সোমবার, ১০ মে ২০২১, ০৮:৫২ অপরাহ্ন

রহমতের দিনগুলো যেভাবে চলে যায়…

রহমতের দিনগুলো যেভাবে চলে যায়…

রহমতের দিনগুলো যেভাবে চলে যায়…

মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ

আজ দরসে রমজানের নবম পর্বে প্রাসঙ্গিক  একটি বিষয়ে আলোচনা করব। বাস্তবে আমাদের রমজানের যাপিত জীবন কেমন চলছে। রহমতের দিনগুলো একে একে চলে যাচ্ছে। অধমের হিসাবের খাতায় আমল কিছুই নেই।

প্রতিদিন আমার পাঠকদের পক্ষ থেকে tablignewsbd@gmail.com -এ অসংখ্য মেইল  এর মধ্যে অনেকেই জানতে চেয়েছেন আমার ব্যাক্তিগত রমজানুল কারিমের রুটিন কি? কিভাবে আমার রমজানের সময় কাটে? লেখালেখিরই বা এতো সময় কোথায় পাই? এই রমজানের নামাজ তেলাওয়াতের পরে এতো লেখাপড়ার সময় পাই কী করে? আমি সিয়াম সাধনার মাসে কী কী আমল করি ইত্যাদি।

লেখক সম্পর্কে পাঠকের আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক বিষয়! তবে আমি বরাবরই নিজের বিষয়ে কিছু বলতে অসস্থিবোধ করি। কিন্তু নবিজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এটিও একটি সুন্নত তিনি তার জীবনকে সহকর্মীদের সামনে পরিস্কার রাখতেন। আকাবিরদেরও এটি একটি মামূলাত ছিল তারা আগ্রহীদের যে কোন কৌতুহলের জবাব দিতেন। সে হিসাবে কিছু লিখছি… যাতে করে আমার কমিগুলো অন্যরা বলে দেন এবং ভাল কাজের ব্যাপারে আগ্রহী হন। মোহাসাবা হিসাবেই বলা। এক মুমিন আরেক মুমিনদের আয়না। আমি তেমন কোন আমল করতে পারি না।

স্বাভাবিক সময়ই কাটাই। অবহেলা আরও গাফলাতিতে কেটে যাচ্ছে সময় আমার। কিছু লেখাজোঁকা ছাড়া  তেমন কোন আমল হচ্ছে না। বড় অনাদর আর অবহেলায় আমার রহমতের দিনগুলো চলে যাচ্ছে। তাই এখন  আল্লাহওয়ালা সাথীদের কাছে দরখাস্ত যারা রমজনের হক আদায় করে আমল করছেন  তারা যেন এই অধমকে তাদের রহমতের মকবুল দোয়ায় শামিল করে নিবেন ।

প্রথম কথা হলো আমি মনে করি আল্লাহ সব সময়, সারা বছর আমাকে বরকত দান করেন। এটি নেকহায়াত বললেও হয়তো ভুল হবে না। না হয়ে এতো বেশি লেখালেখি খুব অল্প সময়ে হয়ে যায়, যা কখনো আমি নিজেও অবাক হয়ে যাই। প্রতিদিনই লিখতে হয়। একদিন কোন ব্যাস্থতায় বা সফরের কারণে যদি লিখতে না পারি তখন মাথা ব্যাথা করে। ফলে সফরে-হাজরে সবাই সময় কিছু প্রতিদিনই লিখি। আল্লাহ যেন আমার এই যোগ্যতাকে তার দ্বীনী খেদমত হিসাবে, হকের পক্ষে মূত্যু পর্যন্ত কবুল করেন। আমিন।

প্রথমত বলে নেই, রমজানে আমি লেখালেখির কাজ রাতেই সেড়ে নেই। রমজানুল মোবারক আমি অধম রাতে ঘুমাই না। মাগরিবের পর বাচ্চাদের একটু পড়াই। তখন গতরাতের লেখাগুলোকে তাবলীগ নিউজে আপলোড করি।

৮.৩০ মিনিটের দিকে তারাবির নামাজে দাঁড়াই। আমার স্ত্রী তিন সন্তানের মধ্য বড় দুই ছেলে মেয়ে পরিবারের সবাই আমার সাথে নামাজ পড়েন। তারাবির জামাত ১০টার দিকে শেষ হয়। মাছুম বাচ্চাদের নিয়ে আমার কাছে একটু আবেগ তাড়িত মনে হয় আমাদের  টুটাফাটা ইবাদত। কারন দুর্বলদের সাথে আল্লাহর সাহায্য থাকে।

