বৃহস্পতিবার, ০৮ এপ্রিল ২০২১, ১২:৫১ পূর্বাহ্ন

পবিত্র ক্বাবাগৃহে প্রবেশের সৌভাগ্য লাভের পর আল্লামা মাসঊদের অনুভুতি

পবিত্র ক্বাবাগৃহে প্রবেশের সৌভাগ্য লাভের পর আল্লামা মাসঊদের অনুভুতি

তাবলীগ নিউজ বিডডটকম | সৌদি সরকার ও রাবেতা আল ইসলামীর আমন্ত্রণে গেল সাপ্তাহে বাংলাদেশের বর্ষিয়ান আলেমেদ্বীন শায়খুল হাদীস আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ দা.বা পবিত্র কাবা গৃহে প্রবেশের বিরল সৌভাগ্য ও সম্মান অর্জন করেন। সেই সময় বাংলাদেশে একদল উগ্রপন্থী আলেম তার ফাঁসির নোংড়া দাবীতে মিছিল করছিল। উমরা থেকে গতকাল বাংলাদেশে  ফিরে বরেণ্য এই আলেম তার অনুভুতি প্রকাশ   করেছেন এভাবে…

আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ তাআলার মেহেরবানি, আল্লাহ তাআলার ফজল ও করমে আল্লাহ তাআলা আমাকে তাঁর ঘরের অভ্যন্তরে প্রবেশ ও ইবাদতের সৌভাগ্য লাভ করিয়েছেন। এই সৌভাগ্য কারো ইলমের কারণে অর্জিত হয় না, কারো বুজুর্গীর কারণে অর্জিত হয় না, বংশের কারণেও হয় না, ক্ষমতার কারণেও হয় না, টাকার কারণেও হয় না। বহু ক্ষমতাবান ব্যক্তি যেতে পারেনি। বহু টাকাওয়ালা ব্যক্তি যেতে পারেনি। বহু বংশওয়ালা যেতে পারেনি। বহু বড় বড় আলেমও যেতে পারেনি। বহু মেধাবীও যেতে পারেনি। কাবা শরীফের ভিতরে প্রবেশ করা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একটা নির্বাচন। আল্লাহ তাআলা যাকে নির্বাচন করেন, কেবল তারই সৌভাগ্য হয় কাবা শরীফের ভিতরে প্রবেশ করার।

 

কাবা শরীফের ভিতরে প্রবেশ করা এটা শরীয়তের শরয়ী কোন হুকুম না বা শরীয়তের কোন দলীল না। তবে শরয়ী হুকুম না হলেও অবশ্যই এটার একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে, আলাদা ফজিলত আছে। যদি না থাকতো তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা ইহতেমাল করে ভিতরে ঢুকতেন না। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য কাউকে সাথে নেন নাই। একমাত্র হযরত বেলাল রা.-কে সাথে নিয়ে ভিতরে ঢুকেছেন।

 

বান্দাদের উপর অসংখ্য ও অগণিত আল্লাহ তাআলার মেহেরবানি- এতে কোন সন্দেহ নাই। আবার আল্লাহ তাআলার কিছু কিছু মেহেরবানি এমন আছে যা তিনি তার বিশেষ বান্দাদেরকে দান করেন। আমার মত হেয়, নিচু, গুণাহগার এই অধমের উপরে আল্লাহ তাআলার শৈশব থেকেই এমন অনেকগুলো নিয়ামত ছিল, এখনো আছে, যেগুলো সাধারণভাবে অনেকেরই নেই। আল্লাহ তাআলা আমাকে এইগুলো বিশেষভাবে দিয়েছেন আলহামদুলিল্লাহ। এর মধ্যে একটা বড় নিয়ামত হলো, আল্লাহ তাআলা আমাকে যে ফ্যামেলি থেকে নির্বাচন করেছেন, এই ফ্যামেলিতে ইলম ও ইলমে এলাহীর কোন চর্চা ছিল না। আল্লাহ তাআলা আমাকে প্রথম নির্বাচন করেছেন ইলম ও ইলমে এলাহীর জ্ঞান অর্জনের জন্য। আল্লাহ তাআলা আমার বাবাকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন। আমি নিজের ইচ্ছায় মাদারাসায় পড়েছি। আমার কষ্ট হবে তাই আমার মা-ও গ্রাম থেকে শহরে চলে এসেছিলেন। আমার কখনো মাদরাসার বোর্ডিং বা লজিং এ থেকে পড়া হয়নি। মায়ের কাছে থেকেই পড়া হয়েছে।

