শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০, ০৮:৩০ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশে যেভাবে চলছে দেওবন্দ নামে স্বার্থের বানিজ্য

বাংলাদেশে যেভাবে চলছে দেওবন্দ নামে স্বার্থের বানিজ্য

মাওলানা আহমদ জামিল, তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম |
ইদানিং বাংলাদেশের একশ্রেনীর স্বার্থবাজ লোকদের মূখে কথায় কথায় দেওবন্দ আর দেওবন্দিয়ত খুব শুনা যায়। কেউ কেউ আরেকটু আগ বাড়িয়ে নিজেকে খাটি দেওবন্দিয়ত প্রমান করতে নামের শেষে কাসেমী, মাদানী ইত্যাদি ব্যাবহার করছেন।

কথায় কথায় দেওবন্দের উসুল, দেওবন্দের ফতোয়া, দেওবন্দের আর্দশ, দেওবন্দের টিকাদারী ও দেওবন্দের চেতনা নিয়ে তাদের মেকী মায়া কান্নার শেষ নেই। তাদের শয়নে -স্বপনে কেবল দেওবন্দিয়ত মসলকের চিন্তা চেতনা সদা সর্বদা জাগ্রত এমন একটি মেকী ভাব ফুটিয়ে তুলতে তারা অতি ব্যস্থ।

কথিত কিছু দেওবন্দি প্রেমি, নিজেদের ব্যক্তিগত দুরবিসন্ধির টার্গেট বাস্তবায়নে এখন সহজ হাতিয়ার হিসাবে ব্যাবহার করছে চেতনায়ে দারুল উলুম দেওবন্দকে। তাদের নষ্টামি ও ভ্রষ্টতা দেখে আপনি কিছু বলতে চাইলেও বলতে পারবেন না, কারন তারা সব সময় নিজেদের সেভ করতে দেওবন্দকে ঢাল হিসাবে সামনে মেলে ধরেন।

দেওবন্দ যা বলেনি নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য তা জোর গলায় ওজাহাতি করে বাজারে চালানোর চেষ্টা হচ্ছে। দেওবন্দ যা করেনি খোদ দেওবন্দের নাম ভাঙ্গিয়ে তা বলা হচ্ছে। দেওবন্দের নামে এতো বেশি মিথ্যাচার করছে কিছু স্বার্থবিলাসী লোক যে, নিকট অতীতের সকল মিথ্যাচারকে হার মানিয়েছে। এই জঘন্য কাজকে জোর করে পাবলিককে দ্বীন কাজ, দেওবন্দ চেতনার নামে গলানোর হীন চেষ্টা করা হচ্ছে।

আর দেওবন্দের নামে এই স্বার্থের বানিজ্যের প্রধান পুঁজি আজ মাদরাসার নিরিহ ছাত্ররা। পনের কোটি তৌহিদি জনতাকে দেওবন্দের নামে ওজাজাতি লাড্ডু খাওয়াতে চান? আপনার সমাবেশে তিল ধারনের ঠাই থাকে না! আপনার সমাবেশে মানুষ আর মানুষ। স, একটি কাজ করুন। একটি ওজাহাতির আহবান করুন। সেদিন বাংলাদেশের একটি মাদরাসাও বন্ধ থাকবে না। একটি ছাত্রও ক্লাস ছেড়ে বাইরে আসবে না। একটু দেখি কতলক্ষ তৌহিদি জনতা আপনাদের সাথে আছে? জানি কাজটি আপনি কখনও করবেন না। তাহলে অনেক জটিল অংক সহজে মিলে যাবে।

আপনি বলবেন, ছাত্ররা কি দেশের নাগরিক না? তাহলে তাদেরকে মাইনাস করতে হবে কেন? সরি। মাইনাস করতে বলছি না। তারা আপনাদের সাথে আছে, সাথেই থাকবে। এরা আর আপনাদের ছেড়ে যাবে কোথায়? বলছি বাইরের শক্তিটা একটু যাচাই করবার জন্য। এই শক্তি যাচাই করলে দেখা যাবে আপনারা কতোটা জনবিচ্ছিন্ন। দেওবন্দের নাম ভাঙ্গিয়ে এমন ভেলকিবাজি দ্বীনদার জনগনের বুঝতে বাকি নেই। আমাদের জানা নেই “একরাতে লাখ টাকার” বাজারী বক্তার ওজাহাতি বয়ান কোন দেওবন্দী আর্দশ আর আরকিবের চেতনা। এই গোটি কয়েক মাইকবাজ বাজারী বক্তার হাতেই পুরো কওমীঙ্গন আজ জিম্মি।

