বৃহস্পতিবার, ১৫ অগাস্ট ২০১৯, ০৩:১৪ পূর্বাহ্ন

তাবলীগ জামাতে বিরোধ এবং একটি পরিপত্র

তাবলীগ জামাতে বিরোধ এবং একটি পরিপত্র

ড. আব্দুস ছালাম

ইসলাম শান্তি, সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার ধর্ম। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) শত নির্যাতনের মাঝেও সহানুভূতি ও মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। মহাগ্রন্থ আল কোরআন এবং মহানবী (সা:)-এর আদর্শই হল ইসলামের মূলমন্ত্র।

ইসলামের এই সুমহান নীতি ও আদর্শ নিঃস্বার্থভাবে আপামর জনসাধারণ তথা বিশ্ববাসীর নিকট নিঃস্বার্থভাবে তুলে ধরাই তাবলীগ জামাতের ব্রত বলে এযাবতকাল সবাই দেখে আসছে।

কিন্তু শান্তিপ্রিয় এই সংগঠনটির মধ্যে ইদানিংকালে বেশকিছু বিশৃঙ্খলা লক্ষ করা যাচ্ছে, বিশেষত বাংলাদেশে; যা শত বছর ধরে চলমান এই দাওয়াতি কার্যক্রমের নীতি ও আদর্শের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

তাবলীগ জামাতের মধ্যে বিভক্তির বিষয়টি দেশবাসী প্রথম জানতে পারে এ বছরের জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত টঙ্গী বিশ্ব ইজতিমার প্রাক্কালে। তখন তাবলীগ জামাতের বিশ্ব আমীর হজরত মাওলানা সাদ প্রতিবছরের ন্যায় বাংলাদেশে আগমন করলে দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এয়ারপোর্ট রোড দীর্ঘ সাতঘন্টার অধিককাল মাদ্রাসা ছাত্ররা অবরোধ করে, যাতে তিনি (মাওলানা সাদ) বিশ্ব ইজতিমায় অংশগ্রহণ করতে না পারেন।

এতে হাজার হাজার মানুষের চরম ভোগান্তি ছাড়াও দেশের একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে বিপুলসংখ্যক যাত্রীকে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়, যা সে সময় দেশী-বিদেশী প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিল। উক্ত ঘটনার পর থেকে প্রায়শই তাবলীগ জামাতের দু’টি পক্ষের মধ্যে মারামারি-হাতাহাতির ঘটনা ঘটছে, যা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাসহ ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছে।

বিগত ২৮ জুলাই ঢাকার মোহাম্মদপুরে ‘ওযাহাতি জোড়’ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বেশকিছু কওমী মাদ্রাসার আলেম ও ছাত্রদের উপস্থিতিতে তাবলীগ জামাতের বিষয়ে ছয় দফা সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ছয় দফার মধ্যে একটি হল, নিজামুদ্দিনে বাংলাদেশ থেকে কেউ না যাওয়া এবং নিজামুদ্দিন থেকে কোনো জামাত আসলে তা গ্রহণ না করা।

এ সম্পর্কে এ বছরের ২৯ জুলাই যুগান্তরসহ সবগুলো জাতীয় দৈনিকে বিস্তারিত সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে দেশের জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন এমনকি গ্রাম বা মহল্লায় তাবলীগ জামাতের মধ্যে বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে বলে পত্র-পত্রিকায় লক্ষ করা যাচ্ছে।

সর্বশেষ এ মাসের ৮ তারিখে মাওলানা সাদের অনুসারী দু’জন আলেম হজ শেষে কাকরাইল মসজিদে উপস্থিত হলে তাদের বেদম মারপিট করে সেখান থেকে বের করে দেয়া হয়। এটিও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ফলাও করে প্রচারিত হয়েছে।

তাবলীগ জামাতের বিবাদমান দু’টি পক্ষের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সরকারের পক্ষে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ১৩৯৩ নং পরিপত্র জারি করা হয়। দু’টি পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব^ নিরসনের লক্ষ্যে উক্ত পরিপত্রে পাঁচ দফা নির্দেশনা দেয়া হয়েছে,

যথা- ১. বর্তমানে তাবলীগে বিদ্যমান দুটি পক্ষ সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা/পরামর্শক্রমে কাকরাইল মসজিদ ও টঙ্গী ইজতিমা ময়দানসহ দেশের সব জেলা ও উপজেলা মারকাজে সপ্তাহের ভিন্ন ভিন্ন দিনে/তারিখে তাদের কার্যক্রম (সাপ্তাহিক বয়ান ও রাত্রি যাপন, পরামর্শ ও তালীম, মাসিক জোড় ইত্যাদি) পরিচালনা করবে। তবে কোনো পক্ষ চাইলে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে পরামর্শক্রমে মারকাজ ব্যতীত অন্য কোনো মসজিদে/জায়গায়ও তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।

২.তাবলীগের আদর্শ ও চিরাচরিত রীতিনীতি অনুযায়ী কোনো পক্ষ অপরপক্ষের বিরুদ্ধে কোনোরূপ লিখিত বা মৌখিক অপপ্রচার চালাবে না।

৩. দেশের সব মসজিদে পূর্বের ন্যায় শান্তিপূর্ণভাবে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালিত হবে। সে লক্ষ্যে যে কোনো মসজিদে উভয়পক্ষের জামাতই যেতে পারবে। এতে কোনো পক্ষই কাউকে বাধা দিবে না। তবে একই সময়ে দুইপক্ষের দেশী ও বিদেশী জামাত একই মসজিদে অবস্থান করা যুক্তিসঙ্গত হবে না। এক্ষেত্রে যে পক্ষের জামাত আগে আসবে, সেই পক্ষের জামাত অবস্থান করবে। অন্যপক্ষের জামাত পার্শ্ববর্তী অন্য কোনো সুবিধাজনক মসজিদে চলে যাবে।

