রবিবার, ২৫ Jul ২০২১, ০৪:৫১ পূর্বাহ্ন

আমীরুল হিন্দ আল্লামা ক্বারী উসমান মানসুরপুরীঃ জীবন ও কর্ম

আমীরুল হিন্দ আল্লামা ক্বারী উসমান মানসুরপুরীঃ জীবন ও কর্ম

আমীরুল হিন্দ আল্লামা ক্বারী উসমান মানসুরপুরীঃ জীবন ও কর্ম

 : আল্লামা সাইয়্যিদ ক্বারী মুহাম্মদ উসমান মানসুরপুরী (রহ.) ছিলেন শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) এর জামাতা, দারুল উলুম দেওবন্দের নির্বাহী মুহতামিম ও মুহাদ্দিস এবং অল ইন্ডিয়া মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়াতের প্রধান। দৈহিক সৌন্দর্য, চারিত্রিক গুণাবলী, সৌজন্যবোধ, বংশীয় আভিজাত্য, খোদাভীতি ও পূতপবিত্রতার সাথে সাথে আল্লাহ তাআলা তাঁকে দান করেছিলেন সুশৃঙ্খল ও সুনিয়ন্ত্রিত এক জীবনাচার। ছাত্রদের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন  ও তাদের বিপদে পরম বন্ধুর মতো পাশে থাকা ছিলো তাঁর অনন্য বৈশিষ্ট্য। নিয়মানুবর্তিতা ছিলো তাঁর স্বভাবজাত বিষয়।

১৯৪৪ সালের ১২ই আগস্ট মুজাফফর নগর জেলার মনসুরপুরের একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা নবাব সাইয়্যিদ মুহাম্মাদ ঈসা (রহ.) ছিলেন একজন প্রভাবশালী ক্ষমতাধর ব্যক্তি। তিনি একজন খাঁটি ধর্মভীরু মানুষ ছিলেন। ধর্মের প্রতি ছিল তাঁর অগাধ সম্মান ও বিশ্বাস। তাঁর কাছে শরীয়তবিরোধী কাজের কোনও স্থান ছিল না। সন্তানদেরকে ইলম ও আমলের পথে পরিচালিত করার প্রচণ্ড ইচ্ছা ও আকাঙ্খা ছিলো নবাব মুহাম্মদ ঈসা (রহ.)-এর। তাই সন্তানদের ইলমে দ্বীন শিক্ষার খাতিরে তিনি বাড়ি ছেড়ে দেওবন্দ এলাকায় চলে আসেন। ১৯৬৩ সালে তিনি দেওবন্দেই ইন্তেকাল করেন। মাকবারায়ে কাসেমীতে নবাব ঈসা (রহ.)-কে দাফন করা হয়।

হযরত ক্বারী উসমান মানসুরপুরী (রহ.) তাঁর নিজ গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন এবং তাঁর প্রয়াত পিতার কাছেই পবিত্র কুরআন শরীফ হিফজ সমাপ্ত করেন। তারপর ফার্সি জামাত থেকে শুরু করে দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত পরিপূর্ণ পড়াশোনা তিনি দারুল উলূম দেওবন্দেই শেষ করেছেন। শিক্ষাজীবনে সর্বদা তিনি ঈর্ষণীয় ফলাফল অর্জন করতেন। ১৯৬৫ সালে দেওবন্দে দাওরায়ে হাদীস পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান লাভ করেন।

১৯৬৬ সালে ক্বারী হিফজুর রহমান (রহ.) ও ক্বারী আতীক (রহ.)-এর কাছে কিরাআত ও তাজবীদ বিষয়ে শাস্ত্রীয় জ্ঞান লাভ করেন। অতঃপর প্রখ্যাত আদীব মাওলানা ওয়াহিদুজ্জামান কিরানবী (রহ.)-এর নিকট আরবী ভাষা ও সাহিত্যে পূর্ণ দক্ষতা অর্জন করেন। পরবর্তীতে আমীরুল হিন্দ, ফিদায়ে মিল্লাত হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ আসআদ মাদানী (রহ.)-এর নিকট সুলূক ও মারেফাতে পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়ে খিলাফাত ও ইজাযত লাভে ধন্য হয়েছিলেন।

