শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১, ০২:১৮ অপরাহ্ন

বি বাড়িয়া মাকার্জে হামলা, আসলে সেখানে কি ঘটেছিল সেদিন

বি বাড়িয়া মাকার্জে হামলা, আসলে সেখানে কি ঘটেছিল সেদিন

শামীম হামিদীঃ
কথা ছিল আজ কক্সবাজার ইজতেমার উপরে লিখব। কক্সবাজার ইজতেমার খুব চমৎকার কারগুজারী আছে, আলহামদুলিল্লাহ। তাছাড়া কক্সবাজার ইজতেমা বন্ধ করতে গিয়ে আমাদের আলমি শূরার বুযুর্গ সমর্থকগণ যে সব শিশু সুলভ হাস্যকর কাণ্ডকারখানা করেছেন তা সবার সামনে আসা জরুরী মনে করেই লিখছিলাম। ইতিমধ্যেই তিন পর্ব প্রকাশিত হয়েছে। আর হয়ত দুই/তিন পর্ব লাগতে পারে। কিন্তু গত ৯ নভেম্বর শুক্রবার তারিখে বি বাড়িয়ায় ঘটে যাওয়া দুঃখজনক ঘটনার প্রেক্ষিতে একটি ছোট বিরতি টেনে বি বাড়িয়ার দিকে নজর দিতে হচ্ছে।

দাওয়াতের মেহনতের শক্তি আমাদের বুযুর্গ আলমী হযরতগণ বুঝতে পারেন নি। শুরু থেকেই যে সব পথে হেঁটেছেন তাতেই কেল্লা ফতে হবে বলে ধারণা করেছিলেন। নিজেদের সমস্যা নিজেরা সমাধানের বদলে তাঁরা বাহিরের কিছু আলেমদের শরণাপন্ন হয়েছেন। আর অবাক করার ব্যাপার হল রাজনৈতিক আলেমদের শরণাপন্ন হয়েছেন। ভেবেছিলেন নিজামুদ্দিনের হযরতদের আসতে না দিলে এক সময়ে মানুষ আস্তে আস্তে তাঁদের ভুলে যাবে। এবং তাঁরাই (আলমী বুযুর্গগণ) হবেন এদেশের তাবলীগের হর্তাকর্তা।

তাবলীগের এই মহান মেহনতকে হঠাৎ করে তাঁরা দুনিয়াবী নজরে কেন দেখা শুরু করলেন বুঝলাম না। নিজামুদ্দিনের হযরতদের বিপরীতে এদেশের উলামাকেরামদের নামে ব্ল্যাকমেইলিং করতে চেয়েছেন। তাই প্রচুর মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিয়ে উলামাকেরামদের ভুল বুঝিয়েছেন। এভাবে তাঁদের নিজেদের কথাগুলিই উলামা কেরামদের জবান থেকে বলিয়েছেন। কিন্তু সবকিছুই বেকার গেছে। মূলধারার সাথীরা, যারা দীর্ঘদিন এদেশে জান মাল নিয়ে মেহনত করে আসছেন তাঁরা এসবে টলেন নি।

পরবর্তীতে তাঁরা শুরু করেন বিভিন্ন জেলায় জেলায় অজাহাতি জোড়ের নামে মিথ্যাচারের প্রদর্শনী। কিন্তু তাও ব্যর্থ হয়েছে। যেসব সাথীরা এতদিন যাবত মেহনত করে এসেছেন তাঁরা তাঁদের মিথ্যাচারে বিভ্রান্ত হয়নি। মেহনতের সাথে সম্পর্কহীন কিছু মানুষ বিশেষ করে মাদ্রাসা ছাত্ররা কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে চরমপন্থি অবস্থানে চলে গিয়েছেন। তাঁরাই আজ বিভিন্ন স্থানে সাধারণ তাবলীগের সাথীদের উপর জুলুম করছে। অথচ তাবলীগের এই সাধারণ সাথীরাই ছিল মাদ্রাসা সমূহের সব চেয়ে বড় পুঁজি এবং মুহিব্বীন।

