রবিবার, ০৯ মে ২০২১, ০২:৩৪ অপরাহ্ন

শায়েখ রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রহ এর রমজান যাপন

শায়েখ রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রহ এর রমজান যাপন

কুতুবে আলম হযরত রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রহ এর রমজানের  মামূলাত

শায়খুল হাদীস মাওলানা জাকারিয়া রহ লিখেছেন, আপবীতির ৪র্থ খন্ড লেখার সময় বুযুর্গানে দ্বীনের রিয়াযত-মুজাহদা ও সাধনা-মুরাকাবার বর্ণনায় হযরত রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রহ. এর রমাযান মাসের মা’মুলাত আলোচনা করা হয়েছে।

পরে মনে হল যে, চলমান এই (আকাবির কা রমাযান) পৃস্তিকাটির বিষয়বস্তুর সাথে তার মিল রয়েছে বিধায়, এখানেও তা উল্লেখ করা যেতে পারে ।

আপবীতি ৬ষ্ঠ খন্ডে হযরত রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রহ. এর মুজাহাদার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছি যে, হযরতের রিয়াযত-মুজাহাদার অবস্থা এমন ছিল যে, তা দেখলে কষ্ট লাগত, দয়া হত। বার্ধক্যে তার বয়স এই ছিল যে. সারা দিন রোযা রাখতেন এবং মাগরীবের পরে ছয় রাকাতের পরিবর্তে বিশ রাকাত আওয়াবীন পড়তেন। এতে কমপক্ষে দুই পারা কুরআন তিলওয়াত করতেন । পাশাপাশি রুক-সেজদা এত লম্বা হত যে, দেখলে মনে হত, হযরত নামাযের কথা ভুলে গেছেন ।

নাযায শেষে বাড়ী যেতেন এবং খানা খাওয়া পর্যন্ত কয়েক পারা তিলওয়াত করতেন। কিছুক্ষণ পর আবার ইশা ও তারাবীর নামাযের সময় হয়ে যেত। এতেও কমপক্ষে এক ঘন্টা সোয়া ঘন্টা লেগে যেত। তারাবীহ শেষে সাড়ে দশটা কি এগারটার দিকে আরাম করতে যেতেন এবং দুইটা আড়াইটার দিকে অবশ্যই উঠে যেতেন। তখন আড়াই তিন ঘন্টা তাহাজ্জুদে কাটিয়ে দিতেন। অনেক সময় খাদেমরা ৫ টার সময় সাহরী নিয়ে হাযির হয়ে দেখতেন, হযরত তখনও নামাযে রত।

ফজরের পর আটটা সাড়ে আটটা পর্যস্ত যিকির-আযকার, ওযীফা ও মুরাকাবায় মগ্ন থাকতেন। অতঃপর ইশরাক পড়ে কিছুক্ষণ আরাম করতেন। এর মধ্যে ডাক পিয়ন এসে গেলে প্রয়োজনীয় চিঠি পাত্রের জবাব দিতেন। জরুরী ফতোয়া ও মাসায়েল লিখাতেন। এরপর চাশতের নামায পড়ে কায়লুলা করতেন। যোহরের পর রুমের দরজা বন্ধ করে দেয়া হত। তখন থেকে আসর পর্যন্ত কুরআন তিলওয়াত করতে থাকতেন । এটা ওই রমাযানের কারগুযারী, যখন বার্ধক্য ছাড়াও হযরতের কোমরে এত তীব্র ব্যাথা ছিল যে, হুজরা থেকে টয়লেটের দূরত্ব ছিল মাত্র ষোল কদমের পথ । সেখানেও যেতে পথিমধ্যে একবার বসে পড়তে হত। এত কষ্ট সত্তেও ফরয তো ফরযই, নফল নামাষও হযরতকে বসে পড়তে দেখা যায়নি। ঘন্টার পর ঘন্টা যে, আজকের তারাবীহ বসে বসে পড়লে ভাল হবে। কিন্ত তিনি জবাব দিতেন, না জ্বী! এ তো বড় কম হিম্মতের কথা ।

কি আশ্রয হিম্মত! আর কেনই বা হবে না? রাসূল সা. বলেছিলেন – ‘আমি কি শোকর গুযার বান্দা হবো না”? রাসূলের সেই বাণীর মর্যাদা রক্ষা করা তার উত্তরাধিকারীদের পক্ষে এমন হিম্মত ও রাহে খোদায় কদম রাখার দূর্জয় সাহস ব্যতীত কখনো সম্ভব নয়।

রমাযান মাসে হযরতের সব আমলই বেড়ে যেত। কিন্তু বিশেষভাবে কুরআন তিলওয়াতের আধিক্যতা এত বেশি বেড়ে যেতে যে, মসজিদ থেকে বাড়ী আসা-যাওয়ার পথে কারো সাথে কথা-বার্তাও বলতেন না। নামায ও নামাযের বাহিরে প্রত্যেক দিন অর্ধেক কুরআন শরীফ খতম করা তার দৈনন্দিন আমলে পরিণত হয়ে গিয়েছিল । প্রথম রোযার দিন সবাইকে বলে দিতেন যে, আজ থেকে মজলিস স্থগিত হয়ে গেল। রমাযানের মত মূল্যবান মাসকে কেউ নষ্ট করে দিলে এটা হবে বড়ই অনুতাপের বিষয় । এত মুজাহাদা ও পরিশ্রম হওয়া সত্তেও খানা এত কম খেতেন যে, সারা রমাযান মিলে পাচ সের তরকারীও খেতেন কিনা সন্দেহ।

তাযকীরাতুর রশীদের অন্য এক স্থানে হযরতের রমাযান মাসের মা’মূলাত সম্পর্কিত তার অন্যতম খলীফা হাকীম ইসহাক সাহেব নাহটুরীর একটি লেখা প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে হাকীম সাহেব লিখেছেন –
রমযান শরিফে সকালে হুজরা শরিফ থেকে অনেক দেরিতে বের হতেন। শীতকালে সাধারণত দশটার দিকে বাইরে তাশরীফ আনতেন। নফল নামায, কুরআন তিলওয়াত, মুরাকাবা ইত্যাদির মাত্রা অন্যান্য সময়ের তুলনায় অনেক বেড়ে যেত। শোয়া ও আরাম করার সময় কমে যেত। কথাও খুব কম বলতেন । মাগরীবের পর কিছুক্ষণ নির্জনতায় কাটিয়ে খানা খেতেন । প্রথম জীবনে নিজেই বিশ রাকাত তারাবীহ পড়াতেন। শেষ জীবনে এসে সাহেবজাদার পিছনে পড়তেন। বিতিরের পর লম্বা দু রাকাত নফল নামায় কখনো দাড়িয়ে আবার কখনো বসে
পড়তেন।

দীর্ঘক্ষণ কিবলামুখী হয়ে কি যেন পড়তে থাকতেন।এরপর একটি তিলওয়াতের সিজদা করে উঠে যেতেন। কিছু, কিছু শব্দ শুনে বান্দার ধারণা হর যে, এ সময়টায় তিনি সুরা “তাবারাকাল্লাধী” সূরা “সাজদা” এবং সুরা “দুখান” তিলওয়াত করতেন। অধিকাংশ সময় যিলহজ্জ  মাসের পুরো নয়দিন, আশুরা এবং পনের শাবানের রোযাও রাখতেন।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com