শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০, ০৯:৫৯ পূর্বাহ্ন

তারিক জামিলের এতো লুকোচুরি কেন? হাজী সাহেবের লাশ নিয়ে ফাহিমের ব্যার্থ রাজনীতি

তারিক জামিলের এতো লুকোচুরি কেন? হাজী সাহেবের লাশ নিয়ে ফাহিমের ব্যার্থ রাজনীতি

শামীম হামিদী, অতিথি লেখক,তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম |

মাওলানা তারিক জামিল সাহেব, যাকে তাঁর ভক্ত আশেকানগণ মুহাব্বাত করে MTJ ডেকে থাকেন, তিনি কিছুদিন পূর্বে একটা অজাহাত দিয়েছিলেন। হাজী সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহির ইন্তেকালের কারণে যদিও এটিও বর্তমানে অপ্রাসাঙ্গিক হয়ে গিয়েছে। কিন্তু হাজী সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহির ইন্তেকালের কয়েকদিন আগে হঠাৎ করেই তারিক জামিল সাহেবের একটি অডিও ভাইরাল করেন আমাদের দেশের বহুল আলোচিত এক কাজ্জাব সাহেবের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল আইডি। তবে অডিওটি বেশ কিছুদিন পুরানো। আমরা আগেই পেয়েছিলাম। কিন্তু এটা এত উৎসাহ নিয়ে এত প্রচার করার কি হল তাও বুঝলাম না। সেখানে তিনি নতুন তেমন কিছুই বলেন নি। বরং সেখানে তিনি পরিষ্কার ভাবেই স্বীকার করেছেন তারা যে শূরার কথা বলছেন সেটা আলমী শূরা নয়। বাকিগুলো পুরাতন কথাই। যা তিনি বরাবরের মতই খানিকটা কূটনৈতিক গ্যাপ রেখেই বলেছেন, যাতে আলমী শূরার সমর্থক ও অপব্যবহারকারীগণও অডিওটি নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করতে পারেন। এমন কাণ্ড তিনি আগেও করেছেন।

এখানে তিনি শুরুতেই অজাহাত করেছেন আলমী শূরা কিভাবে বানানো হয়েছিল। তিনি বলেছেন অনেকে দাবী করছেন কোন শূরা বানানোই হয়নি। কিন্তু তিনি যেহেতু এর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিলেন তাই তিনি কিছু অজাহাত করছেন।

 

তবে আমরা যারা আলমী শূরা বানানোর প্রক্রিয়া নিয়ে কৌতূহলী ছিলাম তিনি তাদের হতাশাই উপহার দিয়েছেন। তিনি দাবী করেছেন মুরুব্বীরা মিলে এই শূরা বানিয়েছেন। কিন্তু যথারীতি তিনি তাঁর বর্ণিত সেই মুরুব্বীদের নাম চেপেই গেলেন। আমাদের জানতেই দিলেন না তাঁর বর্ণিত সেই মুরুব্বীরা কারা ছিলেন? আমরা জানতে চেয়েছিলাম হযরতজী ইনআমুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহির বানানো জামাতের দুই সাথী তখনও জীবিত, রায়বেন্ড ইজতেমার মওকায় তাঁরা দুইজন এবং বাংলাদেশের বিশ্বের অন্যান্য আর কিছু দেশের মুরুব্বীরা সেখানে ছিলেন, তাঁরা কেউই জানলেন না! বাংলাদেশ থেকে যে তিনজনকে রাখা হল কথিত আলমী শূরায় তাঁরাও কেউ জানলেন না! তাহলে বানাল কারা? কোথায়, কবে, কখন, কার কার উপস্থিতিতে এই শূরা বানানো হয়েছে? কোন মাসোয়ারায় বানানো হয়েছে? ঐ মাসোয়ারার ফয়সাল কে ছিলেন? ঐ মাসোয়ারায় আর কি কি উমুর ছিল? ঐ মাসোয়ারার কাতেব কে ছিলেন? ঐ মাসোয়ারার পর্চাটা কোথায়? এগুলো জানতে চেয়ে চিঠিও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু চিঠির জবাব পাওয়া যায় নি। তারিক জামিল সাহেব যা-ও একটু অজাহাত করলেন কিন্তু তিনিও এড়িয়ে গেলেন! এত লুকোচুরি কেন? এটা কি আসলেই এই মহান আমালে নবুওয়াতকে সামাল দেয়ার জন্য একটা শূরা ছিল, নাকি কিছু বৃদ্ধ বালকদের লুকোচুরি খেলা ছিল?

