শনিবার, ০৮ মে ২০২১, ০৯:৫১ অপরাহ্ন

রোজার আধুনিক মাসআলা :  মুফতি মুহাম্মাদ তাকী উসমানী

রোজার আধুনিক মাসআলা :  মুফতি মুহাম্মাদ তাকী উসমানী

রোজার আধুনিক  মাসআলা

 মুফতি মুহাম্মাদ তাকী উসমানী

 রোজার আধুনিক ৩১ মাসআলা:
১. ইনজেকশন: ইনজেকশন নিলে রোজা ভাঙবে না। (জাওয়াহিরুল ফতওয়া)
২. ইনহেলার: শ্বাসকষ্ট দূর করার লক্ষ্যে তরল জাতীয় একটি ওষুধ স্প্রে করে মুখের ভেতর দিয়ে গলায় প্রবেশ করানো হয়, এভাবে মুখের ভেতর ইনহেলার স্প্রে করার দ্বারা রোজা ভেঙে যাবে। (ইমদাদুল ফতওয়া)
৩. এনজিওগ্রাম: হার্ট ব্লক হয়ে গেলে উরুর গোড়া কেটে বিশেষ রগের ভেতর দিয়ে হার্ট পর্যন্ত যে ক্যাথেটার ঢুকিয়ে পরীক্ষা করা হয় তার নাম এনজিওগ্রাম। এ যন্ত্রটিতে যদি কোনো ধরণের ঔষধ লাগানো থাকে তারপরও রোজা ভাঙবে না। (ইসলাম ও আধুনিক চিকিৎসা)
৪. এন্ডোসকপি: চিকন একটি পাইপ যার মাথায় বাল্ব জাতীয় একটি বস্তু থাকে। পাইপটি পাকস্থলিতে ঢুকানো হয় এবং বাইরে থাকা মনিটরের মাধ্যমে রোগীর পেটের অবস্থা নির্ণয় করা হয়। এ নলে যদি কোনো ওষুধ ব্যবহার করা হয় বা পাইপের ভেতর দিয়ে পানি/ওষুধ ছিটানো হয়ে থাকে তাহলে রোজা ভেঙে যাবে, আর যদি কোনো ওষুধ লাগানো না থাকে তাহলে রোজা ভাঙবে না। (জাদীদ ফিকহী মাসায়েল)
৫. নাইট্রোগ্লিসারিন: এরোসল জাতীয় ওষধ, যা হার্টের জন্য দুই-তিন ফোটা জিহ্বার নিচে দিয়ে মুখ বন্ধ করে রাখে। ওষুধটি শিরার মাধ্যমে রক্তের সঙ্গে মিশে যায় এবং ওষুধের কিছু অংশ গলায় প্রবেশ করার প্রবল সম্ভবনা থাকে। অতএব, এতে রোজা ভেঙে যাবে। (জাদীদ ফিকহী মাসায়েল)
৬. লেপারোসকপি: শিক্ জাতীয় একটি যন্ত্র দ্বারা পেট ছিদ্র করে পেটের ভেতরের কোনো অংশ বা গোশত ইত্যাদি পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে বের করে নিয়ে আসার জন্য ব্যবহৃত যন্ত্র। এতে যদি ওষুধ লাগানো থাকে তাহলে রোজা ভেঙে যাবে অন্যথায় রোজা ভাঙবে না। (আল মাকালাতুল ফিকহীয়া)
৭. অক্সিজেন: রোজা অবস্থায় ওষুধ ব্যবহৃত অক্সিজেন ব্যবহার করলে রোজা ভেঙে যাবে। তবে শুধু বাতাসের অক্সিজেন নিলে রোজা ভাঙবে না। (জাদীদ ফিকহী মাসায়েল)
৮. মস্তিস্ক অপারেশন: রোজা অবস্থায় মস্তিস্ক অপারেশন করে ওষুধ ব্যবহার করা হোক বা না হোক রোজা ভাঙবে না।
(আল মাকালাতুল ফিকহীয়া)
৯. রক্ত নেয়া বা দেয়া: রোজা অবস্থায় শরীর থেকে রক্ত বের করলে বা শরীরে প্রবেশ করালে রোজা ভাঙবে না।
(আহসানুল ফতওয়া)
১০. সিস্টোসকপি: প্রসাবের রাস্তা দিয়ে ক্যাথেটার প্রবেশ করিয়ে যে পরীক্ষা করা হয় এর দ্বারা রোজা ভাঙবে না। (হেদায়া)
