শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১, ০২:১৯ অপরাহ্ন

আপনি কেন মাওলানা সাদ কান্ধলভির বিরুদ্ধে কথা বলা থেকে বিরত থাকবেন?

আপনি কেন মাওলানা সাদ কান্ধলভির বিরুদ্ধে কথা বলা থেকে বিরত থাকবেন?

সৈয়দ মবনু

তাবলিগকে সমর্থন বা পছন্দ করি, তবে এর সাথে সরাসরি যুক্ত নয় প্রায় বিশ-পঁচিশ বছর হলো। মাওলানা সাদ কান্ধলভি নামের সাথে আমার কিছুদিন আগেও কোন পরিচয় ছিলো না। হঠাৎ দেখলাম ফেসবুক এবং এর আশপাশ গরম হয়ে উঠলো মাওলানা সাদকে বিভিন্ন ভাবে গালিগালাজ করে। আমি প্রথম দিকে কোন গুরুত্বই দিলাম না। কারণ, এসব আমাদের সমাজে প্রতিদিনের ঘটনা। যতদিন যেতে থাকে ততই গালাগালিটা নিকৃস্ট মাত্রায় পৌঁছে। আমি গালাগালির ধরণ দেখে ভাবতেও পারিনি এগুলো কোন আলেমদের কাজ। কিছুদিনের মধ্যে তথ্য নিয়ে জানতে পারলাম মাওলানা সাদ হলেন তাবলিগের বিশ্ব আমির। প্রথম দিকে ভেবেছিলাম মাওলানা সাদের বিরুদ্ধে তাবলিগ বিরোধী গ্রুপের গালাগালি চলছে। পরে আরও কিছুদিন যাওয়ার পর জানতে পারলাম তাবলিগের সমর্থক কিছু আলেমের সাথে মতানৈক্য থেকে একদল আলেম মাঠে জিহাদ ঘোষণা করেছেন মাওলানা সাদের বিরুদ্ধে। বিষয়টি শুধু বাংলাদেশে নয়। গোটা বিশ্বের সমস্যা। একেকদিক থেকে একেকজন একেকভাবে এখানে রসদ বা ইন্ধন দিচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে আমি আরও তথ্য নিতে থাকি। দেখি মাওলানা সাদ সম্পর্কে একদল হিংসাত্মক হীনমন্য মিথ্যাচার শুরু করেছেন। ইংল্যান্ড যাওয়ার পর যখন জানতে পারলাম ফাজায়েলে আমলের লেখক শায়খুল হাদিস মাওলানা জাকারিয়া (র.)-এর খলিফা ইংল্যান্ডের বেরি মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম হাজার হাজার আলেমদের উস্তাদ ও পির আল্লামা ইউসুফ মোতালা মাওলানা সাদের পক্ষে বিভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছেন তখন আমার টনক নড়ে ওঠে। এরপর আমি আরও তথ্য নিতে শুরু করি। আমার সংগ্রহিত তথ্য থেকে যা বেরিয়ে আসে তা নিয়ে একটি লেখা তৈরি করে আমার ফেসবুক ওয়ালে ‘ তাবলিগ জামায়াতে মূল সমস্যাটা কি?’ শীর্ষক শিরোনামে পোষ্ট দিয়েছিলাম। অনেকই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠলেন। কেউ কেউ বললেন আমি জমহুর উলামাদের বিরুদ্ধে কথা বলছি। আমার তাদের কাছে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, পৃথিবীতে আলেমের সংখ্যা কত এবং তারা কতজনকে হিসাবে নিয়ে জমহুর শব্দ ব্যবহার করছেন? তাদের এই জমহুর সেই ঘটনার মতো নয় তো যে, একজন ছাত্রকে জিজ্ঞাস করা হলো বাবা তুমি ক্লাসে কত নম্বার? সে বললো তিন। আবার প্রশ্ন করা হলো, বাবা তোমাদের ক্লাসে ছাত্র কতজন? সে উত্তর দিলো তিন। অর্থাৎ ছাত্র তিনজন, সেও তিন নম্বার। কিংবা এই জমহুর সেই বিশাল জনসভার মতো নয় তো যেখানে মাত্র পঞ্চাশজন শ্রোতা উপস্থিত?
অনেকে নিজের জানা পৃথিবীকেই গোটা পৃথিবী মনে করেন। খতিব মাওলানা উবায়দুল হক (র.) একবার এক মাদরাসার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশে কিছু মৌলবী আছেন যারা কুনেব্যাঙের মতো চৌকির নীচকে বিশাল আকাশ ভেবে ফতোয়াবাজি করেন। তোমরা এগুলো থেকে নিজকে বাঁচিয়ে মনকে বড় করবে।’ আজ এই কথা খুব মনে উঠছে। আসলেই আমাদের মধ্যে বড় মনের খুব অভাব।
