শনিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২১, ০৪:৪৩ পূর্বাহ্ন

পাক আলেমরা যা বলেছেন, এতদিন ধরে তাবলীগের সাথীরা বাংলাদেশে সে অনুরোধই করে আসছেন | মুফতী ফয়জুর রহমান

পাক আলেমরা যা বলেছেন, এতদিন ধরে তাবলীগের সাথীরা বাংলাদেশে সে অনুরোধই করে আসছেন | মুফতী ফয়জুর রহমান

বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন, মুফতী ফয়জুর রহমান দা.বা। একদিকে একজন বিদগ্ধ আলেম, উস্তাদ, মাদরাসার মুহতামিম, অপরদিকে একজন একনিষ্ঠ মুবাল্লিগ। হাজারো আলেমের উস্তাদ ও বয়োজ্যেষ্ঠ মুরুব্বী। দাওয়াত ও তাবলীগের মোবারক মেহনত নিয়ে দেশে বিদেশে রয়েছে তাঁর সরব বিচরণ। বর্তমান হালতে দাওয়াতের কাজকে গোটা বাংলাদেশে যেক’জন আলেম পরম যতনে ব্যাথা আর দরদের সাথে মূলস্রোতধারায় আগলে রেখেছেন, তিনি তাদের অন্যতম কান্ডারী। গতকাল তিনি দেওন্দের মেহমানখানায় বসে পাকিস্তানের আলেমদের চিঠির বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেন সাংবাদিক মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহর সাথে। সাক্ষাৎকারের চুম্বকাংশ তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম এর পাঠকের জন্য তুলে ধরা হল।

মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহঃ পাকিস্তানের উলামাদের চিঠি কি আপনি পড়েছেন? এ বিষয়ে অনুভূতি কি?
মুফতী ফয়জুর রহমানঃ আমি চিঠিটি পড়েছি। পাকিস্তানের উলামায়ে কেরাম ও তাবলিগের মুরব্বি হজরতরা অত্যন্ত দরদ ও ভালোবাসা নিয়ে এটি লিখেছেন। এ চিঠি আরো আগে দিলে বাংলাদেশের সংঘাত আরেকটু প্রশমিত হত। চিঠিটি আমরা প্রজিটিভলী দেখছি, যদিও তাতে কিছু অসংগতি আছে। তবে চিঠির শুরুতেই তারা চমৎকার ভাবে বলেছেন “আলহামদুলিল্লাহ বিশ্বব্যাপী তাবলিগের মেহনতের মাধ্যমে দীনের অনেক বড় কাজ হয়েছে, হচ্ছে। লাখ লাখ মানুষ আজ তাবলিগের মেহনতের কারণে দীনের নুর তাদের হৃদয়ে পৌঁছেছে। এক নতুন বিপ্লবের সন্ধান পেয়েছে।” এটি আমাদের দেশের আলেমরা বুঝতে পারলে এই মেহনতকে আজ টুকটো টুকরো করতে এভাবে মাঠে নামতেন না।

মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহঃ অসঙ্গতি কি আছে?
মুফতী ফয়জুর রহমানঃ পাকিস্তানের হযরত উলামায়ে কেরাম চিঠিতে একস্থানে লিখেছেন, “তাবলিগের বড় বড় ভুল-ত্রুটি সত্ত্বেও এখনো পর্যন্ত আমরা এ কাজ শুধু করেই যাচ্ছি না, সাধারণ মানুষ ও আহলে ইলমদেরকেও এ মেহনতের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। এ মেহনতের সঙ্গে সর্বক্ষণ যুক্ত থাকার চেষ্টা করছি।” তাহলে বুঝা যায় এই কাজ ভুলের উপর চলছে। তারাও ভুলের উপরই করছেন। এরদ্বারা এই কাজের আহমিয়তকে খাটো করা হয়েছে। ভুল কার নাই। আলেমদের সিয়াসী ময়দান, খানকা ও মাদরাসা পরিচালনায় কি বড়বড় ভুল নেই? আপসে বড়বড় ভাঙ্গন, খন্ড বিখন্ডের ইতিহাস নেই? এসব কি কখনো তাবলীগওয়ালারা বলে বেড়ায়? খায়রুল কুরুনের পর ইসলামের এমন কোন শাখা নেই যা ভুল থেকে মুক্ত। বরং অনন্য শাখা থেকে  নিসংকোচে তাবলীগের কাজে ভুল কম। ফলে সকল মাযহাবের লোক এটিকে বুকে আগলে নিয়েছে। তাই এসব না বলাই উচিত?

মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহঃ এই চিঠিতে কি বাংলাদেশের জন্য কোন ম্যাসেজ আছে বলে মনে করেন?
মুফতী ফয়জুর রহমানঃ চিঠিতে পাকের উলামায়ে কেরাম স্পষ্টতই এদেশের কথা উল্লেখ করে লজ্জাজনক বলেছেন। “বাংলাদেশে সম্প্রতি যে দুঃখজনক ও লজ্জাজনক ঘটনা ঘটেছে, এতে করে আমাদের তাবলিগ নিয়ে শঙ্কা আরো বেড়ে গিয়েছে। কখনো কল্পনাও করতে পারিনি, দীনদারগণ এভাবে দু’দলে বিভক্ত হয়ে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটাবে। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।” এটি বাংলাদেশের আলেমদের চরম বাড়াবাড়ির একটি কলংকিত ইতিহাস হয়ে গোটা দুনিয়াবাসীর সামনে নজির হয়ে থাকবে বলে মনে করি। তাবলীগওয়ালারা উগ্র নয় এটি সবাই জানে অপরদিকে বাংলাদেশের আলেমদের উগ্রপন্থী আবেগী অবস্থা সারা পৃথিবীর কাছেই পরিচিত।

মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহঃ তাবলীগের বিবাদমান দুই পক্ষের মাঝে ঐক্য কি সম্ভব এই উদ্যোগের দ্বারা?
মুফতী ফয়জুর রহমানঃ হা সম্ভব। তবে সুন্নত ও সিরাতের ভিতরে থেকে। মাওলানা সাদ কান্ধলভীকে আজ সারা দুনিয়া আমির হিসাবে মেনে নিয়েছে, মুষ্টিমেয় কিছুসংখ্যক বিদ্রোহী ছাড়া। এই অবস্থায় তাকে কাজ থেকে সরে দাড়ানোর আব্দার হবে ছেলে মানুষী ও সিরাত বহিঃভূত। তিনি তাবলীগের চলমান সংকটে ৮০ ভাগ বিদ্রোহী দমনে সফল হয়েছেন তার যোগ্য নেতৃত্বের দ্বারা। তাই পাক আলেমদের ” তাবলিগের কঠিন দুর্দিনেরও আশংকা দেখ দিবে এতে।” এটি অমূলক একটি কথা। শংকা কেটে এখন নতুন ভোরের সূর্য উদিত হয়েছে। তাকে মেনে নিলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আমীর হবার যতো শরীয়া শর্ত আছে সব তিনি পুরো করেই আমীর হয়েছেন। যদি তিনি গোটা জাহানের আমীরুল মুমিনিন নন, তিনি তাবলীগ জামাতের আমীর। তিনি আরো সহজ শর্তেই আমীর হতে পারতেন।  যারা তাকে মানবে না, তারা তাদের মতো করে কাজ করুক। উনার কাজে বাধা দেয়ার তো কোনভাবে সমর্থন করপ না। এটি করতে গিয়েই আজ এই পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে।

মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহঃ একে অপরের বিরোদ্ধে কুৎসা রটনা ও বিরোধীতা বন্ধে তাদের আহব্বান কি বাংলাদেশের আলেমরা মানবেন?
মুফতী ফয়জুর রহমানঃ তারা খুব চমৎকারভাবে একে অপরের সম্পর্কে মন্তব্য ও কাজে বাধা প্রদান না করতে বলেছেন। এর দ্বারা বুঝা যায় আল্লামা ত্বকী উসমানীদের মতো ফকীহগনও উভয় পক্ষকে হক মনে করেন। সবাই যেন যার যার কাজ করে। কিন্তু বাংলাদেশের আলেমদের অপপ্রচার ও মিথ্যাচার দেখে গোটা দুনিয়া আজ স্তম্ভিত। বাংলাদেশের আলেমরা বাঁধা না দিয়ে তার তাদের মতো কাজ করলেই আজ সংঘাত তৈরি হত না।আজ পাকিস্তানের আলেমরা যা বললেন, এই কথাগুলোই নিজামুদ্দিন এর অনুসারী বাংলাদেশের তাবলীগের মুরুব্বীরা বিনীত করজোড়ে বলে আসছিলেন বিগত এক বছর ধরে।”আসুন যারযার কাজ করি। কেউ কাউকে বাঁধা  না দেই”