১১. প্রক্টোসকপি: পাইলস, পিসার, অর্শ, হারিশ, বুটি ও ফিস্টুলা ইত্যাদি রোগের পরীক্ষাকে প্রক্টোসকপ বলে। মলদ্বার দিয়ে নল প্রবেশ করিয়ে পরীক্ষাটি করা হয়। রোগী যাতে ব্যথা না পায় সে জন্য নলের মধ্যে গ্লিসারিন জাতীয় কোনো পিচ্ছিল বস্তু ব্যবহার করা হয়। নলটি পুরোপুরি ভেতরে প্রবেশ করে না।
চিকিৎসকদের মতে ওই পিচ্ছিল বস্তুটি নলের সঙ্গে মিশে থাকে এবং নলের সঙ্গেই বেরিয়ে আসে, ভেতরে থাকে না। আর থাকলেও তা পরবর্তীতে বেরিয়ে আসে। যদিও শরীর তা চোষে না কিন্তু ওই বস্তুটি ভিজা হওয়ার কারণে রোজা ভেঙে যাবে। (ফতওয়া শামী)
১২. কপার-টি: কপার-টি বলা হয় যোনিদ্বারে প্লাস্টিক লাগানোকে, যেন সহবাসের সময় বীর্যপাত হলে বীর্য জরায়ুতে পৌছাতে না পারে। এ কপার-টি লাগিয়েও সহবাস করলে রোজা ভেঙ্গে যাবে। কাযা কাফফারা উভয়টিই ওয়াজিব হবে।
১৩. সিরোদকার অপারেশন: সিরোদকার অপারেশন হলো অকাল গর্ভপাত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে জরায়ুর মুখের চতুষ্পার্শ্বে সেলাই করে মুখকে খিচিয়ে রাখা। এতে অকাল গর্ভপাত রোধ হয়। যেহেতু এতে কোনো ওষুধ বা বস্তু রোযা ভঙ্গ হওয়ার গ্রহণযোগ্য খালি স্থানে পৌঁছে না, তাই এর দ্বারা রোজা ভাঙবে না।
১৪. ডিএন্ডসি: ডি এন্ড সি হলো আট থেকে দশ সপ্তাহের মধ্য ডিলেটর এর মাধ্যমে জীবত কিংবা মৃত বাচ্চাকে মায়ের গর্ভ থেকে বের করে নিয়ে আসা। এতে রোজা ভেঙে যাবে। অযথা এমন করলে কাযা কাফফারা উভয়টি দিতে হবে এবং তওবা করতে হবে। (হেদায়া)
১৫. এমআর: এম আর হলো গর্ভ ধারণের পাঁচ থেকে আঁট সপ্তাহের মধ্যে যোনিদ্বার দিয়ে জরায়ুতে এম আর সিরন্জ প্রবেশ করিয়ে জীবত কিংবা মৃত ভ্রণ নিয়ে আসা। যারপর ঋতুস্রাব পুনরায় হয়। অতএব মাসিক শুরু হওয়ার কারণে রোযা ভেঙ্গে যাবে এবং কাযা করতে হবে। কিন্তু যদি রাতের বেলা করা হয় তাহলে দিনের রোজা কাযা করতে হবে না।
(ফতহুল কাদীর)
১৬. আলট্রাসনোগ্রাম: আলট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষায় যে ওষুধ বা যন্ত্র ব্যবহার করা হয় সবই চামড়ার উপরে থাকে, তাই আলট্রাসনোগ্রাম করলে রোজা ভাঙবে না। (হেদায়া)
১৭. স্যালাইন: স্যালাইন নেয়া হয় রগে, আর রগ যেহেতু রোজা ভঙ্গ হওয়ার গ্রহণযোগ্য রাস্তা নয়, তাই স্যালাইন নিলে রোজা ভাঙবে না, তবে রোজার কষ্ট লাঘবের জন্য স্যালাইন নেওয়া মাকরূহ। (ফতওয়ায়ে দারাল উলূম)
১৮. টিকা নেয়া: টিকা নিলে রোজা ভাঙবে না। কারণ, টিকা রোজা ভঙ্গ হওয়ার গ্রহণযোগ্য রাস্তায় ব্যবহার করা হয় না। (আপকে মাসায়াল)