শিক্ষাজীবন সমাপান্তে তিনি বিহারের জামিয়া কাসেমিয়াতে পাঁচ বছর এবং জামিয়া ইসলামিয়া জামে মসজিদ আমরুহায় এগারো বছর অধ্যাপনা করেছেন। বিভিন্ন শাস্ত্র ও বিষয়াদির কিতাব পাঠদানের পাশাপাশি একই সাথে জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের প্ল্যাটফর্মে থেকে তাঁর জনসেবা মূলক সামাজিক কাজও অব্যাহত রেখেছিলেন। ১৯৭৯ সালে ফিদায়ে মিল্লাত সাইয়্যিদ আসআদ মাদানী (রহ.) এর নেতৃত্বে ‘দেশ বাঁচাও, জাতি বাঁচাও’ আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তিনি দশ দিন তিহার জেলে আটক ছিলেন। অতঃপর জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের মজলিসে আমেলার অন্যতম প্রধান সদস্য হিসেবে ছিলেন। ফিদায়ে মিল্লাত সাইয়্যিদ আসআদ মাদানী (রহ.) এর ইন্তেকালের পর তিনি সংগঠনের গঠনতন্ত্র মোতাবেক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে জমিয়তকে সামনে এগিয়ে নেন। মজলিসে আমেলা কর্তৃক ২০০৮ সালের ৬ই মার্চ প্রথমে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং পরে ৫ই এপ্রিল ২০০৮ সালে জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের সভাপতি নির্বাচিত হন। আমৃত্যু তিনি এই মহান দায়িত্ব ও খিদমত আঞ্জাম দিয়ে গেছেন।

হযরত ক্বারী উসমান মানসুরপুরী (রহ.) এর নেতৃত্বে জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ রাষ্ট্রের আনাচে-কানাচে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও রাষ্ট্র বিরোধী চক্রান্তের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে এবং ইসলামের শান্তির পয়গাম বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে দিল্লি ও দেওবন্দে ‘আমনে আলম কনফারেন্স’ বা বিশ্ব শান্তি সম্মেলনের আয়োজন করে।

তিনি প্রতিনিয়ত ভারতের সকল দলকে এক মঞ্চে একত্রিত করার প্রয়াস চালিয়েছেন। সে লক্ষ্যেই জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ ২০১৯ সালে এক অনুষ্ঠানে হিন্দু-মুসলিম নেতৃবৃন্দকে একই মঞ্চে উপস্থিত করেছিল। অনুরূপ ২০১৭ সালে তাঁর নেতৃত্বে ভারতের এক হাজার শহরে একসাথে ‘আমান মার্চ’ বা শান্তি র‍্যালী বের হয়েছিল।

[বাংলাদেশেও তিনি ২০১১ সালে তৎকালীন স্পিকার ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি জনাব মো. আব্দুল হামিদের উপস্থিতিতে ইসলামী গবেষণা পরিষদ আয়োজিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টি : আলেম সমাজের দায়িত্ব ও কর্তব্য’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনারে দেওবন্দ ও জমিয়তের পক্ষ থেকে যোগ দিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন শাইখুল হাদীস যাকারিয়া (রহ.)-এর অন্যতম খলীফা শায়খ আবদুল হাফিজ মাক্কী (রহ.) এবং সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ – অনুবাদক]

এ ছাড়া আল্লামা সাইয়্যিদ ক্বারী মুহাম্মদ উসমান মানসুরপুরী মুসলিমদের মাঝেও আভ্যন্তরীণ ঐক্য তৈরীর লক্ষ্যে বিপুল বিস্তৃত কাজ করেছেন। ২০১১ সালে গোত্র কেন্দ্রিক সংঘাতের বিল ও সংখ্যালঘু মুসলিমদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ‘দেশ বাঁচাও, জাতি বাঁচাও’ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। লক্ষ্ণৌতে সশরীরে মাঠে-ময়দানে উপস্থিত ছিলেন।

২০১৬ সালে আজমির শরীফে জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের ৩৩ তম সাধারণ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। যেখানে মুসলমানদের দুই পক্ষ একত্রে একই মঞ্চে অবস্থান নেয় এবং বিশ্বব্যাপী ঐক্যের পয়গাম তুলে ধরে।

দিল্লি, কাশ্মীর, মুজাফফর নগর, আসাম, বিহার ইত্যাদি দাঙ্গা কবলিত এলাকায় মুসলমানদের সেবাশশ্রুষা ও সাহায্য সহযোগিতায় সশরীরে সামনের কাতারে থেকে নিজেকে বিলিয়ে দেন।

২০১০ সালে দেওবন্দের তৎকালীন মুহতামিম মাওলানা মারগুবুর রহমান সাহেব (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর থেকে তাঁকে ইমারাতে শরীয়ায়ে হিন্দের অধীনে আমীরুল হিন্দ নির্বাচিত করা হয়।

১৯৮২ সাল থেকে দারুল উলূম দেওবন্দে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি মাদরাসার বিভিন্ন ব্যবস্থাপনাগত দায়িত্বও আঞ্জাম দিয়েছেন। তাঁর দরস ছিল অহেতুক, অনর্থক হাস্যরস থেকে মুক্ত নির্ঝঞ্ঝাট ও প্রজ্ঞাপূর্ণ । খুব পরিস্কার ভাষায় আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গীতে বুঝাতেন তিনি। অনুবাদ করতেন প্রাঞ্জল ভাষায়।

