সোমবার, ১২ এপ্রিল ২০২১, ১২:৫৩ পূর্বাহ্ন

দক্ষিণখানে আবারো হেফাযতীদের পরাজয়। লাঞ্চনা পিছু ছাড়ছেই না জুমহুরদের।

দক্ষিণখানে আবারো হেফাযতীদের পরাজয়। লাঞ্চনা পিছু ছাড়ছেই না জুমহুরদের।

৬ মে শাপলা চত্বরে হেফাযতীদের আত্মসমর্থনের ছবি। ফাইল ফটো

দক্ষিণখান প্রতিনিধি, ঢাকা। তাবলীগ নিউজ বিডি ডটকম| মূলধারাবিচ্যুত পাকিস্তানপন্থী হেফাযতীদের পরাজয় ও লাঞ্চনার তালিকা দিনদিন দীর্ঘায়িত হয়েই চলছে। এরই ধারাবাহিতায় আজ সকালে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ন দক্ষিণখান এলাকায় ঘটে গেলো আরেক লজ্জাজনক ইতিহাস। আজ ২৩ ডিসেম্বর রবিবার দক্ষিণখান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে জিম্মি করে তাবলীগ বিষয়ক দাবী আদায়ে ব্যর্থ হয়ে আবার চরম অপমান ও জনরোষে পড়েছেন হেফাযতপন্থী জমহুর আলেমরা।

উল্লেখ্য যে, গত ১৭/১২/২০১৮ তারিখ সোমবার দক্ষিণখান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জনাব এস.এম. তোফাজ্জল হোসাইনের নিকট স্থানীয় আলেমদের একটি প্রতিনিধি দল দেখা করতে যায়। সেখানে গদবাঁধা কিছু বিভ্রান্তিমূলক কথা বলে চেয়ারম্যানকে মূলধারার তাবলীগের সাথীদের উপর ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা করে প্রতিনিধি দলের আলেমগণ। দীর্ঘ আলাপচারিতার একপর্যায়ে দক্ষিণখান ইউনিয়নের কোন মসজিদে যেন মূলধারার সাথীরা কোন কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারে সেই মর্মে চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে একটি নোটিশও আদায় করা হয়। তাতে লেখা রয়েছেঃ

দক্ষিণখান আদর্শ ইউনিয়ন পরিষদ এর অন্তর্গত সকল মসজিদের দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনত ও কাজ আহলে হক ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। এছাড়া দাওয়াত ও তাবলীগের এই মেহনত ও কাজ সাদ সাহেবের অনুসারীদের তত্ত্বাবধানে দক্ষিণখান আদর্শ ইউনিয়নের কোন মসজিদে পরিচালিত হবে না।

চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত সেই নোটিশটি নিম্নে প্রদত্ত হলো

উক্ত নোটিশটি ছড়িয়ে পড়লে গত ২০/১২/২০১৮ তারিখ বৃহঃবার তাবলীগের মূলধারার সাথীরা চেয়ারম্যানের সাথে সাক্ষাৎ করতে যান। প্রথমে চেয়ারম্যান কথাই বলতে রাজী হয় নি। আলাপচারিতার এক সুযোগে চেয়ারম্যানের সামনে গত ১৮/০৯/২০১৮ তারিখে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ইস্যুকৃত ‘পরিপত্র’টি পেশ করলে তিনি আশ্চর্যান্বিত হয়ে পড়েন। পরিপত্রটি পড়ে কিছুটা নমনীয় হওয়ার পর তার সামনে পেশ করা হয় ০৫/১১/২০১৮ তারিখে ‘তাবলীগ জামাত বাংলাদেশ’এর অফিসিয়াল প্যাডে মূলধারার শূরা মাওলানা মোশাররফ সাহেবের স্বাক্ষরিত একটি চিঠি। উক্ত পরিপত্র ও চিঠিটি পড়ে চেয়ারম্যান দ্রুত মত পরিবর্তন করে পূর্বের ভ্রান্ত ধারণা ও কঠোর অবস্থান থেকে ফিরে আসেন। সাথে সাথে তার স্বাক্ষরিত নোটিশটি স্থগিত ঘোষণা করে নতুন আরেকটি নোটিশ ইস্যু করেন। সেই নতুন নোটিশটিতে বলা হয়েছেঃ