 

হাজী সাহেবের ইন্তেকালের পরে এই প্রশ্নটি আর বড় করে দেখা গেছে। আসলেই কি পাকিস্তানের হযরতরা কখনো আলমী শূরা চেয়েছিলেন নাকি নিজামুদ্দিন থেকে বের হয়ে যাওয়া অভিমানী হযরতদের ব্যবহার করে মাথায় সাময়িক নুন রেখে বরই খেয়েছেন মাত্র? এই প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি। তার আগে তারিক জামিল সাহেবের অজাহাত থেকে আর একটি প্রসঙ্গ।  সেই অজাহাতে বরাবরের মতই তিনি মুহরাতাম হাজী সাহেবের নাম ব্যবহার করেছিলেন। হাজী সাহেব তখনো হায়াতে ছিলেন। তিনি দাবি করেছেন হাজী সাহেবের সাথে তাঁর ঐদিন রাতেও কথা হয়েছে। সেখানে নাকি হাজী সাহেব তাঁকে আবারো কিছু কথা বলেছেন যা তাঁদের বর্ণিত আলমী শূরার পক্ষে যায়। হাজী সাহেব রহঃ নাকি মাওলানা সাহেবকে বলেছেন তিনি নতুন কোন শূরা বানান নি। তিনি হযরতজী ইনআমুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহির জামাত পূরণ করেছেন মাত্র।

 

◆ এখানে কয়েকটি কথা এসেই যায়ঃ

১। এই কথাটি মাওলানা তারিক জামিল সাহেবের আগের দাবির সাথে সাংঘর্ষিক। তিনি আগে দাবি করেছিলেন তাঁরা আলমী শূরা বানিয়ে হাজী সাহেবের কাছে যান। হাজী সাহেব ১০১ বার ইস্তেখারার দুআ পরে সাইন করেন এবং অনুমোদনের জন্য মাওলানা সাদ সাহেবের কাছে পাঠিয়ে দেন। অর্থাৎ এ কথা পরিষ্কার হাজী সাহেব এই শূরা বানান নি। এবং অনুমোদনও করেন নি। বরং অনুমোদনের জন্য মাওলানা সাদ সাহেবের কাছে পাঠিয়েছিলেন। হাজী সাহেব রহমাতুল্লহি আলাইহি সাইন করতে চান নি বরং তাঁদের চাপাচাপিতেই হয়ত করেছেন, এটা বুঝাই যায়। কেননা তিনি ১০১ বার ইস্তিখারার দুআ পড়েছেন।

২। ২০০০ সালে নিজামুদ্দিন এবং রায়বেন্ডের হযরতদের মধ্যে এক সমঝোতার কারণে হাজী সাহেব একা এই শূরা বানাতে পারতেন না। এই সমঝোতার কথা উল্লেখ করে নিজামুদ্দিনের হযরতগণ এবং কাকরাইলের হযরতগণ একাধিক দফায় হাজী সাহেবকে জিজ্ঞাসা করেন মাওলানা সাদ সাহেবের অজান্তে এই শূরা কিভাবে বানানো হল? হাজী সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহি পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন তিনি বানাননি। উল্লেখ্য এই কথাগুলোও চিঠিতে উল্লেখ করে আলমী শূরার সবার কাছে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে পাকিস্তানের কিছু হযরতদের নামও আছে অমুকের অমুকের সামনেই হাজী বলেছেন যে তিনি এই শূরা বানান নি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক আজ পর্যন্ত মাওলানা তারিক জামিল সাহেব বা অন্যান্য যারা হাজী সাহেব রহঃ এর নাম ব্যবহার করে যত কথা দাবী করেছেন তাঁদের কেউই কোন কথার সাথেই কোন সাক্ষীর উল্লেখ করতে পারেন নি।

