রবিবার, ২৫ Jul ২০২১, ০৩:৪৬ পূর্বাহ্ন

তাহাজ্জুদের সুবর্ণ সুযোগ: আসুন অভ্যাসে পরিণত করি

তাহাজ্জুদের সুবর্ণ সুযোগ: আসুন অভ্যাসে পরিণত করি

রমজানে তাহাজ্জুদের সুর্বণ সুযোগ

মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ  

রমজানের প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান।রমজান মাস রহমতের মাস আর রহমতের সময় হলো তাহাজ্জুদের সময়।মহান আল্লাহর সঙ্গে বান্দার নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যম ‘কিয়ামুল লাইল’ বা তাহাজ্জুদ। হাদিসের ভাষ্যমতে রাতের তৃতীয় ভাগে আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর আকাশে নেমে আসেন এবং বান্দাকে তাঁর দিকে আহ্বান জানান। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্য তাহাজ্জুদের নামাজ আবশ্যক ছিল। তিনি কখনো তা পরিহার করতেন না। উম্মতের জন্য তাহাজ্জুদ আবশ্যক না হলেও পৃথিবীর সব বুজুর্গ ব্যক্তি গুরুত্বের সঙ্গে তাহাজ্জুদ আদায় করতেন।

আখেরাতের সদাই করার শ্রেষ্ঠ সময় রমজান। তাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোই মুমিনের কাজ। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমরা রোযা রাখি, তারাবি নামাজ আদায় করি, সেহরি ও ইফতার করে থাকি। এর পাশাপাশি কোরআন তেলাওয়াত ও তাহাজ্জুদ নামাজেরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

তাহাজ্জুদ অত্যন্ত মূল্যবান আমল। কুরআনে কারীমে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাহাজ্জুদের বিশেষ হুকুম করা হয়েছে। তাহাজ্জুদের সময় তথা রাতের শেষ ভাগে আল্লাহ রহমত বান্দার প্রতি নিবিষ্ট থাকে।রমজান তাহাজ্জুদ নামাজে অভ্যস্ত হওয়ার একটি সুযোগ। বছরের অন্য সময় তাহাজ্জুদ নামাজের সময় আমরা ঘুমিয়ে থাকলেও রমজানে এই সময় জেগে থাকা হয়। ইচ্ছা করলেই আমরা সাহরি খাওয়ার আগে বা পরে তাহাজ্জুদ পড়তে পারি। দীর্ঘ এক মাস নিয়মিত তাহাজ্জুদ আদায় করলে পরবর্তীকালে তা আদায় করা সহজ হবে। আর তাহাজ্জুদের এই অভ্যাস পরকালে আমাদের জন্য হতে পারে নাজাতের উসিলা।

রাসুল (সা.) আরও বলেছেন- নিশ্চয়ই আল্লাহ রমজান মাসের রোজা তোমাদের ওপর ফরজ করেছেন। আর আমি তোমাদের জন্য নিয়ম করেছি এ মাসের কিয়ামুল লাইল বা রাত্রিকালীন ইবাদতকে। সুতরাং কোনো ব্যক্তি যদি পূর্ণ ইমান সহকারে এবং গুনাহ মাফের আশায় এ মাসে রোজা রাখে ও তাহাজ্জুত আদায় করে, তাহলে সে এমন নিষ্পাপ হয়ে যায়, যেমন মা তার নিষ্পাপ সন্তানকে প্রসব করেন।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ? (সা.) রমজান মাসে কিয়ামুল লাইল (তাহাজ্জুত) পালন করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি বলতেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে ও সওয়াবের আশা নিয়ে রমজান মাসে কিয়াম করবে (রাতের বেলায় দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করবে) তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’

রমজানে এই আমল করা আমাদের জন্য সহজ। কেননা সেহরী খাওয়ার উদ্দেশ্যে শেষ রাতে ঘুম থেকে জেগে উঠি। একটু বেশি সময় নিয়ে উঠলেই আমরা তাহাজ্জুত নামাজ আদায় করতে পারি। একাকী কিংবা জামায়াতের সঙ্গে কিয়ামুল লাইল (তাহাজ্জুদ নামাজ) মসজিদ বা বাসাবাড়িতে আদায় করা যায়। প্রতিরাতে ১২ রাকাত নামাজ আদায় সম্ভব না হলেও অন্তত ৪ রাকাত বা ৮ রাকাত নামাজ আদায় করার অভ্যাস আমরা করতে পারি।

শেষ রাতে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে ডেকে ডেকে বলতে থাকেন

مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ، مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ، مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ.

