শনিবার, ০৮ মে ২০২১, ০৯:১৯ অপরাহ্ন

ইসলামে আমিরের আনুগত্যের সীমারেখা : মুফতী তকী উসমানী 

ইসলামে আমিরের আনুগত্যের সীমারেখা : মুফতী তকী উসমানী 

ইসলামে আমিরের আনুগত্যের সীমারেখা

মুফতী তকী উসমানী দা.বা.

কোরআন ও সুন্নাহর বিধান অনুসারে জনগণের জন্য আমিরের আনুগত্য করা ওয়াজিব। অর্থাৎ যখন কোনো ব্যক্তি যথাযুক্ত নিয়মে আমির হয়ে যাবেন তখন কোরআন ও সুন্নাহর সীমার মধ্যে অবস্থান করে তিনি যে বিধিমালা জারি করবেন, সেগুলোর আনুগত্য করা ওয়াজিব। কোরআনে এসেছে, ‘হে ঈমানদাররা! আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসুলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের মধ্যে যারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত, তাদের আনুগত্য করো…।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৯)
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা ও মহানবী (সা.)-এর আনুগত্যের পর ক্ষমতাবান তথা খলিফা ও তাঁর প্রতিনিধির আনুগত্য করার হুকুম দেওয়া হয়েছে। এ থেকে স্পষ্ট, যেসব হুকুম আল্লাহ তাআলা ও মহানবী (সা.) দিয়েছেন, সেগুলোর ক্ষেত্রে তো তাঁদেরই আনুগত্য করতে হবে। এই আনুগত্য আমিরসহ প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর আবশ্যক। তাই আমিরের আনুগত্য করার যে হুকুম দেওয়া হয়েছে, তার বাহু দুটি—
এক বাহু হচ্ছে, যখন রাষ্ট্রপ্রধান কোনো বৈধ কাজের হুকুম দেবেন তখন জনসাধারণের জন্য সে কাজ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে ওয়াজিব হয়ে যায়। এ জন্য ইসলামী আইনজ্ঞরা লিখেছেন, রাষ্ট্রপ্রধান যদি বলেন, আজকের দিন রোজা রাখুন, তাহলে জনগণের ওপর রোজা রাখা ওয়াজিব হয়ে যাবে। আল্লামা ইবনে আবিদিন (রহ.) বিভিন্ন ফকিহের বরাত দিয়ে লিখেছেন—যে বিষয়টি গুনাহ নয়, সে বিষয়ে রাষ্ট্রপ্রধানের আনুগত্য করা ওয়াজিব। সুতরাং তিনি যদি কোনো দিন রোজা রাখতে আদেশ দেন, তাহলে রোজা ওয়াজিব হয়ে যাবে। (রদ্দুল মুহতার : ২১/৪৭৯)
এমনইভাবে যদি রাষ্ট্রপ্রধান কোনো বৈধ কাজ থেকে বারণ করেন, তাহলে সেই বৈধ কাজ থেকে বিরত থাকাও ওয়াজিব। অর্থাৎ সেই মুবাহ কাজ নাজায়েজ হয়ে যায়।
তাই রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যে ট্রাফিক আইন চালু করা হয়, নাগরিকদের জন্য সেটি মান্য করা শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকেও আবশ্যক।
তবে এতদসঙ্গে ইসলামী আইনজ্ঞরা এই মূলনীতিও উল্লেখ করেছেন যে জনগণের ওপর রাষ্ট্রপ্রধানের হস্তক্ষেপ কল্যাণকামিতার সঙ্গে বাঁধা। (আল-আশবাহ ওয়ান-নাজায়ের : ১/১২৩)
অর্থাৎ এই হুকুম ওয়াজিব হবে তখন, যখন তিনি সাধারণ কল্যাণের নিমিত্তে এমন হুকুম দেবেন। যদি কল্যাণের বদলে মানুষকে কষ্ট দেওয়ার জন্য এবং জুলুম করার জন্য এ ধরনের আইন জারি করেন, তাহলে তাঁর হুকুমের আনুগত্য করা ওয়াজিব নয়।
এই মূলনীতি কোরআনের সে আয়াত থেকে গ্রহণ করা হয়েছে, যার মধ্যে আল্লাহ তাআলা দাউদ (আ.)-কে
বলেছেন, ‘হে দাউদ! আমি তোমাকে ভূপৃষ্ঠে খলিফা বানিয়েছি। কাজেই তুমি মানুষের মাঝে সুবিচার করো…।’ (সুরা : সোয়াদ, আয়াত : ২৬)