 

৩। হাজী সাহেব রহঃ কেন শুধু তারিক জামিল সাহেবকেই চুপিচুপি বলতেন? জনসম্মুখে কিছু বলতেন না কেন? নাকি সত্য ফাঁস হয়ে যাবার ভয়ে তাঁকে জনসম্মুখে আসতে দেয়া হত না? MTJ সাহেবরাই বা কেন হাজী সাহেব রহঃ এর কথা রেকর্ড রাখতেন না? তিনি তো ইতিমধ্যেই একজন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। মিডিয়াতে এবং ক্যামেরার সামনেই তিনি বড় বড় প্রোগ্রাম করে থাকেন। এই প্রশ্নের জবাব হাজী সাহেব রহমাতুল্লহি আলাইহির ইন্তেকালের পরবর্তী ঘটনা প্রবাহেই এসে গেছে।

 

আসল সত্য হল, হাজী সাহেব রহঃ কখনোই এই আলমী শূরা বানান নি। তিনি এটা পছন্দও করেন নি। কখনো পাত্তাও দেন নি। আলমী শূরার পক্ষ হয়ে মাওলানা ইবরাহীম সাহেব, মাওলানা আহমাদ লাট সাহেব দুই ব্যক্তিকে রায়বেন্ডের শূরার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। হাজী সাহেব পরিষ্কার ভাষায় জবাব দেন, আপনাদের কুরবানীর কারণে আপনাদের বয়ানের জন্য ডাকি। কিন্তু আমাদের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে আপনাদের মাথা গলানোর দরকার নেই।

 

◆ এবার আমরা হাজী সাহেব রহমাতুল্লহি আলাইহির ইন্তেকালের পরবর্তী ঘটনা প্রবাহের দিকে তাকাই। তাহলে বুঝা যাবে কথিত আলমী শূরা আদৌ তাবলীগী কোন শূরা ছিল না কি কিছু বয়োবৃদ্ধ সাথীদের চিত্তবিনোদনের জন্য একটি খেলাধুলামূলক দল ছিল?

 

প্রথমতঃ আমাদের আলমী শূরার ঝানু খেলোয়াড়গণ প্রত্যেকেরই পাকিস্তানের ভিসা ছিল, কিন্তু কেউই পাকিস্তান যান নি। আধা সপ্তাহ আগেই তাঁরা পাকিস্তানেই ছিলেন। ডাক্তার বুধবারই জানিয়েছেন হাজী সাহেবের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে, কৃত্রিম উপায়ে চালু রাখা হয়েছে। দুই একজন থেকে গেলেও পারতেন। কিন্তু থাকেন নি। কেন? তাহলে কি তাঁরা পাকিস্তানে থাকা অবস্থাতেই বুঝতে পেরেছিলেন আসলে আলমী শূরার নামে তাঁদের ধোঁকা দেয়া হয়েছে। হাজী সাহেব রহঃ এবং আলমী শূরার আড়ালে আসলে অন্য গেম চলছে! পক্ষান্তরে নিজামুদ্দিন থেকে ঠিকই জামাত গিয়েছেন।

 

দ্বিতীয়তঃ আমাদের বাংলাদেশ থেকেও কেউ যান নি। যাবার চেষ্টাও করেন নি। কোন শোকবার্তাও পাঠান নি। যে ওমর ফারুক সাহেব দীর্ঘদিন হাজী সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহির মুখের কাছে কান লাগিয়ে বয়ান শুনে তরজমা করেছেন তিনিও না! কি ব্যাখ্যা এর? সারা দেশে অজাহাত করে বেড়াচ্ছেন, এর একটা অজাহাত কি করবেন? হাজী সাহেব তো কারো শত্রু ছিলেন না। তাহলে কেন যাবার চেষ্টা করলেন না।  নাকি প্রতারিত হবার দুঃখে ও ক্ষোভে মাথা ঠিক নেই। মূলধারার অনুসারীদের পক্ষে ঠিকই তাজিয়া পাঠানো হয়েছে।