১৯. ঢুস লাগানো: ঢুস মলদ্বারের মাধ্যমে দেহের ভেতরে প্রবেশ করে, তাই ঢুস নিলে রোজা ভেঙে যাবে। ঢুস যে জায়গা বা রাস্তা দিয়ে প্রবেশ করে এ জায়গা বা রাস্তা রোজা ভঙ্গ হওয়ার গ্রহণযোগ্য স্থান। (ফতওয়া শামী)
২০. ইনসুলিন গ্রহণ করা: ইনসুলিন নিলে রোজা ভাঙবে না। কারণ, ইনসুলিন রোজা ভঙ্গ হওয়ার গ্রহণযোগ্য রাস্তা দিয়ে প্রবেশ করে না এবং গ্রহণযোগ্য খালী জায়গায় প্রবেশ করে না।(জাদীদ ফিকহী মাসায়েল)
২১. দাঁত তোলা: রোজা অবস্থায় একান্ত প্রয়োজন হলে দাঁত তোলা জায়েজ আছে। তবে অতি প্রয়োজন না হলে এমনটা করা মাকরূহ। ওষুধ যদি গলায় চলে যায় অথবা থুথু থেকে বেশি অথবা সমপরিমান রক্ত যদি গলায় যায় তাহলে রোজা ভেঙ্গে যাবে। (আহসানুল ফতওয়া)
২২. পেস্ট/টুথ পাউডার ব্যবহার করা: রোজা অবস্থায় দিনের বেলায় টুথ পাউডার, পেস্ট, মাজন ইত্যাদি ব্যবহার করা মাকরূহ। কিন্তু গলায় পৌঁছালে রোজা ভেঙ্গে যাবে। (জাদীদ ফিকহী মাসায়েল)
২৩. মিসওয়াক করা: শুকনা বা কাঁচা মিসওয়াক দিয়ে দাঁত মাজার দ্বারা রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। চাই যখনই করা হোক না কেন। (ফতওয়া শামী)
২৪. মুখে ওষুধ ব্যবহার করা: মুখে ওষুধ ব্যবহার করে তা গিলে ফেললে বা ওষুধ অংশ বিশেষ গলায় প্রবেশ করলে রোজা ভেঙে যাবে। গলায় প্রবেশ না করলে রোজা ভাঙবে না। (ফতওয়া শামী)
২৫. রক্ত পরীক্ষা: পরীক্ষার জন্য রক্ত দিলে রোজার কোনো ক্ষতি হবে না। তবে খুব বেশি পরিমাণে রক্ত দেয়া যার দ্বারা শরীরে দুর্বলতা আসে, তা মাকরূহ।
২৬. ডায়াবেটিস: ডায়াবেটিসের সুগার মাপার জন্য সুচ ঢুকিয়ে যে একফোটা রক্ত নেয়া হয়, এতে রোজার কোনো ক্ষতি হবে না।
২৭. নাকে ওষুধ দেয়া: নাকে পানি বা ওষুধ দিলে যদি তা খাদ্য নালীতে চলে যায়, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে এবং কাযা করতে হবে। (ফতওয়া রাহমানিয়া)
২৮. চোখে ওষুধ বা সুরমা ব্যবহার করা: চোখে ওষুধ বা সুরমা ব্যবহার করার দ্বারা রোজা ভাঙবে না। যদিও এগুলোর স্বাদ গলায় অনুভব হয়। (হেদায়া)
২৯. কানে ওষুধ প্রদান করা: কানে ওষুধ, তেল ইত্যাদি ঢুকালে রোজা ভাঙবে না।
৩০. নকল দাঁত মুখে রাখা: রোজা রেখে নকল দাঁত মুখে স্থাপন করে রাখলে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। (ইমদাদুল ফতওয়া)
৩১. হিজামা বা সিংগা নেয়া: হিজামা বা সিংগা নেয়া দ্বারা রোজা ভাঙে না। যদি শরীর দুর্বল লাগার ভয় বা শঙ্কা থাকে তাহলে মাকরুহ। যদি এমন ভয় বা শঙ্কা না থাকে তাহলে মাকরুহ হবে না।
মাওঃ আব্দুর রহিম ফারুকী
1 comment
Like

 

Comment
Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com