১৯৮৬ সালের অক্টোবর মাসে ‘আন্তর্জাতিক খতমে নবুওয়াত সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তিনি ছিলেন এর আহ্বায়ক। এরই মধ্য দিয়ে ‘অল ইন্ডিয়া মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়াত’ প্রতিষ্ঠা পায় এবং তিনি এর সভাপতি নির্বাচিত হন। এই সংগঠনটি ভারতের কাদিয়ানি ফিতনার বিরুদ্ধে অনেক কাজ করেছে। যা দারুল উলুম দেওবন্দের ইতিহাসে এক সোনালী অধ্যায় হয়ে থাকবে। এ সবই হলো তাঁর ঈমানী চেতনার প্রতিক্রিয়া ও অনিঃশেষ প্রাণশক্তির প্রচেষ্টার ফসল। নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন ‘ইয়ুকাতিলূনা আহলাল ফিতান’ এর গুণে গুণান্বিত। নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন ‘আল আখিরূনাস সাবিকূন’ এর একজন, হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী যাদের ‘লাহুম মিছলু আজরি আওওয়ালিহিম’ এর গৌরব ও মর্যাদা অর্জিত হবে।

এতো সব দায়িত্বপালন করেও ১৯৯৯ সাল থেকে নিয়ে ২০১০ পর্যন্ত দারুল উলুম দেওবন্দের নায়েবে মুহতামিমের দায়িত্বও সফলভাবে সাথে আঞ্জাম দেন হযরত উসমান মানসুরপুরী (রহ.)। ২০২০ সালে দারুল উলূম দেওবন্দের মজলিসে শূরা তাঁকে দারুল উলূম দেওবন্দের নির্বাহী মুহতামিম হিসেবে নির্বাচিত করে। বিগত রমজান মাসে তিনি দারুল উলূম দেওবন্দের ভারপ্রাপ্ত মুহতামিম হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। কাজের চাপ ও বিভিন্ন ধরণের ব্যাস্ততার দরুন তাঁর বড় আকারে রচিত কোন গ্রন্থ নেই, তবে তাঁর লেখা প্রবন্ধ ও পুস্তিকাসমূহ পড়লে বুঝা যায় রচনাশৈলিতেও তাঁর চমৎকার দক্ষতা ছিলো।

১৯৬৬ সালে তিনি শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) এর কন্যার সাথে সুন্নত মোতাবেক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। শায়খুল হাদীস হযরত মাওলানা যাকারিয়া কান্ধলবী (রহ.) তাঁর বিবাহ পড়িয়েছিলেন।

ব্যক্তিজীবনে তিনি দুই ছেলে ও এক কন্যার পিতা। বড় সাহেবজাদা মাওলানা মুফতি সাইয়্যিদ সালমান মানসুরপুরী হলেন শাহী মুরাদাবাদ মাদরাসার প্রধান মুফতি ও হাদীসের উস্তায। ছোটকাগজ ‘নেদায়ে শাহী’ এর সম্পাদক এবং একাধিক খণ্ডবিশিষ্ট এক ডজনেরও বেশি গ্রন্থের রচয়িতা।

ছোট সাহেবজাদা মাওলানা হাফিজ ক্বারী সাইয়্যিদ আফফান মানসুরপুরী দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে ইফতা, আরবী সাহিত্য ও তাখাসুস ফিল হাদীস বিভাগের শিক্ষা সমাপন করে শাহী মুরাদাবাদ মাদরাসায় চার বছর শিক্ষকতা করার পর বর্তমানে জামিআ ইসলামিয়া আরাবিয়া জামে মসজিদ মাদরাসায় হাদীসের উস্তায ও প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন।

গতকাল শুক্রবার (২১ মে) দুপুর দেড়টায় জুমার নামাযের সময় গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ভারতের গুরগাঁও হাসপাতালের আইসিইউতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আল্লামা ক্বারী সাইয়্যিদ মুহাম্মদ উসমান মানসুরপুরী (রহ.)। তাঁর ইন্তেকালে এশিয়া মহাদেশের দুই সুবিশাল দ্বীনী প্রতিষ্ঠান দারুল উলূম দেওবন্দ ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের অপূরনীয় ক্ষতি হয়ে গেল। এমন মহা মনীষা না ফেরার দেশে চলে যাওয়ায় পুরো দেশ এখন শোকাস্তব্ধ। আল্লাহ তাআলা তাঁর কবরকে নূর দ্বারা ভরপুর করে দিন, আমীন।

জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের উর্দূ প্রেস রিলিজ থেকে অনুবাদঃ মুফতি মুহাম্মদ আইয়্যুব ও আব্দুর রহমান রাশেদ

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com