◆ হাজী সাহেব রহঃ এই ইন্তেকাল পরবর্তী নাটকীয় ও উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহঃ

এবার আসল কাহিনী। হাজী সাহেবের জানাজা শেষ হবার আগেই রায়বেন্ডের পরবর্তী ফয়সাল ঘোষণা করা হয়। বলা হয় যে, এটা হাজী সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহির ওয়াসিয়ত। এ সময় কিছু দৃষ্টিকটু দৃশ্যের অবতারণা হয়। কথিত আলমী শূরার অন্যতম ভোকাল মাওলানা তারিক জামিল সাহেব উপস্থিত শোকার্ত জনতার উদ্দেশ্যে সান্ত্বনামূলক বক্তব্য দিচ্ছিলেন। কিন্তু তাঁদেরই অন্যতম মাস্টারমাইন্ড মৌলভী ফাহীম সাহেব এবং আরো কয়েকজন দৃষ্টিকটু ভাবে দাঁড়িয়ে যান। তাঁকে তাঁর বক্তব্য শেষ করতে না দিয়েই এক রকম মিম্বর থেকে নামিয়ে দেন বলা চলে। এ সময়, উপস্থিত জনতার মধ্যেও উত্তেজনা দেখা দেয়।

 

সেখানেই পর পর তিন জন ফয়সালের নাম ঘোষণা করেন যে এখন থেকে ফয়সাল থাকবেন মাওলানা নজরুর রহমান সাহেব। তিনি না থাকলে মাওলানা আহমাদ বাটলার সাহেব। তিনিও না থাকলে ওবায়েদুল্লাহ খুরশিদ সাহেব। এই ঘোষণাটি করেন মৌলভী ফাহিম সাহেবের অন্যতম সহযোগী মৌলভী আহমাদ বাটলার সাহেব। তাদের দাবী এটা হাজী সাহেবের অসিয়ত। এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যটুকুও অসংখ্য প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

◆ এই কথিত অসিয়তনামার বৈশিষ্ট্যঃ

১। এখানে কোন শূরার ঘোষণা দেয়া হয়নি। বরং ফয়সালের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। মোট তিনজন ফয়সালের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কিন্তু বারি বারি করে ফয়সাল নয়। বরং একজন না থাকলে আরেকজন। অথচ আলমী শূরার নামে আমাদের এতদিন শুনানো হচ্ছিল যে কোথাও কোন আমীর থাকবে না। বরং শূরা থাকবে এবং বারি বারি করে ফয়সাল থাকবেন।

 

২। এই ঘোষণা হাজী সাহেবের নামে দেয়া হয়। বলা হয় যে এটা হাজী সাহেবের অসিয়তনামা তথা উইল। কিন্তু আলমী শূরার তত্ত্ব অনুসারে রায়বেন্ড মারকাজের সবকিছু আলমী শূরার মাতাহাতে হবার কথা। যে কোন সিদ্ধান্ত তৎকালীন ফয়সালের দেয়ার কথা, হাজী সাহেবের নয়। হাজী সাহেব রহঃ এর একক উইল কাজ করার কথা নয়।  দুই তৃতীয়াংশ শূরাদের ঐক্যমতের ভিত্তিতেই গুরুত্বপূর্ণ সব ফয়সালা হবার কথা।

 

৩। ঘোষিত তিন ফয়সালের একজন, মৌলভী আহমাদ বাটলার সাহেব আলমী শূরাতে ছিলেন না।

 