 

ঠিক এমনিভাবে আরেকটা জিনিস হলো আমার আসাতেজায়ে কেরাম, আমার উপরে খুবই তাদের এনায়াত ছিল, মেহেরবানি ছিল, আশা ছিল, মহব্বত ছিল। সবাই খুব ভালবাসতেন। আমার দ্বারা এমন অনেক ব্যবহার হয়ে যেত, যাকে আমি অত্যাচার বলবো কিন্তু তারা অত্যন্ত হাসি মুখে তা সহ্য করেছেন, আমাকে দুআ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলার আরো একটা বড় মেহেরবানী হলো, মাওলানা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রহ.-এর মাধ্যমে আমাকে দারুল উলূম দেওবন্দ যাওয়ারও তাওফিক দিয়েছিলেন। এই যামানায় আল্লাহ তাআলা দারুল উলূম দেওবন্দকে হক ও হক্কানীয়তের মারকায হিসেবে কবুল করেছেন। একটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এইভাবে সারাবিশ্বে খুব কম প্রতিষ্ঠানকে আল্লাহ তাআলা কবুল করেছেন। আল্লাহ তাআলা আমাকে দারুল উলূম দেওবন্দে যাওয়ার তাওফিক দিয়েছেন এবং উস্তাদদের সামনে বসার তাওফিক দিয়েছেন। ইলম হাসিল হয়েছে কিনা এটা আল্লাহ তাআলা ভালো জানেন। আমার হাদীসের উস্তাদদের মধ্যে ছিলেন মাওলানা শরীফুল হাসান রহ., কারী তৈয়ব সাহেব রহ.।

 

আল্লাহ তাআলা আমাকে যতটা সৌভাগ্য দিয়েছেন, তার মধ্যে এটাও একটা যে, দারুল উলূম দেওবন্দে যখন একশ বছর পূর্তি হয়, সেখানে বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে একমাত্র আমাকেই সবাই নির্বাচন করেছিলেন, অথচ তখন আমার বয়স খুব বেশি ছিল না। বাংলাদেশের সব মুরব্বীরা তখন সেখানে হাজির ছিলেন। আর পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কথা বলেছিলেন মুফতি মাহমুদ সাহেব রহ.। তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সেক্রেটারী জেনারেল ছিলেন এবং পাকিস্তানে উলামায়ে দেওবন্দের কায়েদ ছিলেন। তিনি পাকিস্তানের উত্তর পশ্চিম সীমান্তের মুখ্যমন্ত্রীও হয়েছিলেন। পৃথিবী দেখেছিল একজন মুখ্যমন্ত্রীকে যিনি রমজানে খতমে তারাবিহও পড়াচ্ছিলেন, আবার মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করছিলেন। ওইখানে মুফতি মাহমুদ সাহেব প্রস্তাব দিয়েছিলেন, পাকিস্তানের বহু মানুষ পাসপোর্ট ভিসার ঝামেলার কারণে এখানে আসতে পারেন নাই এবং ভবিষ্যতে অনেকে আসতে পারবে না। তাই দারুল উলূম দেওবন্দের পক্ষ থেকে যদি পাকিস্তানে এইভাবে দারুল উলূম দেওবন্দের শত বার্ষিকীর আয়োজন করা হয় এবং ছাত্রদের সনদ ও পাগড়ি প্রদান করা হয় তাহলে খুবই ভালো হয়।

 