আনুগত্যের দ্বিতীয় বাহু হচ্ছে, যে বিষয়গুলো ইজতিহাদপূর্ণ, অর্থাৎ যেগুলোর ব্যাপারে ইসলামী আইনজ্ঞদের মতদ্বৈততা আছে। এক মাজহাবে জায়েজ; আরেক মাজহাবে নাজায়েজ। এসব বিষয়ে রাষ্ট্রপ্রধান যে হুকুম দেবেন, সেদিকটি নির্দিষ্ট হয়ে যাবে। এ কথাটি ফুকাহায়ে কেরামের ভাষ্যে এভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, ‘শাসকের নির্দেশ মতদ্বৈততা নিঃশেষ করে দেয়।’
অর্থাৎ একটি ইজতিহাদপূর্ণ মাসআলায় মতবিরোধ ছিল; কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধান যেকোনো একটি রায়কে হুকুম হিসেবে জারি করে দিয়েছেন, তাহলে হুকুম কার্যকর হয়ে যাবে এবং জনগণের জন্য রাষ্ট্রপ্রধানের নির্দিষ্ট করে দেওয়া রায়ের ওপর আমল করা জরুরি হয়ে যাবে। যেমন—ঈদের নামাজের নিয়ম নিয়ে মতবিরোধ আছে। হানাফি মাজহাবে প্রতি রাকাতে তিনটি করে অতিরিক্ত তাকবির, অর্থাৎ মোট ছয়টি তাকবির সাধারণ নামাজের চেয়ে বেশি। এই নিয়মটি ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত। কিন্তু ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, প্রথম রাকাতে সাত এবং দ্বিতীয় রাকাতে পাঁচ তাকবির হবে। এই বর্ণনা অনুযায়ী ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর মাজহাব। কিন্তু ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) হানাফি হওয়া সত্ত্বেও তাদের থেকে এই বর্ণনা অনুযায়ীই আমল করার কথা বর্ণিত আছে। কেননা বাদশাহ হারুনুর রশিদ তাঁদের আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মাজহাব অনুযায়ী আমল করতে বলেছিলেন। আল্লামা ইবনে আবিদিন (রহ.) লিখেছেন, ফাতাওয়ায়ে জাহিরিয়াতে বলা হয়েছে, ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ (রহ.) যে এমনটি করেছেন, তার কারণ ছিল এই যে হারুনুর রশিদ তাঁদের এভাবে বলতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কেননা বংশগতভাবে ইবনে আব্বাস (রা.) হারুনুর রশিদের দাদা ছিলেন। তাঁর এই নির্দেশ পালনার্থে তাঁরা এমন করেছেন; এটা তাঁদের মাজহাব ও বিশ্বাস ছিল না। (রদ্দুল মুহতার : ৬/১৫৯)
কিন্তু এসব কথা তখন প্রযোজ্য হবে, যখন রাষ্ট্রপ্রধানের হুকুম হয়তো মুবাহ বিষয় অথবা ইজতিহাদপূর্ণ বিষয় সংশ্লিষ্ট হবে। কিন্তু তিনি যদি এমন কোনো হুকুম জারি করেন, যা শরিয়তের অনুমোদিত এবং সর্বসম্মত বিধানের বিপরীত, তাহলে সেই পরিস্থিতির নীতি হচ্ছে, স্রষ্টার নাফরমানি করে কোনো সৃষ্টবস্তুর আনুগত্য জায়েজ নেই। এই নীতি কোরআন থেকে গৃহীত, যেখানে আল্লাহ তাআলা মাতা-পিতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের হুকুম দিয়ে বলেছেন, ‘যদি মাতা-পিতা তোমাকে আমার সঙ্গে কোনো বস্তুকে শরিক সাব্যস্ত করতে বাধ্য করে, যার ব্যাপারে কোনো দলিল নেই, তাহলে তাদের আনুগত্য কোরো না। তবে দুনিয়াতে তাদের সঙ্গে ভালোভাবে অবস্থান করো। (সুরা : লুকমান, আয়াত : ১৫)
এ বিষয়ে হাদিসে এসেছে, মুসলমানের ওপর ওয়াজিব হলো রাষ্ট্রপ্রধানের কথা শোনা ও মান্য করা, চাই তা পছন্দ হোক বা না হোক। যতক্ষণ পর্যন্ত তাকে (আল্লাহ তাআলার) নাফরমানির কোনো হুকুম না দেওয়া হয়। যদি কোনো নাফরমানির হুকুম দেওয়া হয়, তাহলে তা শুনতেও হবে না, মানতেও হবে না। (বুখারি, হাদিস : ৭১৪৪)
ভাষান্তর : মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ
Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com