◆ তাই এই উইল নিয়ে অবধারিত ভাবেই কিছু প্রশ্ন এসে যায়ঃ

১। এত তাড়াহুড়া কেন? কিসের তাড়নায় জানাযার মজলিসে যখন সবার মন হাজী সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহির জন্য ভারাক্রান্ত এবং সকলেই সম্পূর্ণ অন্তরকরণ দিয়ে হাজী সাহেবের হাজী সাহেবের দরাজাত বুলন্দির জন্য ১০০% আল্লহর দিকে মুতাওয়াজ্জুহ তখনই কেন এই ঘোষণা করার দরকার পড়ল? আগেও তো বড় বড় আমীর সাহেবগণ বিদায় নিয়েছেন, তখন কি এমন তাড়াহুড়া ছিল? নাকি তখন সকলের মনোযোগ অন্যদিকে, তাই সুযোগ ও সময়ের সদ্ব্যবহার করার এটাই সর্বোত্তম সুযোগ ছিল যে এখন হাজী সাহেবের অসিয়তনামার দোহাই দিয়ে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা যাবে! বিতর্কও কম হবে।

 

২। হাজী সাহেব এই অসিয়ত কবে, কোথায়, কখন, কার কার সামনে করলেন? কেউ লেখা বা রেকর্ড করার প্রয়োজন মনে করলেন না কেন?

 

৩। হাজী সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহি, এবং তাঁর আগে হাজী বশির সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহি সকলেই নিজামুদ্দিন থেকে জিম্মাদারী প্রাপ্ত ছিলেন। হাজী সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহি সারা জীবন সারা বিশ্বের সাথীদের নিজামুদ্দিনের দিকে মুতাওয়াজ্জুহ করা গেছেন। তিনি জীবনের পড়ন্ত বেলায় চরম অসুস্থতা নিয়ে নিজামুদ্দিনের পরামর্শ ছাড়াই নিজে নিজে উইল করবেন, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য?

◆ আলমী শূরার ব্যাপারে এখন কিছু প্রশ্ন আসেঃ

১। মাওলানা সাদ সাহেব এবং ভাই ওয়াসিফুল ইসলাম সাহেব না হয় আলমী শূরা কবুল করেন নি? কিন্তু আলমী শূরার আহ্বায়কদের ভাষ্যমতে বাকিরা আলমী শূরা কবুল করেছেন। (যদিও হাজী সাহেব রহঃ, মাওলানা নজরুর রহমান সাহেব এবং মাওলানা এহসান সাহেব আলমী শূরা কবুল করেছেন এমন কোন লিখিত বা স্পষ্ট বক্তব্য তাঁদের থেকে পাওয়া যায় নি।) তাহলে কি তাঁরা নিজেদের মধ্যে এই আলমী শূরা বাস্তবায়ন করেছেন? তাঁদের রোটেশনের তরতীব কি? এই অনুসারে গত দুই বছরে তাঁদের কে কে কিভাবে আলমী ফয়সাল ছিলেন? কি কি ফয়সালা করলেন?

 

২। আলমী শূরা থাকতেও কেন আবার ফয়সাল বানানো হল? আলমী শূরার পাকিস্তানী সদস্যগণই তো বারি বারি রায়বেন্ড মারকাজের ব্যবস্থাপনা সামলাতে পারতেন।

 

৩। হাজী সাহেব রহঃ যদি আলমী শূরা কবুল করেই থাকেন, তাহলে তিনি আবার উইল করতে যাবেন কেন? এই ফয়সালা তো আলমী শূরার মাসোয়ারাতে হবার কথা। আলমী শূরার সকল সাথীদের ডেকে মাসোয়ারা করার কথা।

 

৪। মৌলভী ফাহিম সাহেবের ভাষ্যমতে হাজী সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহি যখন রায়বেন্ডের জন্য নতুন ফয়সাল তায় করেন তখন কি আলমী শূরাতে তাঁর বারি ছিল? তিনি কি বাকীদের রায় নিয়েছিলেন?