আমি যখন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বক্তব্য দিয়েছিলাম, তখন আমার বক্তব্যের শেষেও এই প্রস্তাব ছিল যে, বাংলাদেশ থেকেও অনেকে আসতে পারেন নাই, তাই বাংলাদেশে যদি এমন একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো এবং দেওবন্দের পক্ষ থেকে উলামায়ে কেরাম গিয়ে ছাত্রদের পাগড়ি সনদ প্রদান করতেন তাহলে অনেক ভালো হত। দারুল দেওবন্দের এই মজলিসে আমাদের এই প্রস্তাব গৃহীত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে এই প্রস্তুতিটা নানান কারণে স্থিমিত হয়ে যায়। পরে আমি আবার এই প্রস্তাব জানেশীনে ফিদায়ে মিল্লত সাইয়্যিদ মাওলানাপরে আমি আবার এই প্রস্তাব জানেশীনে ফিদায়ে মিল্লত সাইয়্যিদ মাওলানা আসআদ মাদানী রহ.-কে স্মরণ করিয়ে দিলাম। তখন আবার দারুল উলূম দেওবন্দের মজলিসে শূরার এই প্রস্তাবটি পাশ হয় বাংলাদেশের পক্ষে কিন্তু পাকিস্তানের পক্ষে পাশ হয় নাই এবং এখন পর্যন্ত পাকিস্তানে এটা হয় নাই। তখন বাংলাদেশের যারা দারুল দেওবন্দের ফেরেগীন ছিলেন তাদের সবাইকে ডাকা হলো ঢাকায়। আর দারুল উলূম দেওবন্দের মজলিসে শূরার পক্ষ থেকে দারুল উলূম দেওবন্দের মুহতামিম সাহেব হযরত মাওলানা মারগুবুর রহমান রহ. এবং নাজিমে তালিমাত হযরত মাওলানা আরশাদ মাদানী উনারা এসেছিলেন।

 

এই তোমাদের তথাকথিত জমহুর আছে না, ওরা সবাই তখন এই অনুষ্ঠানে বিরোধিতা করেছিলেন। এর পক্ষে কেবল ছিলেন কুড়িয়ার শেখ সাহেব, সিলেট। মুফতি নুরুল্লাহ সাহেব, ব্রাক্ষাণবাড়িয়া। আর কাজী মুতাসিম বিল্লাহ সাহেব। এখান তারা সবাই রহ. হয়ে গেছেন। আর তথাকথিত জমহুররা সবাই মিলে একটা লম্বা ফেক্স পাঠালো আমার বিরুদ্ধে মুহতামিম (দারুল উলূম দেওবন্দ) সাহেবের নামে। এখানে লেখা হলো, আপনারা ঢাকায় আসবেন না, এখনে এলে গণ্ডগোল হবে, হৈচৈ হবে, অনুষ্ঠান হবে না। তাই আমরা আগে থেকে আপনাদের সতর্ক করছি। আর এই ফেক্সের মধ্যে বাংলাদেশের সব মাওলানা স্বাক্ষর করলো। ছোট বড় সবাই। ছোটদের মধ্যে ঈসহাক ফরিদী, আবুল ফাত্তাহ ইয়াহয়ার স্বাক্ষর ছিল। আর বড়দের মধ্যে মুফতি আব্দুর রহমান সাহেব, মাওলানা আজিজুল হক সাহেব, মাওলানা উবায়দুল হক সাহেব তাদের স্বাক্ষর ছিল। এক আমার বিরুদ্ধে সবাই মিলে একত্র হয়েছে। আর আমি তখন একা। শুধু আমার সাথে ছিলেন, কুড়িয়ার শেখ সাহেব, সিলেট। মুফতি নুরুল্লাহ সাহেব, ব্রাক্ষাণবাড়িয়া। আর কাজী মুতাসিম বিল্লাহ সাহেব। আল্লাহ তাআলা তাদের সবার কবরকে নুর দিয়ে ভরপুর করে দিন। আল্লাহ তাআলার কি মরজী, দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে উনারা এলেন এবং এই তথাকথিত জমহুরের খেলাফ অনুষ্ঠানটাও হলো। উলামায়ে দেওবন্দের পক্ষ থেকে পাগড়িও বিতরণ করা হলো।

 