তারাবির নামাজের একটু পরে কিতাব নিয়ে বসি ১১টা পর্যন্ত মোত্বালা (অধ্যায়ন) করি, তারপর রাত ২টা/৩টা পর্যন্ত লেখালেখি করি। এরপর কিছু নামাজ, তেলাওয়াত, জিকির, দোয়া করে সেহরী খেতে বসে যাই সাড়ে তিনটার দিকে।

ফজরের নামাজ পড়ে সবাই মিলে একটু মুন্তাখাব হাদীস কিছু অল্প সময় পড়ে নেই। তাসবিহাত পুরা করে এশরাকের নামজ পড়ে বিছানায় যাই বেলা ১১টার দিকে ঘুম থেকে উঠে চাশতের নামাজ সহ সংক্ষিপ্ত কিছু আমল সেড়ে নেই। আমার লেখা পাঠ্য বইয়ের ডিজাইন চলছে ,এগুলো দেখে নেই।

আব্বা এখন বাড়িতে, বাসায় এলে ঘুম থেকে উঠেই এই সময় আব্বার খেদমত করতে হয়। গত দুই বছর ধরে তিনি কান্সারে আক্রান্ত হয়ে বাসায় আছেন। দুটি জটিল অপারেশন হয়েছে। কলোস্টেরল ব্যাগেই টয়লেট করেন। এটি পরিস্কার করে দেই। গোসল করাই। এই হালতেও নামাজ রোজা, তেলাওয়াতের ইহতেমাম করেন। প্রতিদিন১০ হাজার তাসবিহাত নিয়মিত আদায় করে থাকেন। আল্লাহ তায়ালা আমার বুজুর্গ পিতাকে আরো নেক হায়াত ও আফিয়াত দান করুন। আমিন

জোহরের আগে বচ্চাদের গোসল করাই। যোহরের নামাজ পড়ে ঘরের তালিম করি। তারপর কিছু কুরআন তেলাওয়াত করে আবার লেখালেখিতে বসি।

এখন নতুন কাজ করছি ” দাঈ ইলাল্লাহ সীরাতে মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ” নামক গ্রন্থের। এই হাতের কারণে নিজামুদ্দিনের ইতিহাস ঐতিহ্য ও অবদান, চার হযরতজীর উপর অভিযোগের জবাব, চার হযরতজীর মালফুজাত, ৪র্থ হযরতজীর বয়ান সমগ্র, হযরতজী ইউসুফ রহ দোয়া ও মুনাজাত সহ গত কয়েকমাসের করা কাজের পান্ডুলিপি পরে আছে। এখন যেটি কাজ করছি সেটি, দাওয়াত ভিত্তিক নবিজীর জীবনের রূপরেখার হাজার পৃষ্ঠার গ্রন্থ হবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ কবুল করুন।

করোণার কারণে এখন আমার অনন্য দ্বীনি – দুনিয়াবি তাকাজা ও ব্যাস্থতা কম। আর আমাদের সাভারের অবস্থা এমন হলো বাহিরে কোন আমল বা কার্যক্রম চালু নেই। সবাই নিজ নিজ গৃহে বন্দি। মাসিক আত তাহকীক দুমাস ধরে বন্ধ। বই ছাপার কাজগুলোও প্রেস বন্ধ থাকায় হচ্ছে না। ফলে তাবলীগ নিউজ টিকে নিয়ে অবৈতনিক খেদমত করে যাচ্ছি। যাতে করে সারা দুনিয়ার বাংলা ভাষাভাষী পাঠক এই হোম কোয়ারেন্টাইনে কিছু সহি রাহবারি পেতে পারেন।

আছরের নামাজ পড়ে কিছু ঈমানী মোজাকারা ও তাসবিহাত আদায় করে ঘরের ইফতারী তৈরিতে সহযোগীতা করি। ইফতারের আগে সবাই দোয়ার ইহতেমাম করি।

ইফতারের পরে মাগরিবের নামাজ, আওয়াবিন পড়ে মাসনুন তেলাওয়াত করি ও বাচ্চাদের নিয়ে মশকে বসি।

আজ করোনার নামক মহামারি দিয়ে আল্লাহ তায়ালা আমাদের অনেক ব্যস্ততাকেই থামিয়ে দিয়েছেন। যারা উপার্জনের নেশায় মত্ত থাকতেন, আজ তারা দিনের পর দিন অবসর যাপন করছে। আমরা কেউই জানি না, এ পৃথিবী আবার কবে কর্মকোলাহলে ভরে উঠবে। কবে আবার প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে পরিক্ষা।