 

৫। মৌলভী আহমাদ বাটলার সাহেব আলমী শূরাতে না থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁকে পরবর্তী ফয়সাল বানানো হল? পাকিস্তানের অন্য দুই আলমী শূরার সাথীদের কেন রাখা হল না? মাওলানা নজরুর রহমান সাহেব তো অনেক বয়স্ক এবং খুবই মাজুর। তাহলে মাওলানা এহসান সাহেব কি দোষ করলেন? তিনি কেন নেই?

 

৬। ফাহিম সাহেবরা গত দুই বছরের বেশি সময় যাবত পুরা উম্মতকে আলমী শূরার তিক্ত বটিকা খাওয়ানোর চেষ্টা করে এসেছেন। তাঁদের ভাষ্যমতে হাজী সাহেবই (রহঃ) নাকি এই আলমী শূরা বানিয়েছেন। পাকিস্তানেও আলমী শূরার ৫ জন সাথী ছিল। তাঁরা থাকতেও কেন নতুন ফয়সাল এবং তাঁর পরবর্তী আর দুইজন ফয়সালও অগ্রিম বানিয়ে গেলেন? কথিত আলমী শূরার বাকি তিনজনই কেন রোটেশন পদ্ধতিতে ফয়সাল থাকলেন না? কেন একজন স্থায়ী ফয়সাল বানানো হল? ফাহিম সাহেবরা তখন স্মরণ করিয়ে দিলেন না কেন?

 

৭। তাঁদের পূর্বের অবস্থান অনুসারে, যেই অবস্থান বাস্তবায়ন করার জন্য সারা দুনিয়াতে ফিৎনার সয়লাব বইয়ে দেয়া হল, অর্থাৎ আলমী শূরা। কোন জিম্মাদার থাকবেন না। হাজী সাহেব রহঃ কেন আলমী শূরাদের সাথে মাসোয়ারা না করেই এই শূরা বানালেন? তাহলে কি তিনি আলমী শূরা পাত্তা দেন নি?

 

৮। আলমী শূরা এখন ভবিষ্যৎ কি? পরবর্তীতে তাঁরা আবার কবে মাসোয়ারায় বসবেন?

 

অর্থাৎ একথা খুবই স্পষ্ট যে, আলমী শূরার নামে এতদিন যতকিছু আমাদের শেখানো হয়েছিল, আলমী শূরার প্রবক্তাগণই তা সবই ভুলে গিয়ে এখন অন্য কাহিনী শুনাচ্ছেন।

 

◆ আলমী শূরার হাকীকতঃ

বর্তমানে আলমী শূরার অন্যতম তাত্ত্বিক প্রবক্তা মৌলভী ফাহিম সাহেবদের আচার আচরণেই স্পষ্ট যে, হাকীকতে আলমী শূরা কখনো বানানোই হয় নি। বরং এটা ছিল তাঁদের নিজেদের অন্য কোন এজেন্ডা বাস্তবায়নে একটা সাময়িক ব্যবস্থা, যাতে তাঁরা নিজামুদ্দিনের বিক্ষুব্ধ হযরতদের ব্যবহার করেছেন মাত্র। অভিমানী এই হযরতদের নিয়ে হয়ত কোথাও চা কফি পান করতে করতে কিছু নাম একটা কাগজে লিখেছেন মাত্র। (তিন বছরেও তাঁরা কোন মাসোয়ারার পর্চা দেখাতে পারেন নি।)

 

আমাদের নিজামুদ্দিনের আভিমানী কিছু সম্মানিত বুজুর্গদের ফাহিম সাহেবরা আলমী শূরার আফিম খাইয়ে ব্যবহার করেছেন মাত্র। এভাবে যারা পথে ঘাটে ব্যবহৃত হন বাংলা অভিধানে তাদের অনেক অভিধা থাকলেও আমাদের সম্মানিত বুজুর্গদের শানে আমরা তা ব্যবহার করতে অপারগ। বরং আমরা বলতে পারি তাঁরা প্রতারিত হয়েছেন। আল্লাহ তাঁদের হেফাজত করুন। এর ফলে একদিকে যেমন তাঁদের আশ্রয় অর্থাৎ নিজামুদ্দিনে অবস্থান হারিয়েছেন, অপরদিকে আলমী শূরার নামে পাকিস্তানী চক্রের কুটচালে প্রবঞ্চিত হয়েছেন।