এই অনুষ্ঠানের সময় বা এর কিছু দিন আগে বা পরে আমার সঠিক সময় মনে নাই, তখন মাওলানা আজিজুল হক সাহেব বলেছিলেন, এর নাম হলো ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ। ও সবসময় মাসঊদ’ই। তার নাম ও নামের অর্থের সাথে খুব মিল। মাওলানা আজিজুল হক সাহেব তখন লালবাগ মাদরাসার শাইখুল হাদীস ছিলেন। আমার পরে বাংলাদেশে এমন অনুষ্ঠান আর কেউ করতে পারে নাই, আল্লাহ তাআলা আমাকে দিয়ে করিয়েছেন। আল্লাহ তাআলাই একমাত্র করনেওয়ালা জাত।

 

আমি সবসময় মজা করে তোমাদের বলি, আমি কোয়াটার মুফতি। কারণ আমি দারুল উলূম দেওবন্দে ইফতাতে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু পুরো বছর আর থাকি নাই, মাঝে চলে আসতে হয়েছিল, পরে আর যেতে পারিনি। কিন্তু আমার উস্তাদ আমার জায়গায় আর কাউকে নেন নাই, তিনি সারা বছর আমার জায়গাটা খালি রেখে দিয়েছিলেন। এই অপেক্ষায় একদিন ফরীদ আসবে। একদিন আসবে। এত মহব্বত করতেন আমাকে আসাতেজায়ে কেরাম। তো মুফতি তো আমি আর জিন্দেগীতে কোন দিন লেখি নাই কিন্তু রাবেতা আলম ইসলামী আমাকে এই উপাধি দিল ‘আল মুফতি আল আম মিম বাংলাদেশ’। তাদের দেয়া চিঠিতে এটা লেখা ছিল।

 

তো রাবেতা আলম আল ইসলামী আমাদের ভিএইপি মেহমানদারী করলো, সব জায়গায়ই এমন করে। এয়ারপোর্ট থেকে আমাকে নিয়ে গেল আলাদাভাবে। আমাকে আলাদাভাবে নিয়ে সেভেন স্টার হোটেলে রাখলো। তো দুনিয়ার যা বড়ত্ব, যা কিছু দেখানোর আল্লাহ তায়ালা দেখালেন। আমি চিন্তাও করি নাই যে আমি কাবা শরীফে ঢুকতে পারবো। সবই আল্লাহ তায়ালার রহমত।

 

প্রোগ্রামের মধ্যেও এই কথা লেখা নাই যে সেখানে ঢুকবো। তবে মনে মনে অনেক আশা ছিলো সবসময় আমার তাকদীরেও এমন কিছু হতে পারে কি না। তখন আমি মনকে কেবল সান্ত্বনা দিয়েছি। যে আল্লাহ তায়ালা হেকমত করেই বায়তুল্লাহ শরীফের একটু জায়গা ছেড়ে রাখছেন কুরাইশরা যখন বায়তুল্লাহ শরীফের সংস্কার করে তখন তারা নিজেদের সাথে প্রতিজ্ঞা করেছিলো, হালাল মাল দ্বারা তারা বায়তুল্লাহর সংস্কার করবে। আমাদের দেশে মসজিদেও আমরা তা করি না মুসলমান হবার পরেও। আর ওরা কাফেররা নিজেদের সাথে প্রতিজ্ঞা করলো বায়তুল্লাহর সংস্কারে হারাম মাল লাগাবো না। তো এরা যে সংস্কার করলো এখানে তাদের সে মাল দ্বারা পুরো বায়তুল্লাহর সংস্কার হলো না। কিছু জায়গা ছুটে গেল। সেটাকে আমরা হাতিম বলা হয়। সে জায়গাটা হযরত ইবরাহীম আ.-এর সময়ও বায়তুল্লাহ শরীফের ভেতরের অংশ ছিলো। তো এটা না হওয়াটা, চাইলে পরবর্তীতে মুসলমানরা করতে পারতো। কিন্তু এই না হওয়াটা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে একটি সিদ্ধান্ত।

 