আরো অবাক করার তথ্য হল, এই স্বার্থপর শ্রেনী নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য দেওবন্দকে ব্যবহার করলেও ভিতরে ভিতরে বাংলাদেশের এলমি ও দ্বীনী সকল মার্কাজ ও কওমী অঙ্গনের মূল স্পীটকে দেওবন্দ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে মড়িয়া হয়ে কাজ করছে। আমাদের শিক্ষা কারিকুলম, ইসলামী মাহফিল, দাওয়াতে ইলা আল্লাহর মোবারক মেহমত, সিয়াসি অঙ্গনসহ কওমি মাদরাসাগুলোকে দেওবন্দের মূলনীতি, আর্দশ,চেতনা, নীতি, নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করার সুগভীর চক্রান্ত্রে তারা মড়িয়া হয়ে কাজ করছেন। শেকড় থেকে সব দ্বীনী সেক্টরকে বিচ্ছিন্ন করার মিশন নিয়ে কাজ করছে এই চক্রটি।

তাদের মূখে দেওবন্দ,দেওবন্দ তাছবিহ জপা দেখে সু-লেখক, গবেষক বহুগ্রন্থপ্রণেতা বন্ধুবর রশীদ জামীল ভাইর একটি লেখার কথা মনে পড়ে গেল। “আহলে হক্বের মিছিল আর দেওবন্দের স্লোগান : লেবু বেশি চিপলে তিতাই হয়” শিরোনামে এই দেওবন্দি চেতনাবাজ কিছু বানিজ্যিক আলেমদের নিয়ে একটি চমৎকার স্বল্পদীর্ঘ লেখা লিখেছিলেন। বন্ধুদের জন্য নিম্নে তার চুম্বকায়িত কিছু অংশ তুলে ধরা হল…

“উপ-মহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূতিকাগার ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ, কওমি বিশ্বের সূচনা। বাংলাদেশে কওমি ধারার আবর্তন যাদের দ্বারা প্রবর্তিত, প্রায় সব-সকলেই দেওবন্দের প্রডাকশন। অস্বীকার করবার কোনোই দরকার নেই দেওবন্দ এদেশের ম্যাজরিটি উলামার প্রেরণার উৎস। দেওবন্দ এমন কিছু লোক তৈরি করে দিয়েছে যারা তাদের সাধ্যের সর্বোচ্চ দিয়ে সাত্যিক সামিয়ানা টাঙিয়েছেন। কিন্তু ‘দেওবন্দই একমাত্র সত্যের মানদণ্ড, কেউ যদি দেওবন্দি হোন তবে ঠিকাছে, আর নাহলে তিনি যত যা যেমনই হোন তিনি আর আহলে হক্ব হতে পারলেন না। তিনি হয়ে গেলেন ‘আহলে না-হক্ব’; এমন যাদের স্বপ্ন সমস্যা হয়, তারা যে প্রস্তর যুগের ক্লোন, এ ব্যাপারে আর সন্দেহ থাকবার কোনোই কারণ নাই।

ইদানীং অতি দেওবন্দিয়াতি বন্ধনায় নাক-কান-চোখ-মুখ ঝালাপালা হবার যোগাড়! কিছু কারো অতিরাঞ্জিক ব্যাঞ্জনার বিস্ফোরণ দেখে বোকা হয়ে বসে থাকি। বোকা নিজেকেই হতে বলি কারণ, যাদের এসব করতে দেখি, সকলেই সাড়ে তিন হাত। একদম পাক্কা, এক ইঞ্চিও কম না। তাদেরকে বোকা ভাবি কেমন করে! আর নিজেই বোকা হয়ে যাই বলে আর বোঝা হয়ে ওঠে না তাদের মুখে যতবার দেওবন্দের নাম আসে, তার কত স্থর বর্গমূলে মদিনার উচ্চারণ! বুঝে ওঠা হয় না দেওবন্দ দেওবন্দ বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলার আলাদা ফজিলত কোন কিতাবে লেখা আছে!