 

নিজামুদ্দিন মারকাজে হয়ত তাঁদের কিছু রায় ছিল, বা মানহাজের ব্যাপারে হয়ত কিছু মতামত ছিল। কিন্তু এতটুকু সমস্যা নিয়েও তাঁরা মারকাজে থাকতে পারতেন। যেমন মাওলানা ইয়াকুব সাহেব ও জুহাইরুল হাসান সাহেব এখনো মারকাজে আছেনও। বড় বড় প্রতিষ্ঠানে আভ্যন্তরীণ কিছু মনোমালিন্য অস্বাভাবিক কিছু না। এক পরিবারেই সবাইকে সমান ভাবে সন্তুষ্ট রাখা সম্ভব হয় না।

 

শুরুর দিকে যখন মাওলানা সাদ সাহেব দামাত বারকাতুহুম আলমী শূরা গ্রহণ করেন নি, তখন আহমাদ লাট সাহেব, ভাই ফারুক সাহেব মেনেও নিয়েছিলেন। দুই সপ্তাহ পরেই তাঁরা অল ইন্ডিয়া জোড়ে জোর গলাতেই বলেছিলেন যে কোন আলমী শূরা বানানো হয় নি, শুধু প্রস্তাব করা হয়েছিল মাত্র। এবং খুশি মনেই মাওলানা আহমাদ লাট সাহেবরা নিজামুদ্দিনের শূরার দায়িত্বও কবুল করেন। ব্যাপারটা এখানেই মিটতে পারত। কিন্তু ফাহিম গং-এর অন্য অভিলাষ থাকার কারণেই তাঁরা নিজামুদ্দিনের এই বিক্ষুব্ধ ও অভিমানী হযরতদের আরো উস্কানি দেয় এবং এক পর্যায়ে তাঁরা মারকাজ ছাড়েন। মূলতঃ ফাহিম গং এটাই চেয়েছিল মাওলানা সাদ সাহেব নিজেদের বিদ্রোহ সামলাতে ব্যস্ত থাকুন, এই সুযোগে তাঁরা তাঁদের নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে। আবার এই আলমী শূরা কবুল না করার অজুহাতে মাওলানা সাদ সাহেবের রায়বেন্ডে আগমনও বন্ধ করা যাবে, নিজামুদ্দিনের নিয়ন্ত্রণও ছিন্ন করা যাবে। আলমী শূরাকে কেন্দ্র করে তাঁদের বিভিন্ন ফয়সালাতেই এটা স্পষ্ট আলমী শূরার শ্লোগান রায়বেন্ডকে পুরাপুরি নিজামুদ্দিনের মাতাহাতের বাইরে নিয়ে আসার জন্যই উঠানো হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি। তাঁর আগে আমাদের দেশের দিকে একটু নজর দিই।

রায়বেন্ডের কিছু কিছু হযরতদের হয়ত নিজস্ব কিছু এজেন্ডা ছিল, নিজামুদ্দিনের দলছুট হযরতদের হয়ত কিছু অভিমান ছিল। কিন্তু আমাদের দেশের হযরতরা কেন লাফালাফি করলেন বা এখনো করে যাচ্ছেন, নুঝলাম না। না তাঁদের নিজামুদ্দিনের প্রতি কোন ক্ষোভ ছিল আর না রায়বেন্ডের প্রতি আলাদা কোন ভালোবাসা ছিল। তাঁদের এই আলমী শূরার নামে লম্ফজম্ফের কোন ব্যাখ্যাই পাই না। শুনেছি কখনো কখনো ছাগল তিনটি বাচ্চা হয়। তখন অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী দুইটি বাচ্চা দুই স্তন থেকে খায়, আর অপেক্ষাকৃত দুর্বলটি শুধুই তিড়িংবিড়িং করে লাফালাফি করে। এই তিড়িংবিড়িং লাফালাফি যদিও খুব মনোমুগ্ধকর কিন্তু ঐ বাচ্চার জন্য ভালো নয়। সে দুর্বল থেকে দুর্বলতম হয়। এখানেও শক্তিশালী দুই পক্ষ রায়বেন্ড ও নিজামুদ্দিনের দলছুটদের পাশাপাশি আমাদের দেশীয় হযরতগণ স্রেফ তিন নম্বর ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।