এ সমস্ত অজাহাতি জোড় দ্বারা আমাদের আলমী শূরার বুযুর্গগণ যা হাসিল করতে চেয়েছিলেন তা মোটেই হাসিল হয় নি। বরং দেশের সাধারণ মানুষের কাছে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা চরম ভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। বিভিন্ন জেলাতে হয়ে যাওয়া ইজতেমা গুলোই এর প্রমাণ। তাঁদের অজাহাতি জোড়ের নামে মিথ্যাচার ও অপবাদগুলো কোন কাজ দেয়া দূরে থাক। সাধারণ মানুষের মধ্যে এর কোনই প্রভাব পড়ে নি। বরং তারা ব্যপক ভাবে এসব ইজতেমায় অংশগ্রহণ করেছে। এ কারণেই পাকিস্তান ভিত্তিক আলমী শূরার সমর্থকগণ ইজতেমাসমূহ বাধা দেয়ার জন্য এবং পণ্ড করার জন্য উঠে পড়ে লাগেন। কিন্তু তাতেও ফায়দা হচ্ছিল না। যেভাবেই করুন না কেন, যে নামই দেন না কেন, যতই বাধা দিন না কেন ইজতেমা গুলোতে আপামর জন সাধারণের অংশ গ্রহণ ঠেকানো যাচ্ছিল না। শেষমেশ তাঁরা মরণ কামড় হিসাবে হোক অথবা হতাশা থেকে হোক, পুরাপুরি হার্ড লাইনে চলে গেছেন। সকল ধরণের ভদ্রতার পর্দা ফেলে দিয়ে তাঁরা সরাসরি জঙ্গী আক্রমণের পথ বেছে নিয়েছেন।

এরই নজির আমরা দেখতে পেয়েছি গত সপ্তাহে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সহ কয়েক জায়গায়। বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে তাঁরা রক্তপাত ঘটিয়ে ছেড়েছেন। এরপর আবার গোয়েবলসের তরীকার অনুসরণে অনলাইনে মিথ্যাচার ছড়াচ্ছেন যে তাবলীগের সাধারণ সাথীদের হাতে মাদ্রাসার ছাত্ররা লাঞ্ছিত হয়েছে। এই হামলার বেশ কিছু ভিডিও থাকলেও তাঁরা শুরু থেকেই একটি ভিডিওর শেষের কিছু অংশ প্রদর্শন করে প্রোপ্যাগান্ডা ছড়াচ্ছেন। তাই শুরুতেই তাঁদের ভিডিওটি বিশ্লেষণ করে দেখা যাক।

ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে বাইরে বেশ কিছু মাদ্রাসার ছাত্র। প্রায় প্রত্যেকের হাতেই লাঠি। কেউ কেউ লাঠি উঁচিয়ে ভিতর থেকে বাইরের দিকে বের হয়ে আসছেন। এবং মাটিতে অনেক বড় বড় ইটের টুকরা ও পাথর পড়ে আছে। কিছুক্ষণ পরে হুড়োহুড়ি। ছাত্ররা দৌড়ে ভিতরের দিকে আসছে। কিছুক্ষণ পরে দেখা যায় কয়েকজন সাধারণ সাথী খালি হাতে ছাত্রদের দিকে দৌড়ে আসছে। পরে ছাত্রদের থেকে লাঠি ছিনিয়ে নিয়ে কয়েকজনকে মারে। এরপরের দৃশ্যে আবার দেখা যায় কয়েকজন ছাত্র ঝটিকা বেগে বের হয়ে এক সাথীদের ঘিরে ধরে মারতে থাকে। আবার তারা দৌড়ে চলে যায়। মাটিতে পরে থাকা ইটের টুকরা নিয়ে দুই পক্ষই ছুড়াছুড়ি করতে থাকে। এটা একটি আংশিক ভিডিও। সম্পূর্ণ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণই আমাদের কাছে এসেছে। আরো পরের দিকে আমরা তা দেখব ইনশা আল্লাহ। তার আগে আমরা এই ভিডিওটি একটু বিশ্লেষণ করি।

১। যারা এখানে ছিল তারা প্রায় সকলেই মাদ্রাসার ছাত্র। আলমী শূরার পক্ষে যারা এই ঘটনা নিয়ে প্রোপ্যাগান্ডা চালাচ্ছেন তাঁদের বর্ণনাতেও এমনই এসেছে।

