শনিবার, ০৮ মে ২০২১, ০৮:৪৬ অপরাহ্ন

মুক্তির জন্য জন্য তওবা করুন

সৈযদ আনোয়ার আবদুল্লাহ

রমজান মাসে তওবার মাধ্যমে রোজাদারের পাপমুক্তি, ক্ষমাশীলতা ও নাজাতপ্রাপ্তির পথ সুগম রাখা হয়েছে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) মিম্বারে উঠলেন এবং বললেন—আমিন, আমিন, আমিন। বলা হলো, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি মিম্বারে উঠছিলেন এবং বলছিলেন, আমিন, আমিন, আমিন। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই জিবরাইল আমার কাছে এসেছিলেন। তিনি বললেন, যে রমজান পেলো অথচ তাকে ক্ষমা করা হলো না, সে জাহান্নামে যাবে এবং আল্লাহ তাকে দূরে সরিয়ে দেবেন—বলুন আমিন। আমি বললাম আমিন; যে তার মা-বাবা উভয়কে পেলো অথবা তাদের একজনকে পেলো অথচ তাদের মাধ্যমে সে পুণ্যের অধিকারী হতে পারলো না এবং সে মারা গেলো, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে এবং আল্লাহ তাকে দূরে সরিয়ে দেবেন—বলুন আমিন। আমি বললাম আমিন; যার কাছে আপনার নাম উচ্চারিত হলো অথচ সে আপনার প্রতি দরুদ পাঠ করলো না এবং মারা গেলো, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে এবং আল্লাহ তাকে দূরে সরিয়ে দেবেন—বলুন আমিন। আমি বললাম আমিন। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ১৮৮)

আলোচ্য হাদিসে রমজান মাসে গুনাহ থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর কাছে তওবা করার প্রতি বিশেষ তাগিদ রয়েছে। কেননা রমজান রহমত ও মাগফিরাতের মতো পাপ থেকে মুক্তিলাভেরও মাস।

পবিত্র রমজানের বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে আল্লাহ বান্দার দোয়া কবুল করেন এবং পাপ মার্জনা করেন। যেমন ইফতারের আগমুহূর্ত। এই সময়গুলোতে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি প্রার্থনা করা এবং অতীত পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা আবশ্যক। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না—ন্যায়পরায়ণ শাসক, রোজাদার যতক্ষণ না সে ইফতার করে এবং অত্যাচারিত ব্যক্তির দোয়া। ’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৭৫২)

নবী-রাসুলগণ নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও উম্মতের গুনাহখাতা মাফের জন্য এবং মানুষকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য মহানবী (সা.) তওবা করতেন। হাদিস শরিফ থেকে জানা যায় যে, আল্লাহ তাঁর বান্দার তওবা মৃত্যুকালীন কষ্ট শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কবুল করে থাকেন। এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে মানবমণ্ডলী! তোমরা আল্লাহর কাছে তোমাদের গুনাহর জন্য তওবা করো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। আমার প্রতি লক্ষ করো! আমি প্রত্যহ শতবার করে আল্লাহর কাছে তওবা করে থাকি।’ (মুসলিম) রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘বান্দা গুনাহ করার পর তওবা করলে আল্লাহ সে ব্যক্তির ওপর ওই ব্যক্তির চেয়ে অধিক খুশি হন যে ব্যক্তি নিজের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উট কোরনা ময়দানে হারিয়ে যাওয়ার পর তা হঠাৎ পেয়ে গেলে খুশি হয়।’ (বুখারি ও মুসলিম)

শয়তানের প্ররোচনায় কোনো পাপকাজ করে ফেললে তা বুঝে আসামাত্র দুঃখিত-অনুতপ্ত ও লজ্জিত হয়ে তা তাৎক্ষণিক পরিত্যাগ করে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করে এই প্রতিজ্ঞা করা যে, ভবিষ্যতে তা আর কখনোই করব না। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা অসৎ কাজ করে তারা পরে তওবা করে অনুতপ্ত হলে ও ইমান আনলে তোমার প্রতিপালক তো পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।’ (সূরা আল-আরাফ, আয়াত: ১৫৩)

হে নবী, আপনি বলে দিন, হে আমার বান্দারা, তোমরা যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছো, তারা আল্লাহর তায়ালার রহমত থেকে কখনোই নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (সুরা যুমার: আয়াত ৫৩)।

