রবিবার, ১১ এপ্রিল ২০২১, ০৫:১৬ পূর্বাহ্ন

বিরোধীদের গালাগালিতে ভক্ত হলাম আল্লামা সাদ কান্ধলভীর: সৈয়দ মবনু

বিরোধীদের গালাগালিতে ভক্ত হলাম আল্লামা সাদ কান্ধলভীর: সৈয়দ মবনু

সৈয়দ মবনু; অতিথি লেখক: তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম।

বিশ্ব তাবলিগের চলমান সংকট নিয়ে বেশ কিছু লেখা আমার প্রকাশিত হয়েছে। আমার বেশিরভাগ লেখাই ছিলো হযরত মাওলানা সাদ কান্ধালভীর পক্ষে। তিনি ভুলের উর্ধ্বে বলে আমি কিন্তু তাঁর পক্ষাবলম্বন করিনি। আমি বারবারই বিভিন্ন লেখায় বলেছি তিনি মানুষ। তিনি নবী-রাসুল কিংবা ফেরেস্তা নয়। তিনি চৌদ্দ- পনেরো শ বছর পরের উম্মত। তারও ভুল হতে পারে কিংবা ভুল আছে। তাও বারবার বলেছি, আমি মাওলানা সাদ কান্ধালভীকে জানতাম না ততদিন পর্যন্ত যতদিন কিছু মানুষ তাঁকে গালাগালি শুরু করেনি। আমি মূলত তাঁর সম্পর্কে আগ্রহী হয়েছি ফেসবুকে কিছু মানুষের অশ্লিল, অশালিন, অভদ্র ভাষায় গালাগালি দেখে। গালাগালিটা আমার কাছে ভদ্রলোকের ভাষা মনে হয় না। আমি যে কারো সম্পর্কে আলোচনা-সমালোচনার পক্ষে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে অবশ্য চাইনা কেউ নবী, রাসুল কিংবা সাহাবীদের সমালোচনা করুক। তাই এবিষয়টি মুসলমানদের জন্য অনুচিত। বাকি কাউকেই আমি সমালোচনার উর্ধ্বে মনে করি না। এখানে মাওলানা সাদ কান্ধলভী তো মামুলি ব্যাপার। তবে কারো বিরুদ্ধে সমালোচনা আর গালাগালি এক বিষয় নয়। আমি লক্ষ্য করেছি, ক্ষেত্র বিশেষ কেউ কেউ মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বিরুদ্ধে শুধু সমালোচনা নয়, বিভিন্ন তোহমতও দিয়েছেন। সমালোচনা তো অপরাধ নয়, অপরাধ হলো তোহমত আর গালাগালি।

আমি মাওলানা সাদ কান্ধলভীর পক্ষে কথা বলেছি বলে অনেকে আমাকেও গালাগালি করেছেন। আমি এতে মোটেও নারাজ হইনি। কারণ, যারা গালি দিয়েছেন তারা বুঝেননি আমি কী বলছি বা কী বলতে চাচ্ছি। আমি তাও মনে করিনা সাধারণ যারা গালাগালি করেছেন তারা অসৎ কোন স্বার্থে তা করেছেন। তারাও কিন্তু দ্বীনের স্বার্থে দ্বীনের জন্যই করেছেন। আমি অনেককে পরামর্শ দিয়েছি, তাবলিগের চলমান সংকট বুঝার জন্য হযরত আলী বনাম হযরত আয়েশা (রা.) এবং হযরত আলী বনাম হযরত মোয়াবিয়া (রা.)-এর মধ্যকার মতানৈক্য কিংবা হযরত ওমর (রা.) বা হযরত উসমান (রা.)-এর বিরুদ্ধে সংঘটিত বিদ্রোহ ইতিহাস থেকে পাঠ করার জন্য। সেই ঘটনাগুলো আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের সঠিক আকিদা বা বিশ্বাস অনুযায়ি না বুঝলে তাবলিগ জামায়াতের চলমান সংকটকে সঠিকভাবে অনুধাবন সম্ভব নাও হতে পারে। এই সকল ক্ষেত্রেই ‘হাতও আমার, গালও আমার’।