আমার মনে হত আল্লাহ তায়ালার এই সিদ্ধান্তটা এই হেকমতের কারণে করেছেন যে, অনেক বান্দা আছেন যারা অনেক কান্নাকাটি করবে কাবা শরীফে ঢুকতে পারবে না। কিন্তু কাবা শরীফের ভেতরের যে ফজীলত এটা যেন সাধারণ মুসলমানরাও পায়। আল্লাহ তায়ালা হাতিম জায়গাটা আলাদা করে দিয়েছেন। হজে হাজীরা যখন যায় তখন ধাক্কাধাক্কি করে হলেও অনেকের দুই রাকাত নামাজ নসীব হয় এখানে। উলামায়ে কেরাম বলেন, এখন কেউ দুই রাকাত পড়লে সে কাবা শরীফের ভেতরে গিয়েই দু’রাকাআত পড়লো। তো মনে মনে সান্ত্বনা ছিলো যাইহোক কাবা শরীফের বর্তমান সীমানায় ঢুকতে না পারলেও হাতিমে তো নামাজ পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। এরপরও মনে হতো আচ্ছা যদি এখানেই ঢোকা যথেষ্ট হতো, তাহলো রাসূল সা.ভেতরে ঢুকলেন কেন! তাহলে বুঝা গেল হাতিমের পর কাবা শরীফের যে এলাকা ওটার মধ্যে ঢুকারও একটা আলাদা ফজীলত আছে।

 

একবার হযরত বেলাল রা. ঢুকলেন কোন সাহাবীই টের পেলেন না। উনি যখন বের হয়ে গেলেন তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. দৌড়ে তাকে ধরলেন ব্যাপারটা কী? কোথায় নামাজ পড়ছেন? বললেন, অমুক জায়গায় পড়ছেন। তো সে যাই হোক। হাতিম থাকা সত্বেও ভেতর ঢোকারও একটা ফজীলত আছে। কিন্তু আমার তো কোন পজিশন নাই, কোনকিছু নাই। তাই মাঝে মাঝে এ আশা উঁকি দিলেও তাকে জীবনের কিছু বানাইনি। এবার তো নাই। তো প্রথম দিন দ্বিতীয় বা তৃতীয় অধিবেশনে সুদাইসি সাহেব যিনি এখন হারমাইন শরীফের প্রধান ইমাম। তো উনি উনার বক্তৃতা দিলেন, শেষে যখন উনি নেমে যাবেন। তখন ভাবলাম উনার সঙ্গে মুসাফাহা করে নেই। এর আগে উনার সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয় নাই। তো তখনই রাবেতা আলম ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মাদ বিন আব্দুল করিম ঈসা তার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন। উনি সেখানে অনেক উঁচু মর্যাদা রাখেন। একজন মন্ত্রীর মর্যাদা রাখেন। তিনি আমার পরিচয় করাতে অনেক কিছু বলছেন, আমি এতটুকু মানুষ না যতটা উনি সুদাইসি সাহেবের কাছে বলেছেন তখন উনারা পরস্পরে আলাপ করলেন এবং আমাকে বললেন আজকে রাত এগারোটার সময় আপনি অমুক জায়গায় থাকবেন ইনশাআল্লাহ।

 

তো আমি তখনও একদম কি বলবো কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমি তারপর এসে চেয়ারে বসে পড়লাম । সেসময় তাদেরকে একটা শুকরিয়া জানাতেও ভুলে যাই। আর আল্লাহর কাছে বলতে লাগলাম, হতেও পারে নাও হতে পারে। তো দশটার আগেই আমি প্রস্তুতি নিলাম। আল্লাহর কাছে দোয়া করছিলাম যদি আল্লাহ সুযোগ দেন। আসলে আমি যদি অলস না হতাম তাহলে দুনিয়ার কেউ আমার সঙ্গে কুলাতে পারতো না। আল্লাহ তায়ালা আমাকে এতো সুযোগ দিয়েছেন। আমি সব নষ্ট করেছি আমার অলসতার কারণে। অলসতা আর গাফলত আমার উপর প্রবলভাবে গাফেল। আর গোসলের ব্যাপারে আরো বেশী অলস। পরে যখন হুঁশ হলো তখন ভাবলাম শুক্রবারের সুন্নতটাও অন্তত আদায় করা দরকার। তো এখন শুক্রবারের সুন্নাত আদায়ে আমি গোসল করি।

