শনিবার, ১৭ অগাস্ট ২০১৯, ০১:২৯ অপরাহ্ন

যেভাবে তাবলীগে লেগেছিলেন আল্লামা মঞ্জুর নোমানী রহ.

যেভাবে তাবলীগে লেগেছিলেন আল্লামা মঞ্জুর নোমানী রহ.

সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লা, তাবলীগ নিউজ বিডিডটক। গত চিল্লার সফরে একজন পীর সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ। যিনি রাজনীতি ও ত্বরীকতের মেহনত দুটিই করেন সমানভাবে। হযরতকে তাবলীগের কথা বলতেই তিনি চটে গেলেন।

রাজনীতি ও পীর মুরীদি নিয়ে এতো ব্যস্ত যে, দ্বীনের অন্য কোন শুভাতে সামান্য সময় দেয়াও উনার দ্বারা সম্ভব নয়। কিন্তু তিনি মহল্লাতে দাওয়াতের একটু ফিকির করলেই এখানকার পরিবেশ বদলে যেত। শতভাগ মানুষ নামাজি ও দ্বীনদ্বার হয়ে যেত।

পরে জামাতের সাথে দুপুরের খাবারের দাওয়াত দিলাম। দাওয়াত কবুল করলেন। তিনি এলেন। খাবারের পর আমার সাথে মসজিদের ভেতর খোশ গল্পে মেতে উঠলেন। সিলেটের উলামাদের রাজনৈতির প্রতি আগ্রহ ও একনিষ্টতা নিয়ে আলোচনা করলেন।

আমার পরিবারের পীরদের ইসলামী রাজনীতির অবদান ও আমার ছাত্র রাজনীতির সর্বশেষ দায়িত্ব সম্পর্কে শুনে তিনি পুলকিত হলেন। আমি তাকে জামাতে ইসলামীর অন্যতম প্রতিষ্টাতা, খ্যাতিমান আলেমেদ্বীন মাওলানা মন্জুর নোমানীর আত্মজীবনী মূলক গল্প শুনালাম।

মাওলানা মন্জুর নোমানী লিখেছেন, আমার বন্ধু আবুল আলা মওদুদীকে নিয়ে যখন আমি জামাতে ইসলামী প্রতিষ্টা করি। তখন ইসলামী রাজনীতি, ইসলামী সমাজ বিপ্লব, খেলাফত রাষ্ট ব্যবস্থা, ইসলামী শাসনতন্ত প্রতিষ্টা, খেলাফত আলা মিনহাজিহিন নবুওয়্যাত এর ব্যাপারে আমি এতোটাই তন্ময় ও আত্মমগ্ন ছিলাম যে কেউ রাজনীতির বাহিরে অন্য কোন বিষয় নিয়ে কথা বললে, আমি আমার য্যোগ্যতা সাধনা ও গবেষনারদ্বারা তাকে কোরআন হাদীসের দলীল দিয়ে ইসলামী রাজনীতিই যে উম্মতের মুক্তির একমাত্র পথ ও পন্থা তা তাকে উল্টো বুঝিয়ে দিতাম।

কিছু কাল পর মওদুদীর সাথে আমার শরীয়া কিছু বিষয় নিয়ে মত বিরোধ তৈরি হল। তখন আমি সিমাহীন মানসিক যন্ত্রনায় ভূগছিলাম। তখন নিজের পেরেশানীকে দূর করার জন্য একজন দ্বীলওয়ালা বুজুর্গের সোহবতে যাওয়ার ইচ্ছে হল।

নিজেকে এরপর মাওলানা আব্দুর রহিম রায়পুরী (রহঃ)-এর খানকাতে চলে গেলাম। সেখানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে তার কাছ থেকে ইসলাহী ইজাজত পেলাম। কিছুদিন পর রায়পুরীর সাথে সকাল বেলা প্রাতঃভ্রমনে বের হয়েছি। রায়পুরী আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, মাওলানা আপনি দিল্লী কবে যাবেন। আমি বললাম আগামী কাল।

তখন রায়পুরী বললেন, সেখানে গিয়েই আপনি দিল্লীর হয়রতের (হয়রতজী মাওলানা মোহাম্মদ ইলিয়াছ রহঃ) সাথে দেখে করবেন। আমি কোন প্রকার ভাবনা ছাড়াই বললাম ইনশাল্লাহ।

পরদিন ভোরেই দিল্লীর উদ্দেশ্যে রওয়ান হলাম। সেখানে পৌছেই নিযামউদ্দীন বস্তিতে তাবলীগের মার্কাজে চলে গেলাম।

হয়রতজীর সাথে সালাম মোসাফাহ করার পরই তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, মাওলানা, কেন এসেছেন? আমি বললাম, আপনাকে দেখতে এসেছি।

হয়রতজী এই কথা শুনেই রেগে গিয়ে আমাকে বললেন, “রাসুল সালাল্লাহু আলাইহি ওয়াসসাল্লাম এর দ্বীন মিটে যাচ্ছে সেটা দেখছেন না? আমাকে দেখার কি আছে?”

