মঙ্গলবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:০২ পূর্বাহ্ন

আবূ যায়েদ সারুজী ও ওয়াজে গলাকাটার বাংলাদেশ

আবূ যায়েদ সারুজী ও ওয়াজে গলাকাটার বাংলাদেশ

আব্দুস সালাম ● মানুষ বাঁচার জন্য খায় নাকি খাওয়ার জন্য বাঁচে? এই প্রশ্নের জবাবে ভোগবাদী দর্শন যাই বলুক খেতে হলে যে উপার্জন করতে হয় এই অমোঘ সত্যকে কোন সাধু সন্নাসী আজ অব্দি অস্বীকার করতে পারেনি। সেজন্যই বেঁচে থাকার তাগিদে মনুষ্য প্রজাতির প্রতিটি দু’পেয়েকে বেছে নিতে হয়েছে কোন একটি উপার্জন মাধ্যম।

হাজার বছর আগে রুটি-রুজির সম্পূর্ণ নতুন ও নিরাপদ এক পন্থা আবিস্কার করেছিলো সারুজ নামক দেশের চরম ভবঘুরে ধুরন্ধর এক ওয়ায়েজ। ধর্মীয় বাগাড়ম্বরের ফাঁদে ফেলে যে কিনা সহজেই বাগিয়ে নিতো মানুষের ঝোলার হলুদ সোনা আর ঝকঝকে রূপাগুলো।

আবূ যায়েদ সারুজী নামক সেই চরিত্রটির সাথে মাদরাসা ছাত্রদের সখ্যতা কয়েকশ বছরের। ঐতিহ্যপূজার সরস্বতী রূপে আবির্ভূত হয়ে কওমী মাদরাসার সিলেবাসে হাজার বছর অর্ঘ্য লাভ করে আসা আবুল কাসেম হারিরীর মাকামাহ গ্রন্থের নায়কই হলো আবূ যায়েদ সারুজী।

দরসে নেজামীর প্রণেতা মোল্লা নিজামুদ্দিন ঠিক কী কারণে এই বই নির্বাচন করেছিলেন বলা কঠিন। তবে অনুমান করা যায় যে সাহিত্য পাঠের পাশাপাশি খুব সম্ভব শিক্ষার্থীকে তিনি ‘বিড়াল তপস্বী’র পেশা থেকে সাবধান করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গণেশ উল্টে গিয়ে কালেকালে তারাই একেকজন হয়ে উঠলো ভণ্ড সাধু। সেই আবূ যায়েদ সারুজীর বকের ধার্মিকতাকে অনুকরণ করেই গড়ে উঠলো বিরাট সংখ্যক একদল ওয়াজ ব্যাবসায়ী, বাংলাদেশের গলাকাটা পার্টি। সারুজীর মত যারা ব্যাপক ধর্মের বাণী শুনিয়ে হাতিয়ে নিতে লাগলো গোবর গণেশ টাইপ মানুষের কষ্টে উপার্জিত পয়সা। সেই সাথে ছুড়ি ছাড়াই কেটে নিতে লাগলো মধ্যবিত্ত মানুষের গলা।

ধান্দাবাজিতেই যে কেবল সারুজীর অনুকরণ তা কিন্তু নয়। নাম তকমার ক্ষেত্রেও তারা সারুজীকে গুরুজী মানে। আজকের বক্তাদের নামের শেষে অদ্ভূত রকমের যেই বাহারি তকমা ঝুলতে দেখা যায় তা গুরুজিরই অনুকরণ।

সারুজের সেই ধুরন্ধর পেটপূজারী লোকটির সাথে আজকের ওয়াজ বাজারের মহাজনদের অনেক মিল৷ কালের চক্রে অনেক কিছু বিলীন হয়ে গেলেও সারুজীর আবিস্কৃত সেই আদি ও পরীক্ষিত ধান্দা আজও টিকে আছে আপন মহিমায়৷ সুরেলা বক্তাদের মেকি খোদাভীতির বয়ানে শ্রুতারা কেঁদে বুক ভাসায় কিন্তু হুজুরের রুদ্ধদ্বার হুজরা খানায় খাসি মুসাল্লাম আর নাবিজ পেয়ালার ধুন্ধুমার কাণ্ড তাদের কাছে অজানাই রয়ে যায়। দুনিয়ার বিরুদ্ধে লম্বা বয়ান ঝেরে এসে নিজেরাই হারিয়ে যায় দুনিয়ার রঙ্গ রস মধু চাখতে। দিনশেষে শ্রোতা চোখ কচলাতে কচলাতে বাড়ি ফিরে আর বক্তা ভুড়ি কচলাতে কচলাতে ঘুমাতে যায় মসজিদ সভাপতির সেগুনের খাটিয়ায়। এদিকে সাদা খামে আবৃত চকচকে নোটের বান্ডিল উঁকি মারে আকাশে।