 

ওইদিন আমার মনে হলো গোসল করি। গোসল করলাম, নতুন জামা পড়লাম, আতর লাগালাম। হোটেলে দু’রাকাআত নামাজ পড়লাম। পরে যে জায়গার কথা তারা বলছিলো সেখানে এসে দেখি কেউ নেই। আমার সঙ্গে মাওলানা এমদাদ ছিলো, ওকে বললাম, কিরে উনারা কি আমাকে রেখেই চলে গেলেন নাকি। ওইদিকে সময় প্রায় হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কাউকে দেখা যাচ্ছিলো না। তো পরে যেখানে খাবারের ব্যবস্থা। আয় সুবহানাল্লাহ। সেখানে গিয়ে দেখি ষাট সত্তর পদের খাবার। যার যেটা ইচ্ছা খাও। সেখানে বসলাম। আমি ডাল ভাত ছাড়া আর কিছুই খাইনি। প্রত্যেকে নিজের পছন্দমতো খাবার নিয়ে আসতো। আমার খাবার মাওলানা ইমদাদ নিয়ে আসতো। তো যাইহোক খাবারের জায়গায় আসলাম, বললাম যা খেয়ে নেই। তো রাবেতার এক ডাইরেক্টর সে আমাকে বললো হুজুর আপনি কোথায় আপনাকে খুঁজতে খুঁজতে আমরা হয়রান। পরে আমাকে নিয়ে এক জায়গায় বসালেন। সেখানে দশ জনের মতো আছেন। চেচনিয়ার যে মুফতীয়ে আম, মিশরের এবং পাকিস্তানের যে ধর্মমন্ত্রী সেও আলেম, তবে বেদআতী। তো যাই হোক এমন দশ পনেরজন হবে। আমি ঠিক গুনি নাই।

 

তো এসময় ডক্টর সালেহ বিন হুমাইদ এলেন। উনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন। প্রবীণ খতীব সাহেব। এবং উনার বাবাও ছিলেন হাইয়াতে কিবারে উলামার চেয়ারম্যান। অনেক বড় আলেম ছিলেন। রাসূলের উপরে যে একটা কিতাব আছে “নাজরতুন নাইম” অনেক বড়। এটার মূল সম্পাদক উনি। উনার আরো অনেক কিতাব আছে। তো উনি এলেন আর তার সাথে এলেন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল কারীম ঈসা৷ সালেহ বিন হুমাইদও এলেন। উনারা দু’জনই কিন্তু ডক্টর। তো যাই হোক গাড়ীতে প্রটোকল দিয়ে আমাদের নিয়ে গেলেন। মোট পনের বিশ জন হবে আমি গুনিনি।

 

আমার মনে হয়েছে, পনের বিশ জনই হবে। তো প্রথমে রাস্তা বন্ধ করে আমাদের বাদশাহর প্রাসাদে নিয়ে গেলেন৷ যেটি মাতাফের পাশে। ওই যে হারাম শরীফের পাশে সায়ী করে সাফা মারওয়া সেখানে যে প্রাসাদ আছে সেই প্রাসাদে নিয়ে গেলেন। সেখানে কিছুক্ষণ থাকার পর সালেহ বিন হুমাইদের নেতৃত্বে আমরা আবার রওয়ানা হলাম। আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে আসলাম এবং আমাদের একটা জায়গায় বসানো হলো আর বলা হলো- এটা মসজিদের অংশ দুই রাকাত নামাজ পড়তে চাইলে এখানে আদায় করে নিন। ঘটনাচক্রে আমি আর সালেহ বিন হুমাইদ পুরোটা সময় একসঙ্গেই ছিলাম। এটা কি উনিই রাখলেন না আল্লাহর পক্ষ থেকে আল্লাহই ভালো জানেন। তো যাইহোক এখানে প্রায় আধাঘণ্টা থাকার পর আমাদের কর্ডন করে হাতিমের রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো এবং আমাদের জন্য আগে থেকেই সিঁড়ি দেয়া ছিলো আমরা সিঁড়ি দিয়ে গিয়ে উঠলাম। ওই সময়ও সালেহ বিন হুমাইদ আমার সঙ্গে ছিলেন।তখন আমি তাকে বললাম, সিঁড়ি দিয়ে উঠার আগে যে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে এভাবে আপনার সঙ্গে রেখেছেন, জান্নাতেও যেন আমাদের একসাথে এভাবে রাখেন। তো উনি খুব সুন্দর দোয়া করলেন যে মাওলানা, আপনাকে ও আমাকে আল্লাহ তায়ালা যেন রাসূল সা.এর সাথে রাখেন। আমার কাছে আজীব মনে হলো, বড় মানুষ দোয়াও বড়। আমি বললাম আপনার সাথে রাখুক। আর উনিও বললেন, কাল কেয়ামতের ময়দানে আমাকে এবং আপনাকে রাসূলের সাথে রাখুক।

