সোমবার, ০২ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৮:৪৬ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম ::
তাফসির শাস্ত্রের ইমাম ইবনে আব্বাস (রা.)

তাফসির শাস্ত্রের ইমাম ইবনে আব্বাস (রা.)

আছে কি কেউ তার সমকক্ষ কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী! আছে কি কেউ জীবন সত্তা উজাড় করে শুধু একটি মুহূর্ত তার পাশাপাশি অবস্থান করবে। হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেখবে তার রাজকীয় মুকুট। আকাশচুম্বী খ্যাতি। না, পারবে না। কেউ পারবে না। এ মর্যাদা ও খ্যাতি একমাত্র তার শিরেই সাজায়। এ ভূষণ তার কায়াতেই মানায়। কিন্তু কে সেই সূর্যমানব, হ্যাঁ, তিনি রাসুল (সা.) এর প্রিয় সাহাবি এবং তাফসির জগতের মুকুটহীন সম্রাট ইবনে আব্বাস (রা.)। তার পুরো নাম আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব। রাসুল (সা.) এর হিজরতের মাত্র তিন বছর আগে তার জন্ম। রাসুল (সা.) এর ইন্তেকালের সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। তিনি সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সম্পদ। শান ও গৌরব। বয়সে নবীনত্ব কিংবা শৈশবের হেয়ালিপনা তাকে স্পর্শ করেনি। সব প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়ে ঊষালগ্ন থেকেই ছুটে চলেছেন জ্ঞানের পথে। আলোর পথে। তিন বছর রাসুল (সা.) এর সুহবতের থেকে নিজেকে উপনীত করেন স্বর্ণশিখরে। দেহ সত্তায় উদ্ভাস ঘটান হেরার দ্যুতি। আল্লাহ তায়ালা রাসুল (সা.) এর প্রিয় এ সাহাবিকে দান করেন কোরআনের তাফসিরের বিশেষ এলম। কোরআনের নিগূঢ় রহস্যাবলি মুহূর্তেই উদ্ভাসিত হয়ে যেত তার সম্মুখে। রাসুল (সা.) তার জন্য দোয়া করেন, ‘হে আল্লাহ আপনি তাকে দ্বীনে এলমে প্রাজ্ঞতা দান করুন এবং কোরআনের ব্যাখ্যাবলি অবহিত করুন।’ (বোখারি : ১৪৭)।

সত্যিই তাই হয়েছিলেন। সব সাহাবি থেকে এটা তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ছিল। বয়সের স্বল্পতা সত্ত্বেও বড় বড় সাহাবি তাকে সম্মান করতেন। বিশেষ মর্যাদা প্রদান করতেন। তাফসির সংক্রান্ত যে কোনো সমস্যায় সবাই তার শরণাপন্ন হতেন। তাফসির শাস্ত্রের পাশাপাশি অন্য বিষয়েও তার সমান দখল ছিল। হাদিস, ফেকাহ, ভাষা-সাহিত্যেও ছিল বিশেষ দক্ষতা। এমনকি শুধু তার থেকেই ১ হাজার ৬৬৬টি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হজরত ওমর (রা.) তার এলমি প্রাজ্ঞতার কারণে যথেষ্ট সম্মান করতেন। মর্যাদা দিতেন। হজরত ওমর (রা.) খলিফা হওয়ার পর সর্বদা তাকে পাশে রাখতেন। এককথায়, চিন্তা-চেতনা, বংশ মর্যাদা ও ব্যক্তিত্ব সবদিক থেকে তিনি ছিলেন অনন্য। অন্যদের থেকে কিছুটা ভিন্ন। বিখ্যাত তাবেঈ হজরত মাসরুর (রহ.) বলেন, আমি যখন ইবনে আব্বাস (রা.) কে হাদিস বর্ণনা করতে দেখতাম তখন মনে হতো, তিনি সবচেয়ে বিশুদ্ধভাষী এবং সবচেয়ে বড় জ্ঞানী। মানুষ কখনও জ্ঞান অর্জন করে তৃপ্ত হতে পারে না। পরিতৃপ্ত হতে পারে না। জ্ঞানের পথে যতই সে এগিয়ে যাবে, ততই নিজেকে আরও অজ্ঞ মনে হবে। নির্বোধ মনে হবে। কারণ জ্ঞান সাগর পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্তৃত সাগর। যার কোনো সীমা নেই। কিনারা নেই। ইবনে আব্বাস (রা.) এর ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। তিনি নিজেই নিজের জ্ঞান পিপাসার কথা এভাবে বর্ণনা করেন, ‘রাসুল (সা.) এর ইন্তেকালের পর আমি এক আনসারি সাহাবিকে বললাম, এখনও রাসুল (সা.) এর বহু সাহাবি জীবিত এবং আমাদের মাঝে বিদ্যমান।