ধান্দাবাজিতেই যে কেবল সারুজীর অনুকরণ তা কিন্তু নয়। নাম তকমার ক্ষেত্রেও তারা সারুজীকে গুরুজী মানে। আজকের বক্তাদের নামের শেষে অদ্ভূত রকমের যেই বাহারি তকমা ঝুলতে দেখা যায় তা গুরুজিরই অনুকরণ। সাঈদী, আজহারী, জাফরী, আফসারী, তাহেরী, সিদ্দিকী, জিহাদী, বুলবুলি, আশরাফী, আব্বাসী, ইউসুফী, মাহমুদী, আযাদী, মেশকাতী, ইসলাহী, সালেহী, আশেকী, রাশেদী, বেলালী, আনোয়ারী, মাজহারী, আজিজী, তারিফী, আকুঞ্জী ইত্যাদি রংবেরঙের অভিনব শৈল্পিক তকমারাজির উদ্ভবের পেছনে মহামতি সারুজীরই পূর্ণ অবদান। বর্তমানে একজন বক্তা কখনই পূর্ণাঙ্গ বক্তা হয়ে উঠবে না যতক্ষণ না তার নামের শেষে এজাতীয় বিশেষ্য বিশেষণ সর্বনাম অব্যয় ক্রিয়া ও তকমা যোগ হবে ।

আমরা দেখেছি বর্ণনাকারী হারেস ইবনে হাম্মাম সময় বুঝে সারুজীকে সিরাজুল গুরাবা, তাজুল উদাবা ইত্যাদি অভিধা দিয়েছেন। সারুজীর অতি উৎসাহী শিষ্যদের অনেককে গুরুজীর অনুকরণে এসব খেতাব ধারণ করতে দেখা গেছে। বাংলার বাঘ খতীবে ইসলাম মুনাজেরে যামান সুলতানুল ওয়ায়েজীন বাতিলের আতঙ্ক সুরের পাখি ইত্যাদি প্রাণী হয়ে যারা অহর্নিশ দূষিত করে যাচ্ছে পরিবেশ।

চাঁদার ভাগ সারুজী যেমন সহকর্মীদেরকেও দিতো আজকাল কালেকশনের পয়সায়ও তেমন ভাগ বসে। এক ভাগ অদৃশ্য হয়ে যায় চাঁদাবাজ বক্তার পকেটে আরেক ভাগ হালাল হতে থাকে এন্তেজামিয়া কমিটির উদরে অবশিষ্ট দুচার পয়সা যা থাকে তা হয়ত জমা হয় মসজিদ মাদরাসার তহবিলে।

ওয়াজের ফাঁকে ফাঁকে সারুজী কখনো গাইতেন প্রাচীন গীতিকা কখনো আবৃত্তি করতেন কবিতা। আজকালকার ওয়ায়েজরও খুব ঘটা করে এই কাজটি করেন। হেলেদুলে দেহ নাচিয়ে অরুচিকর অঙ্গভঙ্গিতে সিনেমার গান বাউলের শান গেয়ে শ্রুতাদের শরীরে একটা ভাব আনার চেষ্টা করেন। কেউবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাত পা ছুড়ে বিকট আওয়াজে আকাশ পাতাল ভারী করে মুহুর্মুহু সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়তে থাকেন। তবে আবু যায়েদ সারুজী বেঁচে থাকলে গ্রেনেড ছুড়ার মত বাজে কাজ পছন্দ করতেন না বলেই আমার ধারণা। চিৎকার চেঁচামেচি করে কানে তালা লাগানোর মত বিকট আওয়াজ তিনি কোথাও করেছেন এমন তথ্যও হারেস ইবনে ইবনে হাম্মাম আমাদেরকে জানাননি। তাই শব্দ দূষণের ক্ষেত্রে মামুনুল হক সারুজীর দায় কিছুতেই আমরা আবূ যায়েদ সারুজীর উপর চাপাতে পারি না৷

