শনিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২১, ০৬:১৩ পূর্বাহ্ন

বিএনপি জোটের সামনের দিনগুলো হবে আরও বিবর্ণ

বিএনপি জোটের সামনের দিনগুলো হবে আরও বিবর্ণ

জাহিদ রহমান, অতিথি লেখক; তাবলীগ নিউজ বিডি ডটকম| আজ রোববার ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনের সৌন্দর্য- দেশের সব রাজনৈতিক দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ।

৯০ এর অভ্যুত্থানের পর দলীয় সরকারের অধীনে কোনো জাতীয় নির্বাচনে এই প্রথম সব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। এ কারণেই অংশগ্রহণ মূলক নির্বাচনের একটি আমেজ-উৎসব তৈরি হয়েছে সর্বত্র। এই নির্বাচন নিয়ে বাড়তি আগ্রহ ও কৌতূহলও বিরাজ করছে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার গঠিত হওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হলে দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপিসহ অন্যান্যরা দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা দেয়। এমন প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে দারুণ টানাপড়েন শুরু হয়। নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্যে দিয়ে সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার এবং তাদের মিত্রদের অংশগ্রহণে নবম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট থেকে ১৫৩ জন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করে।

২০১৪ সালের বিতর্কিত এই নির্বাচনে মোট নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি এবং তাদের মিত্র জাসদ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পাটিসহ মাত্র ১৭টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছিল। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট এই নির্বাচন বর্জন করেছিল। একইভাবে বাংলাদেশের বাম রাজনৈতিক দলগুলোও এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল
(বাসদ)সহ ছোট ছোট আরও অনেক বাম ও ইসলামিক রাজনৈতিক দল এই নির্বাচন বর্জন করে।

২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার ক্ষমতায় এসে ৩০ জুন ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। ঐদিন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাশ করার মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়। এরপর পরই বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে এবং দলীয় সরকারের অধীনে কেউ নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে ঘোষণা দেয়।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে আওয়ামী লীগ তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হয় এ বছরের অক্টোবরে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে চরম সহিংস অবস্থা তৈরি হয়। নির্বাচন বর্জন ও প্রতিরোধের ঘোষণা দেয় বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী। এই পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকশত সাধারণ মানুষের মৃত্যু ঘটে। আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় অসংখ্যজনকে। সারাদেশে সরকারি ও বেসরকারি প্রচুর সম্পদহানির ঘটনাও ঘটে।

সব বাধা অতিক্রম করে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে আওয়ামী লীগ তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে। দশম সংসদের এই সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রাক্কালেই পরবর্তী নির্বাচন যাতে পক্ষপাতমূলক হয় সে বিষয়ে বিরোধীদল জোর চাপ দিতে থাকে।

এই ধারাবাহিকতায় গত বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ কর্তৃক সাবেক সচিব কে এম নুরুল হুদা প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। বাকি সদস্য হিসেবে নিয়োগ পান মাহবুব তালুকদার, রফিকুল ইসলাম, বেগম কবিতা খানম ও শাহাদত হোসেন চৌধুরী। সার্চ কমিটির প্রস্তাবিত ১০টি নাম থেকেই রাষ্ট্রপতি এই পাঁচ জনকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। নিয়োগপ্রাপ্তির পর সিইসির পক্ষ থেকে একটি নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই রোডম্যাপকে ধরেই নির্বাচন কমিশন তার কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। সেই ধারাবাহিকতায় কাল ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর এ পর্যন্ত মোট ৫বার জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনের সবাইকে অবাক করে দিয়ে জয়লাভ করে বিএনপি। সবার ধারণা ছিল এই নির্বাচনে জনগণের বিপুল ম্যানডেট নিয়ে জয়লাভ করবে বিএনপি। কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা যায়, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি এককভাবে ১৪০টি আসনে জয়ী হয়েছে। এই জয়ের মধ্যে দিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। এই নির্বাচনে ৮৮টি আসন লাভ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

এরপর ৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপি দলীয় সরকারের অধীনে ষষ্ঠ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এই কথিত নির্বাচন প্রায় সব দলই বর্জন করে। এই নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করলেও সরকারের স্থায়িত্ব হয়মাত্র চারমাস। আওয়ামী লীগের ব্যাপক আন্দোলনের কারণে বিএনপি ফের তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল করে পুনরায় দলনিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ উন্মুক্ত করে। ৯৬ সালের ৬ জুন অনুষ্ঠিত হয় ৭ম জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬াট আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এরপর শেখ হাসিনা নেতৃত্বে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। এই নির্বাচনে বিএনপি মোট ১১৬টি আসনে জয়লাভ করে।