স্বাস্থ্য সম্পদ। স্বাস্থ্য আবার বেমারও। নির্ভর করে সুস্থতার সাথে স্বাস্থ্যের আনুপাতিক সম্পর্কের উপর। যদিও চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, শরীরের সুস্থতার নামই স্বাস্থ্য কিন্তু স্বাস্থ্য যখন অসুস্থতায় রূপ নেয় সেটা তখন যন্ত্রণা দেয় বেশি। সম্প্রতি এই দেওবন্দি স্বাস্থ্য-জনিত অসুস্থতার উপসর্গগুলোকে সমুদ্র পিষ্ট থেকে আশংকা সংখ্যক মিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে দেখছি। দেখতে না চাইলেও ইচ্ছার বিরুদ্ধেই দেখতে হয় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অপরিপক্ব ইসলামী রাজনীতির দিন দুগুনি রাত চৌগুনি ব্যর্থতাকে ঢাকতে কাসিম নানুতবীর স্বাপ্নিক আঙিনাটিকে ধরে টানা-হেচড়া করা হচ্ছে। তারপর— যা পাও যত পারো উদরপুরে পুরে নাও, তারপর গান গাও-এক আওর এক গিয়ারা— যো কায়ি থে আপনা-পর, সব আবি ইয়ারা!!”

“দারুল উলুম দেওবন্দ নিঃসন্দেহে আলেম উৎপাদন কেন্দ্র। আহলে হক্বের ঘাটি। কিন্তু দেওবন্দকে হক্বের একমাত্র ঘাটি মনে করলে সেটাকে মূর্খতা ছাড়া আর কিছু বলার থাকবে না। দেওবন্দই একমাত্র হক্বের মাপকাঠি নয়। কেউ দেওবন্দি না হলে বা দেওবন্দকে এড়িয়ে চললে তাকে মোটেও ছোট ভাবার কারণ থাকা উচিত না। কোনো দেওবন্দি আলেমের চেয়ে জীবনে একবারও দেওবন্দ নাম মুখে নেননি, এমন কোনো কোনো আলেম অনেক বেশি বিজ্ঞ থাকার সম্ভাবনা কি কোনোভাবেও উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ আছে? কেনো তবে এই বালখিল্যতা?”

“—-সোজা-সাপ্টা শব্দেই বলছি। দেওবন্দের সাথে বাংলাদেশি আলেমদের মিল খুঁজতে যাওয়ার সুযোগ, অধিকার, ক্ষমতা, নৈতিক ন্যায্যতা বাংলাদেশের কোনো আলেম রাখেন না। দেওবন্দ দেওবন্দ বলে মুখে ফেনা তুলে ফেললেই তো আর হল না। কথা আর কাজে তো মিল থাকতে লাগবে। আমার দেশের ছোট-বড়-মাঝারি সবগুলো কওমি মাদরাসাই নিজেদের দেওবন্দের অনুসারি বলতে ভালবাসে।
কেউ কি আমাকে বাংলাদেশের এমন #একটি_মাদরাসার নাম বলতে পারবে, যেটি আসলেই দারুল উলুম দেওবন্দকে অনুসরণ করে চলছে? যে মাদরাসায় দারুল উলুম দেওবন্দের উসুলে হাশতেগানা ফলো করা হচ্ছে? যদি না হয়, না করা হয় যদি, তাহলে কথা আর কাজে মিল থাকল কই? তবে কেন খামাখা এই ভাওতা বা—।

———— দারুল উলুম দেওবন্দ ছিল সারা দেশের কওমি আলেম-উলামা ও মাদরাসাগুলোর গর্বের প্রতীক। এটাকেও আজকাল অতি উৎসাহী কিছু মানুষ তাদের ব্যক্তিগত প্রপার্টি ভাবতে শুরু করে দিয়েছেন। রাজনৈতিক ব্যবসার বাণিজ্যিক পণ্য করে ফেলা হয়েছে। আর এই দেওবন্দি চেতনার যাতনায় জাতি আজ পিষ্ট। উত্তরণের উপায় খুঁজে পেরেশান!”

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!