২। সময়টা ছিল শুক্রবার আসরের পরে। আমরা যারা দীর্ঘদিন ধরে তাবলীগের মেহনতের সাথে আছি, অথবা যারা তাবলীগের মেহনত সম্পর্কে জানেন, জেলা মারকাজ গুলোতে সাধারণত শুক্রবার বিকালে বিশেষ কোন আমল থাকে না। বিশেষ করে শুধুমাত্র আলেমদের বা ছাত্রদের তো অবশ্যই নয়। কখনো কখনো আলেমদের জোড় থাকে। কিন্তু এসব জোড়েরও কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকে। যেমনঃ –

ক) বেশিরভাগ আলেমদের জুমা পড়ানোর তাকাজা থাকে বলে এই জোড় গুলো শুক্রবারে আয়োজন করা হয় না বললেই চলে।

খ) জেলা গুলোতে জোড় সারাদিন থাকে না। মাত্র কয়েক ঘণ্টার হয়ে থাকে। তাই যদি আসরের পরে জোড় রাখা হয়েও থাকে তাহলে মজমা আসতেছে এমনই হবার কথা ছিল। সেক্ষেত্রে সেখানে পাহারার বদলে ইস্তেকবালের সাথী থাকার কথা ছিল। কিন্তু এখানে তেমন কিছু দেখা যায় নি। বরং লাঠিসোঁটা নিয়ে অবস্থান করতেই দেখা গেছে। আরো উল্লেখ্য স্থানীয় মারকাজগুলোতে সাধারণত দিনের বেলায় পাহারা থাকে না। শুধুমাত্র শবগুজারির দিন রাতে পাহারা রাখা হয়। দিনের বেলায় ইস্তেকবালের সাথী থাকেন।

গ) তাবলীগের জোড় গুলোর বিভিন্ন নাম থাকলেও (যেমন পুরানদের জোড়, জেলার জোড়, ওলামা জোড়, খাওয়াস জোড়, ছাত্র জোড় ইত্যাদ) সাধারণত এগুলো ওপেন থাকেন। কেউ এসে পড়লে বাধা দেয়ার কোন নিয়ম নেই। কিন্তু এখানে দেখা গেছে বেশ কিছু ছাত্র লাঠিসোঁটা নিয়ে পাহারায় ছিল যাতে কেউ ভিতরে আসতে না পারে। মারকাজের দিকে আগত সাথীদের মারকাজে ঢুকতে বাধা দেয়া হচ্ছিল।

ঘ) জোড়ের তারিখ আগে থেকেই ডিক্লেয়ার করা হয়ে থাকে। আগে কোন এক মারকাজের মাসোয়ারাতে এই তারিখ ঠিক করার কথা। তাই কোন জোড় যদি ফয়সালা হয়েই থাকে তা মাসোয়ারার খাতায় পূর্বের কোন তারিখে উমুর ও ফয়সালা হিসাবে লেখা থাকবে। এবং হালকা ও ইউনিয়নের সাথীদের জানানো হবে। কিন্তু ঐদিন এই ব্যাপারে উন্মুক্ত কোন ঘোষণা ছিল না।

ঙ) আলেমদের জোড়ে মাদ্রাসা ছাত্রদের নিয়ে আসা স্পষ্ট নিষেধ। কেননা তাদের জন্য পড়াশুনাই আসল। এতাই তাবলীগের চিরন্তন উসুল। ছাত্রদের জন্য আলাদা জোড় হয় এবং সেটা খুরুজ সামনে রেখে শাবান মাসে বিভিন্ন মাদ্রাসায় মাদ্রাসায় হয়। এর ব্যতিক্রম, শুধুমাত্র কোন ইজতেমা থাকলে সেখানে উলামা ও ত্বলাবা জোড়ের প্রচলন আছে। কিন্তু ভিডিওতে এবং তাঁদের প্রোপ্যাগান্ডায় দেখা যায় বেশিরভাগ ছাত্রই ছিল।

তাই এটা নিশ্চিত যে এখানে কোন জোড় ছিল না।

তাহলে কি এটা শবগুজারীর মজলিস ছিল?