যারা জমহুর উলামার দাবী করছেন তারা কি জানেন যে, পৃথিবীর জমহুর উলামার হিসাব বাদ দিয়েও যদি শুধু ভারতবর্ষের জমহুরের হিসাব করা হয় তবু মাওলানা সাদ-এর পরিবার এবং আত্মীয়দেরকে বাদ দিয়ে জমহুর বলা বড়ই কঠিন। এই পরিবারের ইলমি এবং দাওয়াতি কাজের ঐতিহ্য কয়েক শ বছরের। মাওলানা সাদ হলেন তাবলিগের প্রতিষ্ঠাতা হযরতজি ইলিয়াস (র.) প্রপৌত্র, মাওলানা ইউসুফ কান্ধালভীর নাতি, শায়খুল হাদিস আল্লামা জাকারিয়া (র.)-এর মেয়ের ঘরের নাতি। হযরতজিএনামুল হাসান (র.)-এর ভাগনে। শাহরানপুর মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা সালমান সাহেবের জামাতা।
আমাদের যারা মাওলানা সাদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছেন তাদের স্মরণ রাখতে হবে মাওলানা সাদ হলেন ওলি ইবনে ওলি। তাঁর বংশের অধিকাংশই দ্বীনের পথে জান কোরবানকারি। তারা দ্বীনের জন্য ত্যাগ স্বীকার করে আসছেন ইসলামের প্রথম যুগ থেকে। মাওলানা সাদ ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রা.)এর বংশের লোক। হয়তো কেউ কেউ বলবেন নেতৃত্ব বংশগত নয়, যোগ্যতাগত। আমি বলবো যোগ্যতা অর্জনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম পরিবার, তাই এখানে বংশের গুরুত্ব অনেক। নেতৃত্বের জন্য অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মানুষ তার জীবনের বেশিরভাগ অভিজ্ঞতা অর্জন করে নিজ পরিবার থেকে। এখানেও বংশগত একটি বিষয় রয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে বেশিরভাগ সফল নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বংশগত। অতপর কিছু নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে সেই ধারাবাহিক নেতৃত্বের সংস্পর্শে এবং কঠিন সাধনার মাধ্যমে। সংস্পর্শ ও সাধনায় প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব থেকে আবার কিছুদিন নেতৃত্ব চলে বংশগত। পৃথিবীর আদি থেকে এই পর্যন্ত ইতিহাস তাই বলে। তাই আমি মাওলানা সাদকে বংশগত কারণেও গুরুত্ব্ দিচ্ছি।
প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার পাশাপাশি মাওলানা সাদ কান্ধলভি দু’জন মহান ব্যক্তিত্বের কাছে আধ্যাত্মিক সাধনা করেন। তারা হলেন, সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদভি (র.) ও মুফতি ইফতিখারুল হাসান কান্ধলভি। মুফতি ইফতিখারুল হাসান কান্ধলভিকে আমি জানি না। তবে সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদভি (র.)- কে ভাল করেই জানি। এমন এক মহান ব্যক্তির খলিফা এখানে একই একশ। আমি যখন জানলাম, মাওলানা সাদ সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদভি (র.)-এর খলিফা তখনই আমার মন তাঁর পক্ষে এমনি চলে যায়। এমন ব্যক্তির খলিফা মোটেও ছোটকথা নয়। এখানে বংশ নয়, সাধনার ব্যাপার। মাওলানা সাদ যে একজন সাধক তা বুঝতে আর বাকি থাকলো না। সাধকরা অন্যদের থেকে ভুল কম করে। তবে অনেক মানুষ ভুলের উপর দাঁড়িয়ে সাধকদের কথা অনুভব করতে না পেরে ভুল ব্যাখ্যা করে।
এখন প্রশ্ন হলো আপনি কেন মাওলানা সাদ-এর বিরুদ্ধে অপপ্রচার থেকে বিরত থাকবেন? কারণ একটাই, তিনি নিজে একজন সাধক ওলি এবং দ্বীনের নিবেদিত মুবাল্লিগ আর তাঁর পূর্ব পুরুষে অসংখ্য সাধক ওলির জন্ম হয়েছে। ।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com