সুতরাং আসুন আমরা তাদের কাছ থেকে জ্ঞানের কথাগুলো জেনে নিই। তখন সেই আনসারি বললেন, আপনার কি মনে হয় জ্ঞানের বিষয়ে কেউ কখনও আপনার শরণাপন্ন হবে? তিনি আমার প্রস্তাবে সাড়া দিলেন না। ফলে আমি একাকীই এ সাধনায় ঝাঁপিয়ে পড়ি। আমি বিভিন্ন সাহাবির দরবারে যেতাম এবং তাদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করতাম। যদি কোনো ব্যক্তির সূত্রে আমার কাছে এ সংবাদ পৌঁছত যে, অমুক ব্যক্তির কাছে কিছু হাদিস সংরক্ষিত আছে তাহলে অবশ্যই তার শরণাপন্ন হতাম। কখনও জানা যেত হাদিস সংরক্ষণকারী সেই ব্যক্তি দ্বিপ্রহরে বিশ্রাম নিচ্ছেন, তখন আমি আমার চাদরকে বালিশ বানিয়ে দরজার সম্মুখে শুয়ে অপেক্ষা করতাম।

বাতাসের ঝাপটায় ধূলিবালিতে আমি আচ্ছাদিত হয়ে যেতাম। যখনই ওই ব্যক্তি ঘর থেকে বের হয়ে আমাকে দেখত, তিনি আফসোস করে বলতেন, আপনি রাসুল (সা.) এর চাচাতো ভাই, খবর পাঠালে আমি নিজেই আপনার খেদমতে উপস্থিত হতাম। কেন অযথা কষ্ট করে আপনি এলেন! আমি বলতাম, আমার প্রয়োজনে আমি এসেছি। সুতরাং নিজে আসাটাই তো আমার দায়িত্ব। তারপর তাকে হাদিস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতাম। সেই আনসারি ব্যক্তিটি দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিলেন। এমনকি তিনি আমাকে এমন অবস্থায় দেখেছেন যে, মানুষ আমার আশপাশে ভিড় করে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানতে চাচ্ছে। তখন সেই আনসারি বলে উঠতেন এ যুবক আমার চেয়ে অধিক জ্ঞানী।’ (আল ইসাবা : ৪/১১৮)। তার তাফসির এবং তার ছাত্রদের তাফসিরই তাফসিরের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য মত হিসেবে প্রাধান্য পায়। আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বর্ণনা করেন, ‘কোরআনের তাফসির সম্পর্কে সবচেয়ে প্রাজ্ঞ মক্কাবাসী। কারণ তারা ছিল হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) এর ছাত্র।’ (মুকাদ্দিমা ফি উসুলিত তাফসির : ২৩-২৪)।

মক্কায় হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) এর শাসনামলে তিনি মুহাম্মদ ইবনে হানাফিকে সঙ্গে নিয়ে সপরিবারে তায়েফ গমন করেন। তায়েফে অল্প কিছুদিন অবস্থানের পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেখানে তার দৃষ্টিও লোপ পায়। ৬৮ হিজরিতে এ মহান সাহাবি ৭১ বছর বয়সে রাসুল (সা.) এর রক্তে রঞ্জিত প্রান্তর তায়েফে ইন্তেকাল করেন। মুহাম্মদ ইবনে হানাফি (রহ.) তার জানাজার ইমামতি করেছিলেন। তায়েফে তার নামে মসজিদ রয়েছে। ওই মসজিদের নামেই তিনি চিরনিদ্রিত।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!