শনিবার, ১৭ অগাস্ট ২০১৯, ১১:৩৪ অপরাহ্ন

তাবলিগ জামায়াতে মূল সমস্যাটা কি?

তাবলিগ জামায়াতে মূল সমস্যাটা কি?

-: সৈয়দ মবনু :-

‘যার মুর্শিদ নেই তার মুর্শিদ শয়তান’ কথাটা প্রথম যখন শোনেছিলাম তখন খুব রাগ উঠেছিলো মাথায়। কিন্তু যখন ব্যবস্থাপনা বা ম্যানেজিং বিষয়ে কিছু লেখাপড়া করলাম তখন স্পষ্ট হলো কথাটার দার্শনিক ব্যাখ্যা। মুর্শিদের অর্থ ক্ষেত্রবিশেষ নেতা, লিডার, আমির, পির, কমরেড, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, রাজা-বাদশা ইত্যাদি। নেতৃত্ব ছাড়া কোনকিছুই সঠিকভাবে সঠিকপথে চলতে পারে না। আমি গ্রাম থেকে নিয়ে শহর-নগর-মহানগরের অসংখ্য পরিবারের সাথে জড়িয়ে দেখেছি, বেশিরভাগ পরিবার বিপথগামি হয় সঠিক নেতৃত্বের অভাবে। জীবনের পরতে পরতে মুর্শিদ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাবলিগের মুরুব্বীরা বলেন, যেখানে তিনজন একসাথে চলবে সেখানে একজনকে আমির করে না নিলে শয়তান ধোঁকা দিতে পারে।