আছে কি কেউ, যে আমাকে ডাকবে অমি তার ডাকে সাড়া দিব। কেউ আমার কাছে কিছু চাইবে আমি তাকে তা দিয়ে দিব। কেউ আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে আমি তাকে ক্ষমা করে দিব।

রাতের দুই তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হওয়ার পর থেকে ফজর পর্যন্ত প্রতি রাতে রাব্বুল আলামীন এভাবে বান্দাকে ডাকতে থাকেন। (দ্র. সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৩২১; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭৫৮)

এসময় বান্দার উচিত রবের ডাকে সাড়া দিয়ে তাহাজ্জুদের সালাতে মশগুল হওয়া। কারণ, নবীজী বলেছেন

أَفْضَلُ الصّلَاةِ، بَعْدَ الصّلَاةِ الْمَكْتُوبَةِ، الصّلَاةُ فِي جَوْفِ اللّيْلِ.

ফরয নামাযের পর মধ্যরাতের নামায সর্বোত্তম। সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৬৩

আল্লাহ আরো ইরশাদ করেন,

হে বস্ত্রাবৃত! রাতে দণ্ডায়মান হোন কিছু অংশ বাদ দিয়ে; অর্ধরাত্রি অথবা তদপেক্ষা কিছু কম অথবা তদপেক্ষা বেশি এবং কোরআন আবৃত্তি করুন সুবিন্যস্তভাবে ও স্পষ্টভাবে। আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি গুরুত্বপূর্ণ বাণী। নিশ্চয় ইবাদতের জন্য রাত্রিতে ওঠা প্রবৃত্তি দলনে সহায়ক এবং স্পষ্ট উচ্চারণের অনুকূল। নিশ্চয় দিবাভাগে রয়েছে আপনার দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা। আপনি আপনার পালনকর্তার নাম স্মরণ করুন এবং একাগ্রচিত্তে তাতে নিমগ্ন হোন।’ (সুরা-৭৩ মুজাম্মিল, আয়াত: ১-৮)। ‘হে চাদরাবৃত! উঠুন, সতর্ক করুন, আপন পালনকর্তার মাহাত্ম্য ঘোষণা করুন, আপন পোশাক পবিত্র করুন এবং অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকুন। অধিক প্রতিদানের আশায় অন্যকে কিছু দেবেন না এবং আপনার পালনকর্তার উদ্দেশে সবর করুন।’ (সুরা-৭৪ মুদ্দাচ্ছির, আয়াত: ১-৭)।

রমজান মাসে তাহাজ্জুদের গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়। রাসুলে আকরাম (সা.) রমজানে তাহাজ্জুদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রমজানে রাসুল (সা.) রাত জাগরণ করতেন, পরিবারকে জাগিয়ে দিতেন এবং লুঙ্গি শক্ত করে বাঁধতেন (স্ত্রী সংস্রব পরিহার করতেন)। অর্থাৎ রমজানে তিনি তাঁর পরিবারকে তাহাজ্জুদ নামাজের তাগিদ দিতেন। তাই শুধু নিজে নয়, পরিবারের সদস্যদেরও তাহাজ্জুদ আদায়ে উৎসাহিত করতে হবে। তাদের এমন সময় জাগিয়ে দিতে হবে যেন তারা সাহরি খাওয়ার আগে বা পরে তাহাজ্জুদ আদায় করে নিতে পারে।

রাতের বরকতপূর্ণ এ মুহূর্ত যদি আসে রমযানের মত রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাসে! রমযানের রহমত ও মাগফেরাতের সাথে যদি যুক্ত হয় মধ্য রাতের এ খোশখবরি, মহান রবের পক্ষ থেকে দয়া ও ক্ষমার ঘোষণা এবং প্রাপ্তির আহবান! মুমিনের জন্য এরচে মূল্যবান মুহূর্ত আর কী হতে পারে! তাই রমযান মাসে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তাহাজ্জুদের প্রতি মনোযোগী হওয়াটাই মুমিনের শান। রমযানে তো এমনিতেই সাহরীর জন্য উঠতে হয়। তাহলে আমি কি পারি না আরেকটু আগে উঠে জায়নামাযে দাঁড়াতে! আল্লাহর সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়তে! মহান রব দেওয়ার জন্য ডেকে যাচ্ছেন। আমার কি উচিত নয় তাঁর থেকে কিছু নেওয়া! দয়াময় প্রভুর নিকট কিছু চাওয়া! তাঁর মাগফেরাত লাভে ধন্য হওয়া!!

রমযানের একমাসে যদি তাহাজ্জুদের অভ্যাস তৈরি করা যায় তাহলে বাকি এগার মাস সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাওফিক দাও। আমীন

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com