সারুজীর কাছ থেকে চাঁদা কালেকশন করার বিদ্যাও ভালোভাবে রপ্ত করেছেন এসময়ের ওয়ায়েজরা। আবেগী বয়ানের জাল ফেলে মিথ্যা গালগল্প ফেঁদে সহজেই লোপাট করে নিতে পারে জনগণের পকেট। সব ওয়ায়েজরা আবার এসব পারে না। চাঁদাবাজির জন্য চাই বিশেষ প্রতিভা। লাজুকতা দিয়ে কখনো সারুজী হওয়া যায় না তাই প্রথম শর্ত লজ্জা শরমের মাথা খেতে হবে৷ তারপর পাবলিকের দিল নরম করে পকেট গলানো। চাঁদার ভাগ সারুজী যেমন সহকর্মীদেরকেও দিতো আজকাল কালেকশনের পয়সায়ও তেমন ভাগ বসে। এক ভাগ অদৃশ্য হয়ে যায় চাঁদাবাজ বক্তার পকেটে আরেক ভাগ হালাল হতে থাকে এন্তেজামিয়া কমিটির উদরে অবশিষ্ট দুচার পয়সা যা থাকে তা হয়ত জমা হয় মসজিদ মাদরাসার তহবিলে।

সারুজী যেমন মনোবিজ্ঞান ও তড়িৎ গল্প বানানোর আজীব কলাকৌশল আবিষ্কারের দ্বারা সবাইকে ভড়কে দিয়েছে ঠিক তার ভাবশিষ্যদের আবিষ্কারের ফিরিস্তিও কম দীর্ঘ না। এইতো কদিন আগে তার সুযোগ্য এক উত্তরসূরী আবিষ্কার করলেন ‘এন্টার কটিক’ নামক একটি পাতাল মহাদেশের। সে আর হিটলার ছাড়া কোন কাকপক্ষীও জানেনা মাটির নীচের সেই গুপ্ত মহাদেশটির কথা। এই শিষ্যেরই আরেক আবিস্কার প্লাস্টিকের হার্ট। এই হার্ট যার ভেতরে সেট করা হবে মায়া মমতাহীন প্লাস্টিক হয়ে তাকে বেঁচে থাকবে হবে। শুধু কি তাই? আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে যে সূর্য পশ্চিম দিকে উদিত হবে প্রমাণসহ এই তথ্যও আবিষ্কার করে ফেলেছেন তিনি। আর সারুজীর সর্বকালের সেরা ভক্ত সাঈদী তো পেঙ্গুইন আকাশে উড়তে পারার বিরল তত্ত্ব আমদানি করে গাঁজার বাজারে হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলো আরো আগেই।

সারুজীর সাথে আজকের ওয়াজ বাজারের গলাকাটা পার্টির শত মিল থাকলেও একটি বিষয়ে বেশ অমিল দেখা যায়৷ সারুজীকে কখনো তার সমপেশার কোন ওয়াজজীবীকে কুৎসা রটাতে দেখা যায়নি। অথচ তার সুযোগ্য শিষ্যদের মাঝে আদায় কাঁচকলায় সম্পর্ক। তাই কখনো জনৈক আলুপুরিকে দেখা যায় ডালপুরির কুৎসা গাইতে। ডালপুরি সাহেব ব্যাস্ত অন্যকাউকে কিমাপুরি বানাতে। কিমাপুরি বেচারা লাচার হয়ে ভেলপুরিকে মিছেই দোষারোপ করে চলেছে। এরা সবাই গুরুজীর অবাধ্য শিষ্য। গুরু আবু যায়েদ সারুজীর ভোগবাদী জীবনের সকল দর্শনকে আঁকড়ে ধরলেও শিষ্যরা তার এই সুন্দর গুণটি ধারণ করতে পারেনি। তারা শুধু গুরুর অপকর্মেরই সঙ্গ দিলো বিনিময়ে সাঙ্গ করলো তার সুন্দর এই গুণলীলাকে।

লেখক : শিক্ষক ও সমাজ বিশ্লেষক

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!