১লা ডিসেম্বর যে ঘটনা ঘটল এটিতো মূলত তাবলীগের সাথীদের ৫দিনের জোড়ে বাঁধা দেয়া ও মাদরাসার ছাত্রদিয়ে মাঠ দখল করতে গিয়েই হয়েছে।

পাকিস্তানের শীর্ষ আলেমদেরকে বাংলাদেশের অধিকাংশ আলেমরাই মডেল হিসাবে ফলো করেন। বিশেষ করে এদেশের লক্ষ লক্ষ আলেম জুমআর খুতবায়, বয়ান, বক্তৃতায় শায়খুল ইসলাম বিচারপতি আল্লামা মুফতী ত্বকী উসমানীর কথাগুলোকে সবচেয়ে বেশি নকল করে থাকেন। অপকটে অনুসরণ করেন পাকিস্তানের মুফতীয়ে আজম আল্লামা রফী উসমানীকে।

এছাড়া তাবলীগ নিয়ে এই মুহুর্তে বাংলাদেশে যেসব ওজাহাতি আলেমরা মাঠে ময়দানে উত্তেজনা তৈরি করছেন তাদের সবারই ফলো করার প্রধান জায়গা পাকিস্তানের উলামায়ে কেরাম। মাওলানা আবদুল মালিকসহ অধিকাংশ ওজাহাতি আলেমদের উস্তাদ পাকিস্তানের এই শীর্ষ আলেমরা। এবার অন্তত বাংলার আলেমরা একটু চুপ থেকে পাক আলেমদের মতামতকে সম্মান করে উলামাদের ইজ্জত রক্ষা করে ভ্রতিঘাতি সংঘাত থেকে পুরো জাতিকে আল্লাহর ওয়াস্তে বাঁচাবেন এই অনুরোধ করি।

মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহঃ এটি কি আদো সম্ভব এই দেশে?
মুফতী ফয়জুর রহমানঃ কেন নয়? পাকিস্তানের চিন্তাশীল বুজুর্গ সকল আলেমরা শুরু থেকেই এই পন্থা অবলম্বন  করে আসছেন। তাদের কেউই আজ পর্যন্ত মাওলানা সাদ কান্ধলভীকে নিয়ে একটি মন্তব্যও করেন নি। কিন্তু বাংলাদেশের আলেমরা কুলহিন্দের বড়বড় আলেমসহ দেওবন্দের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গীকে ডিঙ্গিয়ে,  পাক আলেমদের মতামতকে উপেক্ষা করে কি বলছেন উদ্ভট মিথ্যা নানান বানোয়াট কথাবার্তা, তা সবার সামনে। আজ এদেশে ভয়াবহ ধর্মীয় সংকটের প্রধান কারণ উগ্রপন্থা ও তাহকীক ছাড়া খন্ডিত বয়ানশুনে বির্তক করা। মসজিদের আমলে বাঁধা সবই করছেন ওজাহাতি আলেমরা। আমি আহব্বান করব, আসুন না! বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তাশীল আলেমরা একটু ভাবি। মসজিদের ইমামরা উত্তেজিত হয়ে খুৎবা দেয়ার আগে একটু চিন্তা করি,  কেন পাক ভারতের আকাবিররা আমাদের মতো উগ্রপন্থায় কথা বলছেন না। পাকিস্তানের আলেমদের চেয়েও কি আমরা দ্বীনী, এলেমি ,  রাজনৈতিক ও রাষ্টিয় পর্যায়ে প্রভাব কিংবা বেশি যোগ্যতা রাখি? কখনো না। তহলে আসুন শান্ত হই। শুনা কথা প্রচার করে মিথ্যাবাদি না হয়ে, আসলে সমস্যা কোথায় একটু তাহকিক করি।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com