 

তো দরজার মধ্যে দেখলাম ওই বংশের দুইজন প্রতিনিধি যাদের কাছে রাসূল সা. চাবি দিয়ে গিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন কেয়ামত পর্যন্ত তোমাদের কাছ থেকে কেউ চাবি নিবে না। একজন বায়তুল্লাহ শরীফের ভেতরে আরেকজন দরোজায়। তো দরোজায় যিনি উনি আমাদের ইস্তেকবাল জানালেন। আমি আসার সময় অবশ্য তাকে শুকরিয়া জানিয়ে এসেছি, ঢোকার সময় খেয়াল ছিলো না। তো যেভাবে রাসূল সা. ভেতরে প্রবেশ করে সরাসরি নামাজ পড়েছেন, আমিও কোনদিকে না তাকিয়ে সরাসরি গিয়ে রুকনে ইয়ামানীর সাইডে গিয়ে নামাজ পড়লাম। আর যারা যারা নামাজ পড়ার পড়লো এবং দোয়া করা শুরু করলো। তো আমার দোয়া তো খুব লম্বা হয়, জানো তোমরা। দোয়া করতে করতে সব শেষ হয়ে গেছে এখনও বলে না যাবার জন্য। তো সালেহ বিন হুমাইদ করলেন কি, একটি বিশেষ নির্ধারিত জায়গায় নামাজ আদায় করলেন। তো আমার তখন খেয়াল হলো, ওই জায়গাটা রাসূল যেখানে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়েছেন ওইটা। সালেহ বিন হুমাইদ উঠে গেলে আমি সেখানে গিয়ে আবার দু’রাকাআত নামাজ পড়লাম।

 

আল্লাহ তায়ালার মেহেরবানী দোয়ার মধ্যে আল্লাহ তায়ালা একেকজনের কথা মনে করিয়ে দিতে লাগলেন। আমাদের মসজিদের কথা মনে হলো, মুসল্লিদের কথা মনে হলো। মাদরাসার কথা মনে হলো এবং তোমাদের কথাও মনে হলো। আস্তে আস্তে সবার কথাই মনে হচ্ছিলো যেহেতু লম্বা দোয়া। আমার মনে হয় আধাঘন্টার উপরে প্রায় পৌনে একঘন্টার মতো সেখানে ছিলাম। কাবা শরীফের ভেতরটা ছায়া ছায়া অন্ধকার। খুব প্রবল কোন বাতি নেই। বাতি আছে তবে এতে একজন আরেকজনের চেহারা দেখা যায়। উপরে ভেতরে খুব সাদাসিধা। তবে পুরনো আমলের যে ঝার আছে তেমন আছে। আমাদের দেশে বিয়ের গেইটে এরকম কিছুর মত ব্যবহার করা হয়। তো এই ধরনের কিছু টানানো। আর আমি অনেকক্ষণ দোয়া করলাম। তো শেষে যখন বের হলাম, তখন বের হয়ে ওই বনু হাশেমের দুইজন যারা এখানে ছিলেন তাদের শুকরিয়া জানালাম এবং তাদের কাছে দোয়া চাইলাম৷ আমি বললাম, আপনারা তো সাহাবায়ে কেরামের সন্তান। উনারা বললেন হুম, আমরা হাশেমী। শুধু সাহাবায়ে রামের সন্তানই না৷ তো দোয়া চাইলাম। তারা খুব খুশি হলো পরে দেখি আমাদের জন্য হজরে আসওয়াদকেও চুমু খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