এরপর ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে প্রত্যাশার চেয়েও অনেক আসন পায় আওয়ামী লীগ। মাত্র ৬২ আসনে জয়লাভ করে তারা। অন্যদিকে বিএনপি ১৯৩টি আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠনে সমর্থ হয়। অষ্টম সংসদের মেয়াদ নির্ধারিত তারিখে শেষ হওয়ার পর আসে সেনা সমর্থিত সরকার। দুই বছর পর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট দারুণ ফলাফল করে। ২৩০টি জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে মাত্র ৩০টি আসনে লাভ করে বিএনপি।

আগামীকাল ক্ষমতাসীন সরকার আওয়ামী লীগ একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হওয়ার ব্যাপারে জোর আশাবাদ ব্যক্ত করছে। অন্যদিকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট শুরু থেকেই নানা অভিযোগ উত্থাপন করে আসছে। তারা বলছে প্রচারণা থেকে শুরু করে সব জায়গাতেই সরকার পক্ষ বাধা দিয়েছে। তারা নির্বিঘ্নে প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারেনি। সভা, পথসভা করতে পারেনি। এমন কী তারা পোস্টার পর্যন্ত টানাতে পারেনি। এছাড়া দেশের সব জায়গাতেই নেতা কর্মীদের নামে কম বেশি মামলা দেওয়া হয়েছে। হয়রানি করা হয়েছে। এরকম একটি চরম প্রতিকূল পরিবেশে তাদের নির্বাচন করতে হচ্ছে। বিএনপির এই অভিযোগ যেমন সত্য তেমনি এও সত্য পুরো নির্বাচনে বিএনপির সাংগঠনিক দৈন্যতা আবারও খুব ভালোভাবেই ফুটে উঠেছে। সাংগঠনিকভাবে যে বিএনপি খুবই দুর্বল-এটি সন্দেহাতীত প্রমাণিত হয়েছে।

বিএনপি তাই কোথাও দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে সরকারি দলের উপর কোনো ধরনের চাপ তৈরি করতে পারেনি। আর সেটা পারেনি বলেই বিএনপি অনেকটা নিজে নিজেই মাঠ ছাড়া হয়েছে। ড. কামাল হোসেন, আসম আব্দুর রব, কাদের সিদ্দিকীর মতো নেতা কাছে পাওয়ার পরও রাজনীতির মাঠে বিএনপি ফুঁসে উঠতে পারেনি। মাঠ দখলের লড়াই-এ বিএনপির পারফরমেন্স ‘জিরো’ বললে ভুল হবে না।

সংগঠিতভাবে বিএনপির মাঠে না থাকার অনেক কারণ আছে। এর মধ্যে অন্যতম কারণ মাঠ পর্যায়ে আন্দোলন সংগ্রামের বদলে বিএনপির বড় অংশ আগে থেকেই ক্ষমতাসীন দলের সাথে সমঝোতা ও সন্ধি করা। এতে করে বিএনপির নতুন অন্য কেউই আর আগ বাড়িয়ে ঝুঁকি নিয়ে কিছু করতে চায়নি। দ্বিতীয়ত হলো-জামায়াতকে আবারো সহযোদ্ধা হিসেবে নেওয়া যা তরুণ প্রজন্মের কাছে সবচেয়ে অগ্রহণযোগ্য বলে গণ্য হয়েছে।

আর এই সুযোগগুলোই ভালোভাবে নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জোট। বিএনপির ভোটার থাকলেও রাজনীতির মাঠ দখল ও প্রতিবাদ করার নেতা-কর্মী নেই বললেই চলে। ক্ষমতার বাইরে থেকে রাজনীতি করা কত কষ্ট তা বিএনপি আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। ফলে আজ সহজে ৩০ ডিসেম্বর ‘ভোটবিপ্লব’ হয়েছে।

বর্তমান আওয়ামী লীগের সাথে খেলা চাট্টি কথা নয়। আওয়ামী লীগের সাথে খেলতে গেলে নিজস্ব ডিফেন্স অফেন্স খুব ভাল হতে হয়। বয়স উত্তীর্ণ খেলোয়াড় হায়ার করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জেতা দুরূহ কাজ।নির্বাচনে তাই বিএনপির পরাজয় ছিল যেমন বাস্তব নির্ভর , তেমনি সামনের দিনগুলো হবে বিএনপি জোটের জন্য আরও বিবর্ণ ও ক্লান্তিকর।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com