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রনালয় কর্তৃক ১৮/০৯/২০১৮ইং তারিখের পত্র নং ১৬.০০.০০০০.০০৮.১১.০২৩.১৩.১৩৯৩ইং এর মাধ্যমে বাংলাদেশ দাওয়াতে তাবলিগের কার্যক্রম সুষ্ঠ, সুন্দর ও সুশৃঙ্খলরুপে পরিচালনার জন্য ঘোষিত নির্দেশনা মোতাবেক সকল মসজিদে তাবলিগের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এমতাবস্থায় দক্ষিণখান আদর্শ ইউনিয়ন পরিষদ কতৃক ১৭/১২/২০১৮ইং তারিখে প্রদানকৃত উপরোক্ত নির্দেশনাটি স্থগিত করা হলো।

পাঠকের সামনে নতুন নোটিশটি পেশ করা হলো

দ্বিতীয় নোটিশটি বৃহঃবার প্রকাশিত হলেও মূলধারার সাথীরা অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি এড়াতে পাল্টাপাল্টি অবস্থানে না গিয়ে নোটিশটি নিজেদের কাছেই রেখে দেন। পরদিন শুক্রবার জুমুআর বয়ানে দক্ষিণখান ইউনিয়নের প্রতিটি মসজিদের খতীব প্রথম নোটিশটি মুসল্লীদের মাঝে পড়ে শোনান এবং চরম উষ্কানীর সাথে ঘোষণা করেন যে, চেয়ারম্যানের এই ঘোষণা মোতাবেক দক্ষিণখান ইউনিয়নের কোন মসজিদেই মুলধারার সাথীরা কোন কাজ করতে পারবে না। যদি মূলধারার কোন সাথীদেরকে মসজিদে আমল করতে দেখা যায় তাহলে তাদেরকে বের করে দিতে হবে। বের হতে না চাইলে চেয়ারম্যানের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। জুম্মার পরপরই মুসল্লীদের মাঝে ব্যপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তখন মূলধারার সাথীরা বাধ্য হয়েই দ্বিতীয় নোটিশটি মুসল্লীদের সামনে তুলে ধরেন। তখন চরম বিপাকে পড়তে হয় উষ্কানীদাতা খতীবদের। উপায়ান্ত না দেখে দক্ষিণখান ইউনিয়নের দেড় শতাধিক মসজিদের খতীব ও সাতটি দাওরা-হাদীসসহ অর্ধশতাধিক মাদরাসার শিক্ষকরা পরদিন শনিবার আবারো চেয়ারম্যানের কাছে যান। এবার চেয়ারম্যান তাদের কথায় সাঁই না দিয়ে সাফ জানিয়ে দিয়েছে “আপনাদের আলেমদের কথা আমরা শুনেছি। কিন্তু তাদের কোন আলেমের সাথে আমাদের এখনো কথা হয় নাই। একপক্ষের কথায় আমি কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারবো না। আপনারা দুই পক্ষের আলেমরা চেয়ারম্যান কার্যালয়ে আসুন। আমি উভয়পক্ষের সাথে কথা বলে নতুন সিদ্ধান্ত নিবো।” চেয়ারম্যান সাহেবের সেই আহ্বান অনুযায়ী আজ সকাল দশটায় দক্ষিণখান ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়ে হেফাযতপন্থী শতাধিক আলেম উপস্থিত হোন। পক্ষান্তরে মূলধারার পক্ষে উপস্থিত হোন মাত্র ৫ জন আলেম। কিছুক্ষণ পর চেয়ারম্যান সাহেব উপস্থিত হয়ে হাত জোর করে বলতে থাকেনঃ