আজকের আমরা আলোচনা করবো তাবলিগের বর্তমান সমস্যা বিষয়ক। তাবলিগে বর্তমানে যা চলছে তার মূল্যে সমস্যাটা কোথায়? প্রকৃত অর্থে পিপিলিকা হয়েগেছে এখানে হাতি। আমরা সবাই কথাবার্তায় পিপিলিকাকে হাতি মানিয়ে সবজায়গায় উপস্থাপন করছি। তাবলিগে হজরতজী বলা হয় কেন্দ্রীয় আমিরকে। যতটুকু জানাযায়, তৃতীয় হযরতজী মাওলানা এনামুল হাসান মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে দশজনের একটি সুরা তৈরি করেছিলেন পরবর্তী আমির নিয়োগের জন্য। এই দশজনে ছিলেন হযরত মাওলানা সাইদ আহমদ খান, মাওলানা উমর পালনপুরী, মাওলানা মেয়াজী মেহরাব সাহেব, মাওলানা ইজহারুল হাসান, মাওলানা সাদ, মাওলানা জুবায়ের হাসান, বাংলাদেশ থেকে হাজী আব্দুল মুকিত এবং পাকিস্তান থেকে হাজী আব্দুল ওয়াহাব প্রমূখ। তারা তিনদিন বৈঠক করেছেন পরবর্তী আমির নিয়োগের জন্য। সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেননি। পরে মাওলানা ইজহারুল হাসান, মাওলানা জুবায়ের হাসান ও মাওলানা সাদকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এভাবে চলতে থাকে। এরই মধ্যে মাওলানা ইজহারুল হাসান ও মাওলানা জুবায়ের হাসান মারা গেলে দায়িত্ব একা এসে যায় মাওলানা সাদ-এর উপর। মাওলানা সাদকে যারা মানতে পারছিলেন না তারা শুরু করলেন বিভিন্ন ষড়যন্ত্র। তারা বললেন, আমির বা কারো একক নেতৃত্বের প্রয়োজন নেই। সুরার মাধ্যমে কাজ চলবে। আলমি শূরা (আন্তর্জাতিক পরামর্শ পরিষদ) গঠন করা হোক। মাওলানা সাদ পরামর্শের ভিত্তিতে জানালেন আলমি শূরা গঠন করা যেতে পারে তবে আমির ছাড়া শূরার কোন মূল্য নেই। তা ছাড়া এখানে কাজ হলো দাওয়াতের। আমরা যখন দাওয়াতে তাবলিগের কাজে মাঠে যাই তখন মাঠে একজন আমির থাকেন। তখন সেখানে একটা শুরা থাকে। আমাদের প্রত্যেক স্থানে স্থান ভিত্তিক শূরা এবং আমির রয়েছেন। সাধারণত আমরা তিন সময় আন্তর্জাতিকভাবে মিলিত হই। যেমন ১. ঢাকায় বিশ্ব ইজতিমায়, ২. রায়বন্ডের ইজতিমায় ৩. হজ্বের মৌসুমে। এই তিন সময়ে যদি আমরা আঞ্চলিক আমিরদের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারি তবে তা-ই হবে আলমি শূরা। এখানে পৃথক করে আবার আলমি শূরার কোন প্রয়োজন নেই। তাবলিগে যারা নিয়মিত সময় দিতেন তারা বিষয়টির সাথে সহমতে এসেগেলেন।
তাবলিগের কাজে মাওলানা সাদ সাহেবের গুরুত্ব কি শুধু তাবলিগের দায়িত্বশীল হিসাবে? মোটেও নয়। তিনি একজন মুহাক্কিক বড় আলেম এবং তাবলিগের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ইলিয়াস (র.)-এর নাতির ঘরের পনতি। এই বিষয়গুলো বিবেচনা করে তো তার একটা গুরুত্ব এবং প্রভাব অবশ্যই রয়েছে। নেতৃত্বের লোভে যারা লম্পঝম্প শুরু করেছিলেন তারা দেখলেন মাওলানা সাদের বক্তব্যে মূল তাবলিগিরা মেনে নিচ্ছেন। তাদের উদ্দেশ্য আর হাসিল হচ্ছে না। তাই তারা নতুন চিন্তা শুরু করলেন, মাওলানা সাদকে কীভাবে বের করা যায়। তারা মাওলানার বিভিন্ন বক্তব্যের পূর্ব-পশ্চিম বাদ দিয়ে শুধু এই কথাগুলো উলামায়ে কেরামের সামনে উপস্থাপন শুরু করলেন যা শোনলে উলামারা মাওলানা সাদকে বিভ্রান্ত মনে করতে পারেন। এক্ষেত্রে প্রথম সবচে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বাংলাদেশের আমেরিকা প্রবাসী ড. আব্দুল আউয়াল এবং ব্যাঙ্গুলুরের ভাই ফারুক। তারা মাওলানা সাদ-এর তারবিয়তি বক্তব্যের খন্ডাংশ রেকর্ড করে বিভিন্ন স্থানে প্রচার করতে থাকলে কিছু আলেম-উলামা বিভ্রান্ত হতে থাকেন। তাদের মধ্যে যাদের মাওলান সাদের সাথে সম্পর্ক রয়েছে তারা সরাসরি বিষয়টি মাওলানা সাদের দৃষ্টি আকর্ষন করলে তিনি তার বক্তব্যের শানে নুজুল বর্ণনা করেন এবং তা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। যতটুকু জানাযায়, দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে মাওলানা সৈয়দ আশরদ মাদানী নিজে মাওলানা সাদের সাথে তিনঘন্টা বৈঠক করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত বলেছেন, খুব শান্ত মাথায় ষড়যন্ত্রের মোকাবেলা করতে। মাওলানা সৈয়দ আশরদ মাদানী আরও বলেছেন, তাবলিগের মধ্যে যে সমস্যা তা তাদের নিজস্ব, এতে আমাদের কোন বিষয় নেই। আমাদের অভিযোগ যেখানে ছিলো তা মাওলানা সাদ রুজু করে নিয়েছেন। মাওলানা সৈয়দ মাহমুদ মাদানী তো সরাসরি মাওলানা সাদ-এর পক্ষে কথা বলেছেন। দারুল উলূম দেওবন্দের নাজিমে মুফতি মাওলানা আসাদ উল্লাহ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, মাওলানা সাদ-এর বিরুদ্ধে আমাদের কোন অভিযোগ নেই। এখানে সমস্যাটা হলো তাবলিগের নিজস্ব নিয়ম-নীতি বিষয়ক। তা ছাড়াও আল্লামা সালমান নদভী, আল্লামা রাবে হাসান নদভী, আল্লামা উসমান, নিজামুদ্দিনের মাওলানা আব্দুস সাত্তার, মাওলানা জমশেদ, মাওলানা শামীম, মাওলানা ইয়াকুব এবং শায়খুল হাদিস মাওলানা জাকারিয়া (র.)-এর খলিফা ইংল্যান্ডের বেরি মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল মাওলানা ইউসুফ মোতালা, মাওলানা মোশাররফ, মাওলানা মনির বিন ইউসুফ, মাওলানা ইয়াহিয়া মাহমুদ, মাওলানা আব্দুল করিম, মাওলানা মুফতি সৈয়দ নোমান, মাওলানা আনোয়ার প্রমূখের মতো খ্যাত-বিখ্যাত বড় বড় আলেম-উলামা প্রকাশ্যে মাওলানা সাদ সাহেবের পক্ষে কথা বলছেন। যখন দেখি কেউ কেউ বলেন, সাদ বনাম উলামার সংঘাত তখন মনে প্রশ্ন জাগে উলামা মানে কি? আমি যাদের নাম বললাম, ওরা কি উলামা নয়? মাওলানা সাদ ও তার পরিবারও কিন্তু উলামা পরিবার। এই পরিবরেরই সন্তান মাওলানা ইলিয়াস এবং মাওলানা জাকারিয়া (র.)। সাদপন্থী এবং উলামাপন্থী কথাটা সত্য নয়। এখানে উভয়গ্রুপই উলামাপন্থী।