হয়রতজীর কথাগুলো যেন আমার দ্বীলের ভেতর হাতুড়ি পেটা করল। আমি “থ” হয়ে নিশ্চুপ বসে থাকলাম। আল্লাহওয়ালাদের কথার প্রভাব কতোটা ব্যাপক ও প্রভাবশালী হতে পারে আমার মতো রাজনীতি ব্যস্থ একজন আলেম সেটা সেদিন প্রথম অনুভব করলাম।

তখন নিযামুদ্দীনের মার্কাজ থেকে ১০দিনের একটি জামাত বের হওয়ার প্রস্তুতি চলছে। হয়রতজীও সেই জামাতে থাকবেন। এমন সময় তিনি আমাকে হঠাৎ বলে ফেলেলেন, “মাওলানা আমার একটা কথা আপনাকে রাখতে হবে।” আমি কিছু না বুঝেই বলে ফেললাম, ইনশাল্লাহ “রাখব।” হয়রতজী বললেন, “আমার সাথে দশ দিনের জন্য আপনাকে আল্লাহর রাস্তায় যেতে হবে।”

কি আর করার, অপ্রস্তুত আমাকে নিয়ে যে খুদরতী প্রস্তুতি চলছিল, তাতে বাধ্যে ছেলের মতো নিজেকে সঁপে দিলাম। যে কাজ নিয়ে আমার আপত্তি আর প্রশ্নের শেষ ছিল না, সেই কাজটিতেই আমি মনের উল্টো চলতে প্রস্তুত হলাম। জামাত বের হবে ঠিক তখন, হয়রতজী আমাকে বললেন –

“মাওলানা আপনি রাজনীতিবিদ মানুষ, জানি এ সফর আপনার ইচ্ছার বিরোদ্ধে, একাজ নিয়ে আপনার ভেতর অসংখ্য প্রশ্ন বিদ্ধমান। তবে সফরে আপনাকে, একটা শর্ত মেনে চলতে হবে, তাহল কোন কাজেই আপনি আমাকে প্রশ্ন করবেন না, আপনার ভেতরের উদিত সমস্থ প্রশ্ন কাগজে লিখে রাখবেন। দশদিন পর দিল্লী এসে আপনার সব প্রশ্নের উত্তর আমি দেওয়ার চেষ্টা করব।” আমি আরো বিপাকে ও কটিন শর্তের ভেরজালে আটকা পড়লাম।

দশদিন হয়রতজীর সাথে মেওয়াত সফর করে যখন দিল্লী এলাম। তিনি আমাকে বললেন, “মাওলানা আপনার প্রশ্ন গুলো আমাকে বলতে পারেন।”

আমি উত্তর দিলাম, “হযরত আমার ভেতর একাজ নিয়ে এখন আর কোন প্রকার প্রশ্ন নেই, বরং মৃত্যু পর্যন্ত এই কাজ করার নিয়ত করছি। দশদিন আল্লাহর রাস্তায় সফর করে আমার বিশ্বাস হয়েছে, উম্মতের ইসলাহ, সংশোধন, তায়াল্লুক মাআল্লা, সফলতা ও যাবতীয় কামিয়াবী দাওয়াতের মেহনত আর হিয়রতের মধ্যেই বিদ্ধমান।”

মাওলানা মন্জুর নোমানী বলেন, ‘সফর না করিয়ে যদি দাওয়াত ও তাবলীগ সম্পর্কে হয়রতজী আমাকে বুঝাতেন তাহলে আমি হয়তো বুঝতাম না। কিস্তু সফর করতেই এই মেহনত নিয়ে আমার সমস্ত এশকাল খতম হয়ে গেল। তাবলীগ এটাই। যা বাস্তব মেহনতের ময়দানে গিয়ে করতে হয়, বয়ান বক্তৃতা আর মাহফিলে ওয়াজ করে কখনো তাবলীগের হাকীকত বুঝা যাবে না।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!