আমি মাফ চাই। আপনাদের সাথে এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে করতে তিক্ততায় পৌছে গেছি। আমার ব্যক্তিগত সকল সিদ্ধান্ত স্থগিত ঘোষণা করে দিলাম। আমার এই ইউনিয়নের সকল মসজিদে আপনারা সারাদেশের মত উভয়পক্ষ মিলেমিশে কাজ করবেন। কেউ কাউকে কোন বাঁধা দিতে পারবে না। আজকের বৈঠক এ পর্যন্তই।

বৈঠক সমাপ্তির ঘোষণার সাথে সাথে মূলধারার উলামায়ে কেরাম ও সাধারণ সাথীরা সেখান থেকে চলে আসলেও স্থানীয় ইমাম-খতীব ও মাদরাসার শিক্ষকরা চরম হট্টগোল শুরু করে দেন। তারা চেয়ারম্যানের উপর চাঁপ সৃষ্টি করতে থাকেন যেন, এই ইউনিয়নে কোন মুলধারার সাথী আমল করতে না পারে এই মর্মে নতুন ঘোষণা দেওয়া হোক। দুপুর ১টা পর্যন্ত চেয়ারম্যান সাহেবকে তার কার্যালয়ে জিম্মী করে তাদের দাবী আদায়ে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে থাকেন হেফাযতী উলামায়ে কেরাম। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যান্ত তারা নিজেদের স্বপক্ষে কোন দাবী আদায়ে সক্ষম হয় নি।

একজন জনপ্রতিনিধিকে এভাবে চাঁপ সৃষ্টি করে দাবী আদায়ের অপচেষ্টাকে ভালোভাবে দেখছেন না স্থানীয় জনগণ। তাদের আশঙ্কা, সাধারণ মুসল্লীদের পর এবার স্বয়ং চেয়ারম্যানকেই এভাবে ক্ষেপিয়ে তোলাটা চরম অপরিণামদর্শিতার কাজ হয়েছে। এভাবে ধীরে ধীরে যদি সমাজের সর্বশ্রেণীকে হেফাযতী আলেমরা ক্ষেপিয়ে তোলেন তাহলে এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়ানক হবে বলে তাদের আশঙ্কা।

বিষয়টি নিয়ে মূলধারার আলেমদের আজকের প্রতিনিধি দলের সদস্য মাওলানা মু’আয বিন নূরের সাথে কথা বললে তিনি জানানঃ

এটার নামই তো ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, লোকবল ও পেশীশক্তিসহ সব ক্ষমতাই তাদের পক্ষে থাকার পরও সিদ্ধান্ত সবসময় আমাদের পক্ষেই হয়েছে। এটাই দাওয়াত ও তাবলীগের কারামত। এটার নিগুঢ় রহস্যটা হলো, তাবলীগের সাথীরা যেকোন বড় কাজের আগে আল্লাহ তা’আলার সাথে ‘রেডফোনে’ যোগাযোগ করে তারপরই অগ্রসর হয়। পক্ষান্তরে ‘অন্যরা’ জনবল আর গলাবাজি দিয়েই সব আদায় করে নিতে চায়। অথচ আল্লাহ তা’আলা কুরআনের একাধিক আয়াতে বর্ণনা করেছেন “ওয়াল ‘আক্বিবাতু লিল মুত্তাক্বীন’। অর্থাৎ শুভপরিণাম একমাত্র প্রকৃত আল্লাহভীরুদের জন্যই নির্ধারিত।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথা হলো, আল্লাহর মদদ যাদের উপর থেকে হটে যায় তারা সর্বশক্তি দিয়েও এগুতে পারে না। দুই পা আগালে ছয় পা পেছাতে হয়। জালেম সর্বদা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত। সুরা বাকারার ১১৪ নং আয়াত অনুযায়ী মসজিদে বাঁধা দানকারী এই জুমহুর হযরতগণ সবচে’ বড় জালিম হিসেবে প্রমাণিত হওয়ায় আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত। এটা বুঝার মত দূরদর্শিতা আমাদের জুমহুর হযরতদের নেই বলে মনে হচ্ছে। নতুবা তারা যদি ‘আহলে কাশফ’ হতেন তাহলে এই সাধারণ বিষয়টি বুঝতে এত কাঠখড় পুড়াতে হতো না।