৪। বর্তমান হালতের প্রেক্ষিতে প্রশাসনের শালিসী মোতাবেক তাঁদের জন্য বরাদ্ধ ছিল তিনদিন। মূলধারার সাথীদের জন্য তিনদিন। আর শুক্রবারটা ছিল এক পক্ষের যাওয়া, অন্য পক্ষের আসা এবং জুম্মার জন্য উন্মুক্ত। প্রশাসনের রেজুলেশন মোতাবেক তাঁদের শবগুজারী চিরাচরিত নিয়ম মাফিক বৃহস্পতিবার। শুক্রবার জুমার আগেই চলে যাবার কথা। মূলধারার সাথীদের আমল শনিবার সকাল থেকে শুরু হলেও তারা কিছু সাথী শুক্রবার আসবেন এবং পরিছন্নতা ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সারবেন। গত কয়েক মাস ধরে এভাবেই হয়ে আসছিল। সেই মোতাবেকই মূলধারার কিছু সাথী ঐদিন বিকালে এসেছিলেন। ছাত্রদের ঐ সময়ে ওখানে থাকারই কথা নয়। ছাত্ররা তাহলে শুক্রবার বিকালে কি করছিল?

৫। শবগুজারীতে আসলে তাঁদের হাতে বেডিং থাকার কথা, যেমন মূলধারার সাথীদের পিঠে দেখা গেছে। কিন্তু ছাত্রদের হাতে লাঠি ছিল।

৬। আমরা ধারা তাবলীগের কাজের সাথী, তারা মোটামুটি কওমি মাদ্রাসায় যাওয়া আসা ও ইনভলভমেন্ট আছে। আমাদের অনেকেরই বাচ্চাকাচ্চা সেখানে পড়াশুনা করে। আমরা জানি মাদ্রাসাগুলো বৃহস্পতিবার বিকালে ছুটি হয়ে যায়। শুক্রবার মাগরীবের নামায সবার মাদ্রাসায় পড়ার কথা। এবং মাদ্রাসার ছাত্রদের যাদের দাঁড়ি উঠেনি তাঁদের শবগুজারীর নিয়ম নেই। অন্যান্য ছাত্রদের শবগুজারী ঐচ্ছিক। এই শবগুজারী বাসা থেকে হবার কথা। মাদ্রাসা থেকে নয়। শুক্রবার বিকালে তাদের মাদ্রাসায় যাবার প্রস্তুতি নেয়ার কথা। মারকাজে লাঠি হাতে অবস্থান করার কথা নয়।

৭। এত গুলো ছাত্র লাঠি হাতে! সেখানে ৩/৪ জন সাথী খালি হাতে এগিয়ে এসেছে। এতেই সবাই দৌড়ে ভিতরে ঢুকে গেল! এভাবে কি তাবলীগের মহান জিম্মাদারী সামাল দেয়া যায়? তাবলীগের মেহনতে হরহামেশা জান মাল ও নফসের কঠিন কুরবানী লাগে। তাবলীগের মেহনত ঈমান বানানোর মেহনত। ইমাম মাহদীর লস্করের সাথে মেলার মেহনত। আমরা এমন ঈমান বানাব যেন ইমাম মাহদীর ডাক আসলে লাব্বাইক বলতে পারি। আমরা আমাদের আকাবিরদের নিকত এ কথা বহুবার শুনেছি, হাঙ্গামার নাম জিহাদ নয়, জিহাদ হল সকল হালতে দ্বীনের তাকাজা পূরণ করা।

মূল ঘটনাঃ
মূল ঘটনা হল, বরাবরের মতই কিছু সাথী মারকাজের দায়িত্ব বুঝে নিতে এবং পরিষ্কার পরিছন্নতা ও অন্যান্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্য শুক্রবারে বিকালে মারকাজে এসেছিলেন। গত কয়েক মাস যাবত এভাবেই হয়ে আসছিল। কিন্তু ঐদিন আলমী শূরাপন্থী কথিত জমহুরগণ বরাবরের মত মারকাজ ছাড়েন নি। বরং তারা মূলধারার সাথীদের মারকাজে প্রবেশ প্রতিহত করার জন্য পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে লাঠিসোঁটা ও ইট পাটকেল নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। এ কাজে তারা মাদ্রাসার কোমলমতি ছাত্রদের ব্যবহার করেন।