ছাগলের তৃতীয় ছানার মতো যারা এই সংঘাতকে সাদ বনাম উলামাদের সংঘাত মনে করছেন কিংবা মনে করে প্রচার করছেন তারা মূলত অজ্ঞ নতুবা অন্ধ। আর যারা মূল নাটাই চালাচ্ছেন তারা হলেন ঘটনার নাটেরগুরু। সংঘাতটা মূলত শুরু করেছিলো একদল ছোট চিন্তার মানুষ। যাদের চিন্তার দৌঁড় ছিলো শুরার সদস্য হওয়া পর্যন্ত। কিন্তু তারা তা হাসিল করতে না পেরে বিষয়টিকে সামনে নিয়ে যায় সাদ সাহেবের বক্তব্যকে বিকৃত করে। অতপর বিষয়টা চলে যায় আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মাফিয়াচক্রের নজরে। তারা এখন সাদ কিংবা দেওবন্দি কিছুই বুঝে না। তাদের যুদ্ধের বিষয় এখন পাকিস্তান আর ভারত। এখন তাবলিগের মধ্যে লড়াই চলছে নেতৃত্ব ভারতের তাবলিগি আলেমদের হতে থাকবে না পাকিস্তানের আলেমদের হাতে। পাকিস্তানিরা চাচ্ছেন নিজামুদ্দিন থেকে মারকাজকে রায়বন্ড নিয়ে যেতে। এজন্য পাকিস্তানের তাবলিগি-ননতাবলিগি সব আলেক ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন। বাংলাদেশের আলেমদের মধ্যে যাদের পাকিস্তানি আলেমদের সাথে বেশি সম্পর্ক তারা এবং তাদের শিষ্যরা মাওলানা সাদের বিরুদ্ধে। যারা মূল তাবলিগি তারা কিংবা যারা ভারতের আলেমদের সাথে সম্পর্কিত তারা মাওলানা সাদ-এর পক্ষে। পাকিস্তানপন্থীরা যদি তাদের মিশনে সফল হয়ে যান তবে বিশ্বইজতেমাও বাংলাদেশ থেকে ধীরে ধীরে চলে যাবে পাকিস্তানের রায়বন্ডে এবং ধীরে ধীরে তাবলিগও তার মূল নুর কিংবা আলো হারিয়ে ফেলবে। কারণ প্রতিক্রিয়াশীল কোন জিনিষই মূলে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। তাবলিগের বিষয়গুলো হয়তো আর সমাধান হবে না। হয়তো পাকিস্তানীরা পৃথক হয়ে নিজেদের পৃথক মারকাজ করে নিবে। হয়তো কিছুদিন হিংসা-প্রতিহিংসায় একেঅন্যের বিরুদ্ধে কথা বলবেন। তবে আমার বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত মুখলিসরাই বিজয়ী হবেন দুনিয়া এবং আখেরাতে।

শেষকথা হলো যারা বলেন শূরা দিয়ে তাবলিগের কাজ চালাবেন তাদের সাংগঠনিক কোন জ্ঞান অবশ্যই নেই। শূরা হলো পরামর্শের জন্য। কিন্তু প্রতিটি শূরায় একজন আমিরে ফায়সাল থাকতে হয়, নতুবা কোন পরামর্শই সিদ্ধান্তে পৌঁছে না। দুনিয়ার ইতিহাসে ধর্মীয় হোক কিংবা দুনিয়াবী, সর্বক্ষেত্রে দুয়ের অধিক মানুষ মিলে কোন কাজ করতে হলে একজনকে আমীর, মুর্শিদ, লিডার, আমিরে ফায়সাল যেকোন এক উপাধী দিয়ে নেতৃত্ব দিতে হয়। নেতৃত্ব হাওড় কিংবা পথ থেকে ধরে এনে কাউকে দিলে কাজ চলে না বরং ধ্বংস হয়ে যায়। নেতৃত্ব তাকেই দিতে হয় যিনি এই কাজের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-চিন্তা-চেতনার সাথে একমত এবং একাজের নিয়ম-নীতি-পদ্ধতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞ। মাওলানা সাদ এক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ যোগ্য, তা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। আবেগ দিয়ে আপনি আমি আমাদের নিজেদের শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির নাম বলতে পারবো, কিন্তু তা কাজের জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে, সেই বিবেচনা রাখতে হবে। আরিফবিল্লাহ হাফেজ মাওলানা আকবর আলী (সাবেক ইমাম দরগাহ মসজিদ) প্রায়ই আমাকে বলতেন, শুধু বুজুর্গী দিয়ে রাষ্ট্র চলে না। রাষ্ট্র চালাতে রাষ্ট্রীয় জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। তেমনি আজ বলতে চাই, শুধু আলেম হলেই তাবলিগ জামায়াতের নেতৃত্ব দেওয়া চলবে না। এখানে পূর্ব অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে মাফ করুন। হেদায়াত দান করুন। সহীহ পথ পদর্শন করুন।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!