আল্লাহ বলেন, আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছুু না কিছু দিয়ে পরীক্ষায় করবো: মাঝে মধ্যে তোমাদেরকে বিপদ আতঙ্ক, ক্ষুধার কষ্ট দিয়ে, সম্পদ, জীবন, পণ্য-ফল-ফসল হারানোর মধ্য দিয়ে। আর যারা কষ্টের মধ্যেও ধৈর্য-নিষ্ঠার সাথে চেষ্টা করে, তাদেরকে সুখবর দাও। [আল-বাক্বারাহ ১৫৫)

তিনি হয়তো মানুষকে এটাই বোঝাতে চাচ্ছেন, আমার দেয়া জান মাল সময় তোমরা আমার পথে খরচ না করে আমাকেই ব্যস্ততার অজুহাত দেখাও, ঠিক আছে তোমরা কত বেশি ব্যস্ত থাকতে পারো দেখা যাবে। আমাদেরকে আল্লাহ তায়ালা এই নেয়ামতের কদর করে অবসর সময়টুকোও দ্বীনি খেদমতের কাটানোর তাওফিক দান করুন। ধর্য্য ও সবরের সাথে আমাল ও নেক কাজে লেগে থাকার তাওফিক দান করুণ। আমিন।

এই অবসরের মধ্যে আমাদের মাঝে রহমত বরকত মাগফিরাতের সওগাত নিয়ে মহমান্বিত রমজান এসেছে। যে অবসর পেয়েছি, আশা করি অন্তত এবারের রমজানের পূর্ণ ফায়দা আমরা অর্জন করতে পারব। যেহেতু সব কিছু বন্ধ হয়ে গেছে, তাই নিশ্চিন্তে একটি মাস খোদার দরবারে পরে থেকে কান্নাকাটি করার অপূর্ব সুযোগ যেন কারো হাত ছাড়া না হয়।

সবচেয়ে ভালো হয় পুরো রমজানই যদি ইতিকাফের নিয়তে কাটানো যায়। এ অবসরে এটি আমাদের জন্য মোটেও কষ্টকর হবে না।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ব্যস্ততা আসার আগে অবসরকে গনিমত মনে করো। এই স্থবির অবস্থা শেষ হয়ে যাবে। পৃথিবী আবার তার চেনা চেহারায় ফিরে আসবে। এর আগে আল্লাহপাক আমাদের যে অবসরটুকুন দিয়েছেন, তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে হবে।

অনলাইনে অযথা সময় নষ্ট করা যাবে না। শুয়ে বসে সময় যাপন না করে পড়াশোনা-ইবাদত-বন্দেগীতে সময় যাপন করতে হবে। ঘরের কাজে নারীদের সাহযোগিতা করা যেতে পারে। তওবা ইস্তেহার, কিয়ামুল লাইল ও সালাতুত তাওবা আরও সালাতুত তাসবিহাত হোক করোনাকালের রমজানের অনন্য হাদিয়া। আমাদের প্রেমময় আমল।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাদের কাছে রমজান এসেছে। এটি বরকতের মাস। আল্লাহ এ মাসে প্রচুর রহমত দান করেন। প্রচুর ক্ষমা দান করেন এবং প্রচুর দোয়া কবুল করেন। আল্লাহতায়ালা ফেরেশতাদের নিয়ে গর্ব করতে থাকেন- তোমরা দেখ আমার বান্দারা এ মাসে কত ইবাদত করছে।

এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের প্রতিযোগিতা দেখবেন- তোমরা কত ইবাদত করতে পার। এজন্য তোমরা আল্লাহকে দেখাও কত ভালো কাজ করতে পার। এটা এত বেশি রহমতের মাস, এত রহমতের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যে আল্লাহর কাছ থেকে রহমত লাভ করতে পারল না সে আসলেই হতভাগা। [তিবরানি]

আসুন, আমরা দুনিয়ার সবকিছুকে তুচ্ছ করে আল্লাহর ইবাদতে কোমর বেঁধে নেমে যাই। রহমত লাভে ধন্য হওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা চালাই। রাসুলের বাণী নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করার প্রতিযোগিতা করি। আমরা পারব তো? অবশ্যই পারব। আল্লাহ আমাকে ও আমার বন্ধুদেরকে তাওফিক দান করুন, আমিন।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com