ছাত্ররা দুই ভাগ হয়ে মারকাজের ছাদে এবং চত্বরে অবস্থান নেয়। ছাদে তারা পর্যাপ্ত পরিমাণ পাথর ও ইটপাটকেল জড়ো করে। চত্বরের ছাত্রদের প্রায় প্রত্যেকের হাতেই বড় বড় লাঠি দেখা যায়, যাকে পরিভাষায় গজারি লাঠি বলে। সাধারণত হাঙ্গামা করার জন্যই এসব লাঠি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তাবলীগের ইতিহাসে কখনোই সাথীদের হাতে গজারী লাঠি ব্যবহার করতে দেখা যায় নি। শুধুমাত্র পাহারার সাথীরা ছাড়া। স্থানীয় মারকাজ গুলোতে পাহারায় রাতের বেলায় দেয়া হয়, এবং প্রতি গেটে সর্বোচ্চ দুইজনের বেশি থাকে না। আর লাঠিও শুধুমাত্র প্রতীক যে তারা পাহারার সাথী। কিন্তু সেদিন এত পরিমাণ লাঠি হাতে ছাত্র দেখা গেছে যে, কাকরাইল মসজিদের পাহারায়ও এত সাথীর দরকার পড়ে না।

মূলধারার সাথীরা আসতেই তাদের প্রতিহত করে এবং কর্কশ ভাষায় চলে যেতে বলে। এ সময়ে তারা পিতৃতুল্য, ভ্রাতৃতুল্য পুরাতন সাথীদের সাথে খুবই খারাপ ব্যবহার করতে থাকে। মূলধারার সাথীরা ধৈর্যের সাথে তাদের সাথে কথা বলেন, বুঝানোর চেষ্টা করেন এবং অন্যান্য সপ্তাহের মত ছাত্রদের মারকাজ খালি করে তাদের হাতে মারকাজ বুঝিয়ে দিতে আহবান জানান। এক পর্যায়ে কিছু সাথী গেট খুলে ভিতরে ঢুকে পড়লে ছাত্ররা লাঠি উঁচিয়ে হুমকি দেয়। উপর থেকেও ছাত্ররা ঢিল ছুড়তে শুরু করে। এলোপাথাড়ি ঢিল ছোঁড়াছুঁড়ির কারণে উভয় পক্ষেরই বেশ কিছু সাথী আহত হয়।

আমাদের সময়, যুগান্তরসহ বিভিন্ন জাতীয় পত্রপত্রিকায় ১১ জনের খবর আসলেও আমাদের সাথীদের গণনায় কম বেশি মিলিয়ে শুধু মূল ধারার সাথীই জখম হন ১৫ জন। অপর পক্ষে ফেসবুকে এ যাবত তিনজন ছাত্রের আহত হবার ছবি দেখা গেছে। যদিও তাদের কেউ কেউ মূলধারার সাথীদেরও তাদের নিজেদের সাথী হিসাবে চালিয়ে দিয়ে অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে।

মূলধারার আহত সাথীদের মধ্যে বেশ কিছু বৃদ্ধ সাথীও রয়েছেন। তাঁদের একজন হলেন ৭৫ বয়সী আয়াত আলী। তিনি মাথা ও চেহারায় ইট দ্বারা আঘাত প্রাপ্ত হন। এবং তার পায়েও লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়। মূলত পিতার বয়সী এই বৃদ্ধ সাথীদের রক্তাক্ত দেখেই কিছু কিছু সাথী ছাত্রদের দিকে তেড়ে যান। অন্যথায় ছাত্রদের লাঠির আঘাতে আরো বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।

অন্যান্য কিছু ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে এ সময়ে মারকাজের বাইরে বাইরে প্রচুর সাথী ছিলেন। মুলত অগ্রবর্তী জামাতের বাধাপ্রাপ্ত হবার খবরেই সাথীরা হাজির হন। অন্যদিকে আলমী প্রপ্যাগান্ডিশদের ভাষ্যমতে মারকাজে ৩০০ এর মত ছাত্র ছিল। বাইরে যে পরিমাণ সাথী ছিল তারা যদি সত্যিই মারকাজ দখল করতে আসতেন তাহলে খুব সহজেই দখল সম্পন্ন করা সম্ভব ছিল। কিন্তু তারা বাইরে চুপচাপ শান্ত ভাবেই অপেক্ষা করছিলেন। বরং পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ ভাবে সমাধানের জন্য কিছু বয়স্ক পুরাতন সাথীদের পাঠিয়েছিলেন গেটে কথা বলতে। পক্ষান্তরে মাদ্রাসার ছাত্ররা সেখানে মারকাজ দখলে রাখতে এবং মূলধারার সাথীদের ঢুকতে দিবে না এমন জঙ্গিবাদী মনোভাব নিয়েই সেখানে গিয়েছিল। কেননা তাদের বেশ কয়েকজনকে কাফনের কাপড় পরে লাঠিসোঁটা হাতে অবস্থান নিতে দেখা যায়।