এ কথা সুস্পষ্ট যে, পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার অফুরন্ত ভাণ্ডারের দরজা খুলে যায়। রমজান মাসে দিনে রোজা আর রাতে নামাজের মাধ্যমে মুসলমানগণ রহমত ও ক্ষমার সুযোগ লাভ করেন। কারণ, মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদিস থেকে জানা যায়:

‘মহান আল্লাহ রাতের বেলা তাঁর হাত প্রসারিত করেন, যাতে দিনের অপরাধীরা তাওবা করতে পারে। আর তিনি অনুরূপ দিনে তাঁর ক্ষমার হাত প্রসারিত করেন, যাতে অপরাধীগণ তাওবা করতে পারে। এমন চলতে থাকে যতক্ষণ না সূর্য পশ্চিমাকাশে উদিত হয়’ (সহিহ মুসলিম: ২৭৫৯)।

অপরাধ করার পর যত শিগগির পারা যায় তওবা করা সমীচীন। গুনাহ থেকে তওবা করা ওয়াজিব। যদি পাপ আল্লাহ ও বান্দাসংশ্লিষ্ট হয় তখন আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চেয়ে তওবা করা উচিত। গুনাহর কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য বারবার তাগিদ দিয়ে নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি যদি পাপকাজে নিয়োজিত হয়, তখন তার কলবে পাপের একটি কালো চিহ্ন অঙ্কিত হয়। যদি সে পবিত্র চিত্তে তাওবা করে (অর্থাৎ এ কাজ আর করবে না বলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়) এবং কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করে, তবে ওই কালো চিহ্ন ধৌত হয়ে যায়। আর যদি তওবা না করে আরও গুনাহ করে তাহলে কালো দাগ বিস্তার লাভ করতে থাকে। এভাবে কলব একেবারে কালো হয়ে যায়।’ (তিরমিজি)

আল্লাহ তায়ালার অনুগত বান্দার লক্ষণ হলো, তারা কখনোই গোনাহের উপর অটল হয়ে বসে থাকে না। ভুল করলেই ভুল বা অপরাধের স্বীকারোক্তি দিয়ে ক্ষমা চায়। অপরাধের জন্য লজ্জিত হয়। আল্লাহ তায়ালা অনুতপ্ত, লজ্জিত, তাওবাকারীকে ভালোবাসেন ও ক্ষমা করেন। একটি হাদিসের শিক্ষাও এই প্রসঙ্গে মনে রাখা বিশেষভাবে জরুরি:

`সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যে রমজান মাস পেলো, অথচ নিজের গোনাহ মাফ করাতে পারলো না’ (সুনানে তিরমিজি: ৩৫৪৫)।

রমজানে প্রত্যেকেই নিজেকে পরিচ্ছন্ন ও পাপমুক্ত করার সংকল্প করতে হবে। তওবা ও ইস্তেগফারের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো মানুষের ক্ষতি করে থাকলে, কারও জীবন, সম্পদ বা সম্মানে আঘাত করে থাকলে প্রথমে তার কাছেই ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। কোনো অন্যায় কাজে লিপ্ত থাকলে এখনই তা পরিত্যাগ করতে হবে। কারও সম্পদ অন্যায়ভাবে দখল করে রাখলে অবিলম্বে তা ফেরত দিতে হবে। এরপর নিজের মধ্যে অনুশোচনাবোধ সৃষ্টি হলে আল্লাহ তায়ালা বিগত দিনের গোনাহ অবশ্যই ক্ষমা করবেন। অতীতে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ হয়ে থাকলে আবার তওবা করতে হবে। তওবা ভঙ্গ হয়ে গেলেও আবার তওবা করলে আল্লাহ তায়ালা তা কবুল করবেন। বান্দার বারবার গোনাহ এবং তওবার দ্বারাও আল্লাহ বিরক্ত হন না। আল্লাহ চান বান্দা যত অবাধ্যই হোক এক সময় তার দরবারে ফিরে আসুক।

রমজান পেয়েও গুনাহ মাফ করাতে না পারা দুর্ভাগ্যজনক। যেমনটি আলোচ্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। অন্য এক বর্ণনায় মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘ওই ব্যক্তির নাক ধুলোধূসরিত হোক, যে রমজান পেলো এবং তার গুনাহ মাফ করার আগেই তা বিদায় নিল। ’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৪৫)

হে আল্লাহ! রমজান মাসের শেষ দশকে তওবার ব্যাপারে আমাদের মধ্যে গণসচেতনতা সৃষ্টি করুন এবং পাপকাজ করার পরপরই যাতে আপনার কাছে তওবা করতে পারি, সেই তাওফিক দান করুন!

 

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com