৪. উভয়পক্ষ তাদের ইজতিমা/জোড়ে তাবলীগের দেশী-বিদেশী মুরুব্বিদের আমন্ত্রণ জানাতে পারবে। এতে একপক্ষ অন্যপক্ষের কার্যক্রমে কোনোরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না।

৫. কোনো এলাকায় দু’পক্ষের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা দিলে স্থানীয় প্রশাসন উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

উক্ত পরিপত্রের তৃতীয় অনুচ্ছেদ থেকে জানা যায়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিগত ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ তারিখের ৩৬৬ নং পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত নির্দেশনা দেয়া হয়। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিগত ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ তারিখের ১৪২৮ নং স্মারকের মাধ্যমে কোনোরূপ কারণ উল্লেখ ব্যতীত হঠাৎ বর্ণিত পরিপত্রের কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়।

পরিপত্রটি যে প্রেক্ষাপটে জারি করা হয়েছিল, তা সময়োপযোগী বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তাছাড়া এর নির্দেশনাগুলো অত্যন্ত যৌক্তিক। তাই স্থগিতকরণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, বিশেষ করে এজন্য যে, স্থগিতাদেশে কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

পরিপত্রটি যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিত জারি হয়েছিল, তা উল্লেখ রয়েছে। আর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকায় এটি তার নির্দেশনায় হয়েছে বলে সুস্পষ্টরূপে ধারণা করা যায়।

প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদান উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। ফলে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নিয়ন্ত্রনাধীন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মতি/আলোচনা ব্যতীত স্থগিতাদেশটি জারি হয়ে থাকলে তা সরকারি কার্যক্রমে প্রতিষ্ঠিত রীতির ব্যত্যয় ঘটেছে বলে ধারণা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। পাঁচ দফা নির্দেশনার দিকে আলোকপাত করলে দেখা যায়- অত্যন্ত পক্ষপাতহীনভাবে দু’টি পক্ষের মধ্যে বিরোধ নিস্পত্তির লক্ষ্যে তা প্রণীত হয়েছে।

দেশের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশের সার্বিক শান্তি-শৃঙখলা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উক্ত নির্দেশনাগুলো অত্যন্ত বাস্তবসম্মতও বটে। বিশেষত কাকরাইল মসজিদসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ইতিমধ্যে বিভিন্ন রকম আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। এ অবস্থায় উক্ত পরিপত্রটি জারি করা অত্যন্ত যৌক্তিক বিষয় ছিল। কিন্তু তা কোনো কারণ উল্লেখ ব্যতীত স্থগিত করা একেবারেই সমীচীন হয়নি বলে মনে হয় ।

প্রসঙ্গক্রমে যে বিষয়টি এসে পড়ে তা হল, স্বাধীনভাবে ধর্মপালন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১২ নং অনুচ্ছেদে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধসহ সব ধর্মাবলম্বী বাধাহীনভাবে ধর্মচর্চা ও অনুসরণ করবেন- এটি সংবিধানের বিধান এবং বাংলাদেশের ঐতিহ্যও বটে।

তাবলীগ জামাতের দু’টি পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু একপক্ষ অন্যপক্ষের উপর হামলা করবে বা একপক্ষ অপরপক্ষের ধর্মচর্চায় বাধা দিবে, তা সংবিধান ও প্রচলিত আইন-কানুনের পরিপন্থী। এছাড়া তাবলীগ জামাতের দু’টি বিবাদমান পক্ষের মধ্যে তৃতীয়পক্ষ হিসেবে কিছু আলেম-ওলামা যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। বিশেষ করে একপক্ষ অপরপক্ষের বিরুদ্ধে কোমলমতি মাদ্রাসা ছাত্রদের লেলিয়ে দিয়ে ভাঙ্গচুর, মারধর, অবরোধ ইত্যাদি কোনোক্রমেই সমর্থনযোগ্য নয় বরং এটি দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে মারাত্মক অন্তরায়।

কিছুদিন পূর্বে নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের আচরণ দেশে যে অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি করেছিল, তা সবার জানা আছে। ফলে তাবলীগ জামাতের দুটি পক্ষের বিরোধ নিষ্পত্তি করতে যেয়ে কেউ তৃতীয়পক্ষ হয়ে কোনো পক্ষাবলম্বন করা আগুনে ঘি ঢালার শামিল। সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের উচিত, তাবলীগ জামাতের বিরোধপূর্ণ দু’পক্ষের সঙ্গে প্রথমে আলাদাভাবে এবং পরে একত্রে বসে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা।

এটি অত্যাবশ্যক বলে মনে হয়। মূলত এ লক্ষ্যেই পরিপত্রটি জারি হয়েছিল বললে ভুল বলা হবে না। অথচ কোনো কারণ উল্লেখ ব্যতীত পরিপত্রটির কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি হঠকারি সিদ্ধান্ত এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে এটি দেশের জন্য অমঙ্গল বয়ে আনবে বলেই মনে হয়।

পরিপত্রটির কার্যকারিতা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার এবং সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাবলীগ জামাতের দু’পক্ষের সঙ্গে আপস আলোচনার ভিত্তিতে অতি দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি করবে, এটাই প্রত্যাশা। এতে শান্তিপ্রিয় এ সংগঠনটির মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসবে; দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সমুন্নত থাকবে এবং আগামী বিশ্ব ইজতিমা শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের ভাবমুর্তি উজ্জল হবে বলে আশা করা যায়।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!