নেপথ্যের কারণঃ
এটা হঠাৎ করে সংঘটিত কোন ঘটনা নয় বরং মূলধারার সাথীদের উপর দীর্ঘদিনের জুলুম ও নির্যাতনেরই ধারাবাহিকতা। মূলধারার সাথীরা তাবলীগের এই সঙ্কট শুরু হবার পর থেকেই ধারাবাহিক ভাবে নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছেন। বিভিন্ন মসজিদে তাদের কোন আমল করতে দেয়া হচ্ছে না, জামাতে বের হতে দেয়া হচ্ছে না। বিভিন্ন জায়গায় জামাতগুলো মসজিদ থেকে বের করে দেয়ার মত ঘটনাও ঘটছে। প্রতিনিয়ত হুমকি ধামকি দেয়া হচ্ছে। আর কটূক্তি তো আছেই। এমনকি সাথীদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে মসজিদ থেকে বের করে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি সাথীদের শেষ আশ্রয়স্থল মারকাজেও তাদের স্থান দেয়া হচ্ছে না। অথচ এই মারকাজ তাদেরই জান, মাল ও শ্রমে গড়া। মারকাজের মধ্যেও বহুবারই আমলের মধ্যে এসে প্রতিবন্ধকতা, হুমকি ধামকি বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে।

সর্বশেষ গত মে মাসে মারকাজের মধ্যে সাথীদের উপর আক্রমণের ঘটনা ঘটলে প্রশাসনের সাথে এক বৈঠকে আমল ভাগ করে দেয়া হয়। তাবলীগের মেহনতের শুরু থেকেই মঙ্গলবার মাসোয়ারা ও বৃহস্পতিবার শবগুজারী হয়ে আসছে। তারা কখনো তাবলীগে সময় না লাগালেও ঐদিন গুলো তারা দাবি করে বসে। মূলধারার সাথীরা হযরতজীর নির্দেশনা মোতাবেক কোন ঝামেলায় না গিয়ে এই অসম বণ্টনও মেনে নেন। মূলধারার সাথীদের এই অসম বণ্টনেও রাজি হবার কারণ মূলত ইজতেমাইয়াত, আমীরের ইতায়াত, আল্লাহর উপরে ইয়াকীন এবং উলামা কেরামদের তাযীম। এর বিপরীতে আলমী শুরার পক্ষে বৃহস্পতিবার ও মঙ্গলবার দাবি করার পিছনে কারণ ছিল মূলত এই ধারণা যে সাথীরা এই দিন গুলোতে অভ্যস্ত। তাই এই দিন গুলো দখল করতে পারলে হয়ত মেহনতকরনেওয়ালা সাথীদের জুড়ানো যাবে। কিন্তু এত কিহু করেও সাথীদের জুড়াতে না পারায় তারা পুরাপুরি মারকাজ দখলের চেষ্টা চালায়।

রক্তপাতের প্রকাশ্য উস্কানিঃ
মাস খানেক আগে বি বাড়িয়াতে ঐ অঞ্চলের এক খ্যতনামা ওয়ায়েজিন প্রকাশ্যে হুমকি দেন মূলধারার সাথীদের কোথাও কোন আমল করতে দেয়া হবে না, তাঁদের দাঁড়াতে দেয়া হবে না। মূলধারার সাথীরা কিভাবে মারকাজে আমল করে, শবগুজারী করে প্রশ্ন তুলেন। এবং পরিষ্কার ভাষায় হুমকি দেন মসজিদে মসজিদে রক্তের বন্যা বয়ে যাবে। গত শুক্রবার যা হয়েছে তা সেই হুমকিরই প্রথম ধাপ। রক্তের বন্যা বসাতে না পারলেও তারা মূলধারার সাথীদের রক্ত ঝরিয়েছেন। এটা তারা অব্যহত রাখবেন তা তাঁদের পরবর্তী কর্মকাণ্ডেই বুঝা গেছে। আরো রক্তপাতের আশঙ্কায় প্রশাসন হস্তক্ষেপ করে এবং টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে উভয় পক্ষকেই ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এরপরও মাদ্রাসার ছাত্ররা তাদের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড অব্যহত রাখে। তারা লাঠিসোঁটা হাতে রাস্তা অবরোধ করে সাধারণ মানুষদের কষ্ট দেয়।