 

রায়বেন্ডের অভ্যন্তরে বহুমুখী চক্র বহুদিন যাবতই প্রতিক্রিয়াশীল ছিল। একটি চক্র ছিল যারা আগাগোড়াই ইসলাম বিরোধী।  এই মোবারক মেহনতের দ্বারা ইসলামের অভূতপূর্ব প্রসার প্রসার হচ্ছে, এটা তাঁদের পছন্দ ছিল না। এজন্যই তাঁরা এই মেহনতকে ফুঁৎকারে নিভিয়ে দিতে চায়। এই চক্র যেমন মদীনাতে সক্রিয় ছিল, তেমনি নিজামুদ্দিনেও ছিল। বাস্তবিক সকল দ্বীনী মেহনতের মধ্যেই আছে। কিন্তু নিজামুদ্দিন বরাবরই শক্তিশালী ইমারতের অধীনে পরিচালিত হয়েছে বলেই এরা খুব একটা পাত্তা পায়নি। রায়বেন্ডেও হাজী সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহি যতদিন মজবুত ছিলেন এরা খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। কিন্তু তিনি মাজুর হয়ে জেতেই এরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে।

 

রায়বেন্ডে আরেকটি চক্র রয়েছে যারা এমনিতে মুখলিসীন। কিন্তু তাঁদের আজন্ম খায়েশ আলমী মারকাজ রায়বেন্ডে হোক। মূলতঃ পাকিস্তান একটি কৃত্রিম রাষ্ট্র। পাকিস্তানের জন্মের পিছনে একটা বড় জযবা ছিল ইসলাম ও মুসলমানদের সাংস্কৃতিক, আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র হবে। রায়বেন্ড আলমী মারকাজ বানানোর পিছনেও ঐ জযবাই কাজ করেছে। আলমী শূরার নামে যত চিঠি পাঠানো হয়েছে তাতেও এই আকাঙ্ক্ষাই ফুটে উঠেছে। হতে পারে এই দুইও চক্র যৌথ ভাবেই আলমী শূরা ধারণা জন্ম দেয়। অথবা নিজামুদ্দিনের অভিমানী হযরতদের মতো এই হযরতগণও ব্যবহৃত হয়েছেন। তবে এই চক্রেও বাধা ছিলেন হাজী আব্দুল ওয়াহাব সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহি। তিনি বরাবরই সবাইকে নিজামুদ্দিনের দিকে মুতাওয়াজ্জুহ করেছেন।

 

রায়বেন্ড মারকাজে আরেকটি চক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা সম্পূর্ণই দুনিয়াদার। স্রেফ দুনিয়ার ধান্দাতেই তাঁরা মারকাজে রয়েছেন। এই চক্র সকল ফিৎনার সাথেই তাল মিলিয়ে চলে।

 

বাদ বাকি প্রায় সকলেই মুখলিসীন। পাকিস্তানী সাথীদের মেহনত, মুজাহাদা, কুরবানী আজও অতুলনীয়। পৃথিবীর বহুদেশে পাকিস্তানী সাথীরা একাই মেহনত উঠিয়েছেন। হাজী সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহির মোট সহীহ রাহবারী পেলে আজও পাকিস্তানের সাথীরাই যথেষ্ট হবে ইনশা আল্লাহ।

 

 

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!