 

অনেকদিন হলো হজরে আসওয়াদকে ভালোভাবে চুমু খেতে পারি না। শরীরের জন্য এবার খুব আরামসে মন মতো চুমু খাইলাম। এসময় হাতিমে আবার শোকরানা দুইরাকাত নামাজ আদায় করলাম। আল্লাহ তায়ালা তার ঘরে নিলেন। তবে কাবা শরীফের ভেতরে আমি একটা জিনিস দেখেছিলাম কাঠির মতো, ওটা দিয়ে পরিষ্কার করা হয় বোধহয়। ওটা স্মৃতির জন্য নিয়ে এলাম। আর ওখানে আমাদের যিয়াফত হিসেবে যমযমের পানি দিলো ওটাও আমি না খেয়ে নিয়ে আসলাম এবং বাসায় বলেছি এটা কেয়ামত পর্যন্ত দিতে থাকবে। আর ওই জামা, পাজামা, টুপি গেঞ্জিকেও আলাদা করে রাখলাম। বললাম, এটা তুলে রাখ, এটা আর পরবো না। তো সবই আল্লাহর ফজল ও করম এদিকে শুনলাম কোন কোন আল্লাহর বান্দা আমাকে ফাঁসি দিতে চায় আর ওইদিকে আল্লাহ তায়ালা তার বান্দার এতমিনানের জন্য তার কাছে নিয়ে গেলেন।

 

এই যে ফাঁসির দাবি। শরীয়তে কিন্তু ফাঁসির দাবি জায়েজ নেই। আলেম উলামারা কথা বলে কিন্তু কোনটা হালাল, কোনটা হারাম কোনটা জায়েজ, কোনটা নাজায়েয এটার খেয়াল থাকে না। মানে বিদেশে একজন বড় আলেম আমাকে বললেন, তোমাদের বাংলাদেশে আলেমদের মধ্যে জাহেলিয়াতের গালাবা হয়ে গেছে৷ কারণ, শরীয়তে কোন মানুষ তো দূরের কথা কোন প্রাণীকেও শ্বাসরুদ্ধ করে মারা জায়েজ নেই৷ আর ফাঁসি তো গলায় শাসরোধ করে মারা। তাই শরয়ীভাবে কোন শাস্তি এভাবে নেই৷ আরে এটা তো বৃটিশের শাস্তি। হ্যাঁ! ওদের মনটা চাইছে ওরা মৃত্যুদণ্ড দাবি করতে পারতো কিন্তু একটা হারাম দাবী করছে। হালাল না হারাম এই চিন্তা যাদের নাই কি করে আলেম হবে তারা। আর এই যে পোস্টারিং করছে তারা। যদি পাঁচ টাকা করেও খরচ হয় কোন পোস্টারে তাহলে সারাদেশব্যাপী এই পোস্টারে কত লাখ, কোটি টাকা খরচ হয়েছে! এগুলো তারা অসুস্থ আহত ছাত্রদের চিকিৎসায় ব্যয় করতে পারতো। যেসমস্ত ছেলেরা হসপিটালে কাতরাচ্ছে তাদের পেছনে কি খরচ করা জরুরি ছিলো না! অথচ তাদের খোঁজ খবর নেয়ার কেউ নেই । আসলে এদের হাল ঠিক এরকম হইছে যে শাপলা চত্বরে যা হয়েছিলো। ভুলভাল বলে ছাত্রদের জমা করেছে, এরপর কঠিন হাল হবার পরে আর কারো কোন খোঁজ নেই। ওইটাকে সামনে নিয়া কোন কোন দুনিয়ালোভী চান্দার একটা সিস্টেম করেছে এ ঘটনাটাও তেমন। যাদেরকে মার খাইয়েছে আর যারা মারছে আর ছাত্রদের যে অবস্থা।

 

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com