মূল দুরভিসন্ধিঃ
মূলত এসবের পিছনে বি বাড়িয়ার প্রসিদ্ধ মাদ্রাসা জামিয়া ইউনুসিয়ার শিক্ষক মাওলানা আব্দুর রহীম জড়িত বলেই জানা যায়। তিনি মারকাজ এবং মারকাজ সংলগ্ন কয়েক একর জমি দখল করতেই এসব দুরভিসন্ধিমূলক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। তিনি ছাত্রদের দিয়ে এসব কাজগুলো করাচ্ছেন। এজন্যই তিনি মূলধারার সাথীদের দূরে সরিয়ে রাখতেন চাচ্ছেন। অথচ তাবলীগের চিরাচরিত উসূল হল সবাইকে কাছে ডাকা, জুড়িয়ে রাখা, সবার জন্য মারকাজের দরজা খোলা।

মূলত ২০১৫ পাকিস্তানে এক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আলমী শূরার জন্ম হয়। পাকিস্তান উগ্রপন্থার চারণ ভুমি এটা সর্বজন বিদিত। বাংলাদেশের কিছু আহলে শূরার অদূরদর্শিতার কারণে পাকিস্তানপন্থী আলমি শূরার সাথে জড়িত হয়ে যান। বাংলাদেশেও শূরাদের মধ্যে ফাটল ধরে। কাকরাইল মসজিদের আভ্যন্তরীণ আলমী শূরার সমর্থকদের উস্কানি ও মদদেই প্রথম গত ১৪ই নভেম্বর ২০১৭ সালে কাকরাইল মসজিদে মাদ্রাসার ছাত্রদের দ্বারা হামলা হয়।

তবে শূরাদের এই বিভক্তি মেহনতকরনেওয়ালা সাথীদের মধ্যে কোন ফাটল ধরেনি আলহামদুলিল্লাহ। কিছু সাথী যারা আগেই থেকে মেহনতে কম জুড়তেন তারাই মূলত পাকিস্তানপন্থী আলমী শূরাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। কিন্তু শূরাদের এই ফাটল কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ধরণের ধান্দাবাজ ও সুবিধাবাদী চক্র বিশৃঙ্খলা করছেন। এর একটা নজীর আমরা ঝিনাইদহতে দেখেছি। সেখানে প্রাক্তন জামাত ও শিবিরের কর্মীরাই মূলত আলেমদের নাম দিয়ে বিভিন্ন বিশৃঙ্খলা করেছে। এছাড়া বহু জায়গায় মূলত মারকাজ ও মারকাজ সংলগ্ন জমি দখলের জন্যই তাবলীগের নাম দিয়ে তাণ্ডব চালানো হচ্ছে। আর এটা করতে গিয়ে তারা এতোটাই মরিয়া হয়ে গেছে যে রক্তপাত ঘটাতেও পরোয়া করছে না। লক্ষ্যণীয় এসব কাজে তারা নিজেরা সরাসরি অংশগ্রহণ না করে মাদ্রাসার কোমলমতি ছাত্রদের ব্যবহার করছে। আর নিজেরা নিরাপদ দুরত্বেই থাকছে।

তাবলীগের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বিহীন এসকল ধান্দাবাজদের থেকে মারকাজগুলো এখনই উদ্ধার করা জরুরী। যেভাবে তারা মারকাজগুলোতে বিপুল পরিমাণ লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল জড়ো করছেন তাতে ভবিষ্যতে তারা তাদের নিজেদেরর স্বার্থ হাসিলের জন্য যে কোন কিছুই করতে পারেন। এখনই এদের থামানো না গেলে ভবিষ্যতে এদের দ্বারা জননিরাপত্তা আরো বিঘ্ন হবার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com