জানা জরুরী।
আমল যার দ্বারা তাকে দুনিয়াতেই রাসূল সা. জামাতের সার্টিফিকেন দিচ্ছেন।
হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর রা. তার বাড়িতে গেলেন। মেহমান হলেন হযরত সাদ রা. আমল দেখার জন্য। না জানি তিনি কত আমল করেন। লম্বা-নামাজ তাহাজ্জুদ নফসিয়াত কিভাবে করেন দেখলেন। কিন্তু হযরত আব্দুল্লাহ রা. অবাক হলেন, তিনি দেখলেন সাদ রা. এশার নামাজ পরে বিছানায় শুয়ে পড়লেন আর উঠে ফজরের নামাজ আদায় করলেন।
তিন দিনের ভিতর বিশেষ কোন আমল দেখতে না পেয়ে হযরত সাদ রা.কে বললেন, হুজুর সা. আপনার সম্পর্কে জান্নাতের খুশখবরি দিয়েছেন। আপনি এমন কি আমল করেন?
হযরত সাাদ রা. বললেন, আমার তেমন কোন আমল নেই, তবে আমার কোন মুসলমানের সাথে আমার হাসাদ নেই।
এজন্য সমস্ত মুসলমানের ব্যাপারে দ্বীলকে পরিস্কার রাখতে হবে। কোন প্রকার বদগোমরাহী অন্তরে রাখা যাবে না। কারো ব্যাপারে হিংসা করা যাবে না। কেউ কাজে আগে বাড়লে, দ্বীনের ব্যাপারে আগে বাড়লে তার প্রতি হিংসা করা যাবে না।
আল্লাহ কারো দ্বারা কাজ নিতে চাইলে, তার দ্বারা নিবেনই।
সাহাবাদের বড়গুণ ছিল, তারা একে অপরের ফাজায়েল বলতেন। অন্যের ছেলাহিয়তের প্রশংসা করতেন।
হযরতজী মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস রহ. বলতেন, এখলাছের সাথে কাজে লেগে থাক, আল্লাহ তোমার থেকে কাজ নিবেন, যা অন্যের দ্বারা নেন নি।
ইজতেমায়িত একাজের সবচেয়ে বড় বিষয়। ইজতেমায়িত না থাকলে সাহায্য আসবেনা। কারো যোগ্যতা দেখে যেন হিংসা না হয়। তার পেছনে যেন না লাগি। হাসান করলে হবে টা কি? এতে না আছে উম্মতের কোন আয়ের বা ভালাই। না আছে নিজের কোন ভালাই। বরং আল্লাহ হাসাদকারীকে সমস্ত খায়ের থেকে মাহরুম করে দিবেন। ঝগড়া করলে ভিতের এখন এক আগুণ জ্বলবে, যা তার সব কাজকে নষ্ট করে দিবে।

ঘটনা :
হুজুর সা. যুদ্ধের ময়দানে তার একটি তলোয়ারকে উচু করে বললেন, কে আছ যাকে আমি এই তলোয়ারটি দিতে চাই। হযরত উমর রা. এগিয়ে এলেন। হুজুর সা. আবার বললেন, কে আছ যাকে আমি এই তলোওয়ার দিতে চাই? হুজুর সা. এর ফুফাত ভাই হযরত যুবাইর এগিয়ে এলেন।
হুজুর সা. আবার বললেন, কে আছ যাকে আমি এই তলোয়ারটি দিতে চাই। তখন আবু দু’কানা এগিয়ে এলেন।
হুজুর সা. তাকে তলোয়ারটি দিলেন। হযরত উমর রা. ও যুবায়ের তার পেছনে ছুটলেন। তারা কোন মন্তব্য করলেন না। আর বলতে লাগলেন যথার্থযোগ্য হাতের কাছেই দিয়েছেন। ময়দানে দুজন আবু দুজানাকে অনুসরণ করলেন।
এটাই হলো এই মেহনতের মেজাজ। কেউ আগে বাড়লে। কারো সম্মান মর্যাদা সাথীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়লে, তিন কাজে আগে বাড়লে আমরা তার সাথে ঝগড়া করবো না। সমালোচনা করবো না। তার সাথে তাকাব্বুর করব না বরং তাকে তাউন করব। তার অনুসরণ করবো। এটাই আমাদের কাজের উসুল।
আমরা এই কাজে এতায়াত করব। কারো সমালোচনা করব না। কোন হালত আসলে কারো দ্বারা বেইনসাফী প্রকাশ পেলে, কেউ কষ্ট দিলে তার সাথে ঝগড়া করব না। সবর ও তায়াম্মুল অর্থাৎ নিরবে বরদাশত করব। কারো সাথে তর্কে বা সমালোচনাতে জড়াব না। বরং তাকে মহব্বত করব। আগের চেয়ে আরো বেশি একরাম করবো। তাকওয়ার সাথে চলবো। আল্লাহর ভয়ের সাথে কাজ করবো। কাজ করে মাফ চাব। কারণ আমরা একাজের যোগ্য নই। আমাদের দ্বারা ভুল হবে। তাই এস্তেগফারের সাথে কাজ করতে হবে।
কারো ভুল ধরব না। ভুল প্রকাশ পেলে তা হালকা করে দিব। আল্লাহর রাস্তায় সফর করতে করতে এসব গুণ আমরা নিজের মাঝে নিয়ে আসব। এসবই হলো নবীওয়ালা কাজের মেজাজ। আমাদের কাজের উসুল।
হযরতজী মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ রহ.কে একবার সাথীরা বললো, হযরত কী আমাদেরকে এই কাজ করার জন্য একটি সংবিধান লেখে দিন। একটি গঠনতন্ত্র বা উসুলি কিতাব লিখে দিন। হযরতজী বললেন, ভাই এই কাজ কোন দল নয় যে এটার জন্য আলাদা গঠনতন্দ্র করবো। বরং এই কাজ পুরো উম্মতের । এটা সমস্ত উম্মতের জিম্মাদারী। আর আমি কোন উসুলের কিতাব লিখলে তা হবে আমার বানানো উসুল। আমি কোন মডেল নই। আমাদের কাজে মডেল হযরত সাহাবায়ে কেরাম। হায়াতুস সাহাবা আমাদের কাজের উসুল। আমি কাজ করনেওয়ালাদের জন্য হায়াতুস সাহাবা লিখে গেলাম। তোমরা যে কোন হলতের মোকাবেলায় হায়াতুস সাহাব দেখে নিবে। তা পড়ে আমল করবে। এমন পরিস্থিতিতে সাহাবায়ে কেরামের কি আমল ছিল। কুরআন হাদীসের আলোকে তার সমস্যায় সমাধান কিভাবে করেছেন। তাদের জীবনী আমাদের কাজের উসুল।
আল্লাহ আমাদের আমল করার তাওফিক দান করুন।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!