‘মালাকুল মাউত’ নাকি পায়ের বৃদ্ধাঙ্গলি থেকে রূহ কবয করা শুরু করে। সারাদেহ থেকে রূহ সংকোচিত হয়ে অবশেষে ক্বলবে গিয়ে লুকায়। আর সেখান থেকেই টেনে রূহকে বাহির করা হয়। রূহ বাহির হওয়ার পরও শরীরের কিছুকিছু অঙ্গ অল্প সময় সতেজ থাকে। যেমন, চোখ ৩১ মিনিট, হার্ট ১০ মিনিট, ব্রেন ১০ মিনিট, পা ৪ ঘণ্টা, চামড়া ৫ দিন, হাঁড় ৩০ দিন, ইত্যাদী। ঠিক এমনটিই আমরা দেখছি, গত জানুয়ারী ২০১৮ থেকে এযাবত পর্যন্ত কয়েকবার ঘোষণা করা হয়েছে যে, “নিযামুদ্দীনের অনুসারী মূলধারার সাথীদেরকে কোন মসজিদে আসতে দেওয়া যাবে না। নিজ নিজ মহল্লার মসজিদেও আমল করতে পারবে না। তারা নিযামুদ্দীনে যেতেও পারবে না। নিযামুদ্দীনের জামাতও আমাদের দেশে আসতে পারবে না।” এসব ঘোষণার পরও আজ পুরো বাংলাদেশের কোথাও এগুলো কার্যকর হয় নি। বরং ধীরে ধীরে সারা বাংলাদেশ থেকে এই সকল জুমহুর হযরতদের রূহ সংকোচিত হতে হতে ‘টঙ্গীর ময়দান’এ এসে লুকিয়েছিলো। সেখান থেকেও বিগত ১লা ডিসেম্বর রূহ বাহির হয়ে যাওয়ার পর সতেজ অঙ্গগুলোর মত কিছু এলাকাও সতেজ রয়ে গিয়েছিলো। সেগুলোর নিস্তেজ হওয়ার আলামতস্বরূপ আজকের ঘটনাটি ঘটেছে বলে আমি মনে করি।

সর্বসাধারণের বিষ্ময়ভরা প্রশ্ন হলো, মুমিন তো কাউকে ধোঁকা দেয় না এবং নিজেও ধোঁকা খায় না। কিন্তু আমাদের হুজুররা বারবার সবজায়গায় খালি ঠকে কেন? কাদিয়ানী বিরোধী আন্দোলন, জামাত বিরোধী আন্দোলন, নাস্তিক-মুরতাদ বিরোধী আন্দোলন, আহলে হাদীস বিরোধী আন্দোলন, মাজার বিরোধী আন্দোলনসহ কোন আন্দোলনেই হুজুররা সফল হয় নাই। কোন কোন ইস্যুতে সাময়িক বিজয় লাভ করলেও পরে দেখা গেছে যে, ঐটা ছিলো একটা ‘মুলা’। অতএব, আমরা নিশ্চিত, বাতিলের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার পরও যারা সফল হয় নাই তারা হক্বের বিরুদ্ধে যতই লাফালাফি করুক, কখনোই সফল হতে পারবে না। বরং আরেকটি বুখারা-সমরকন্দ ঘটিয়ে হয়তো এই দেশের জনসাধারণের ঈমান-ইসলামের বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com