মাওলানা সাদ কান্ধলভীর পক্ষাবলম্বনে আমার কোন স্বার্থ ছিলো না। আমি গত ত্রিশ বছরের মধ্যে তাবলিগের আশপাশেও যাইনি। বরং আমার অনেক স্বার্থ জড়িত রয়েছে মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বিরুদ্ধে যারা, তাদের সাথে। দেশ-বিদেশে ওদের সাথেই আমার বেশিরভাগ চলাফেরা। বলতে গেলে আমার শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় সবার সাথে আমার এ বিষয়ে কিছুটা মতানৈক্য হয়েছে। এমন কি আমার নিজের পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোতেও কেউ কেউ ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন। আমি অবশ্য কাউকে আমার মত ছাপিয়ে দেই না। অনেক শিক্ষক-ছাত্র, এমন কি আমার ছেলে-মেয়েও সরাসরি আমাকে তাদের অনেক ভিন্নমতের কথা বলে, আমার সাথে তর্কবিতর্ক করে। আর আমি চাইও তা। আমি চাই ভিন্নমত হোক, তর্কবিতর্ক চলুক, চলুক আভ্যন্তরিণ বিষয়ে এহতেসাব বা আত্মসমালোচনা, তবে ক্ষুব্ধতাকে পরিহার করে। আমি ইখতিলাফের বিরুদ্ধে নয়, তবে খিলাফের বিরুদ্ধে।

তাবলিগের সংকটে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে জড়িয়ে যায় বিশেষ করে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমাকে কেন্দ্র করে। তাবলিগের বিরুদ্ধে তো ষড়যন্ত্র আছেই। এথেকে বেশি ষড়যন্ত্র এই ইজতেমাকে কেন্দ্র করে। ষড়যন্ত্র বহুমূখি। উভয়পক্ষের সাধারণ ঈমানদাররা আবেগের কারণে মূলত ষড়যন্ত্রের শিকার। এ নিয়ে মারামারি-রক্তারক্তিও হয়েছে। এসবে কোন পক্ষই নির্দোষ নয়। তবে বিশাল জনগোষ্ঠির দোষের হিসাব-নিকাশ করতে গেলে সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে নিত্যনতুন সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই পিছনকে বাদ দিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া ভাল। উদ্দেশ্য তো দ্বীনের দাওয়াতি কাজ। তাই কে কার সাথে কী আলোচনা করেছেন, সেই হিসাব বাদ দিয়ে কিভাবে দ্বীনি কাজ চলতে পারে তা ভাবুন। প্রয়োজনে উভয়গ্রুপই ময়দানে স্বাতন্ত্রতা বজায় রেখে আলোচনার মাধ্যমে মিলেমিশে কাজ করুন। দাওয়াতি কাজ যত বেশি হবে ততই তো দ্বীনের লাভ। এক প্লাটফরমে আসতে পারলে তো সোনায় সোহাগ।

বিশ্ব ইজতেমাকে নষ্ট করার ষড়যন্ত্র কিংবা বাংলাদেশ থেকে বিশ্ব ইজতেমাকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্রকে রুখতে হবে দল-মত নির্বিশেষে গোটা জাতি সংঘবদ্ধ হয়ে। সরকারকে এখানে দলের উর্ধ্বে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। দেশি-বিদেশি মেহমানদের পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে অবশ্য প্রশংসনীয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সরকারের মধ্যস্থতায় উভয়গ্রুপ মিলে আগামী ১৫, ১৬, ১৭ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ইজতেমার তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে একটি বিষয় বারবার উঠে আসছে, মাওলানা সাদ কান্ধলভী আসবেন কি না। কেউ বলছেন, আসতে দেওয়া হবে না। কেউ বলছেন, আসতে বাঁধা নেই। কেউ বলছেন, আসতে হবে। আবার কেউ কেউ বলছেন, যদি সাদ সাহেব না আসতে পারেন তবে ইব্রাহিম দেওলা এবং আহমদ লাটও আসার প্রয়োজন নেই। এসব কথাই সাধারণ মানুষের আবেগের বহিঃপ্রকাশ। সরকার এবং তাবলিগের মুরুব্বীরা সিদ্ধান্ত নেবেন বাস্তবতার আলোকে, আগত সকল মেহমানের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে। উভয়গ্রুপকেই আপোষে আসতে হবে ঐক্যের স্বার্থে, দ্বীনের স্বার্থে। স্মরণ রাখতে হবে, ঐক্যের জন্য আপোষের বিকল্প নেই। ফালতু এবং উস্কানিমূলক বক্তব্য কিংবা লেখালেখি বন্ধ করতে হবে। উভয়গ্রুপকে একটা সীমার ভেতর এসে দাঁড়াতে হবে। আল্লাহর ভয়, রাসুলের মুহাব্বাত এবং দ্বীনের প্রতি দরদ সবার মনে জাগাতে হবে।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com