রবিবার, ১১ এপ্রিল ২০২১, ০৪:৩৪ পূর্বাহ্ন

কওমী শিক্ষাবোর্ডের অনিয়মঃ হাইকোর্টের ভর্ৎসনা | মহামান্য আদালতের আদেশ জারি

কওমী শিক্ষাবোর্ডের অনিয়মঃ হাইকোর্টের ভর্ৎসনা | মহামান্য আদালতের আদেশ জারি

হাইকোর্ট প্রতিনিধি; তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম

কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডগুলোর সমন্বয়ে সরকারের অধিনে গঠিত সর্বোচ্চ শিক্ষাবোর্ড ‘আল হাইআতুল উলিয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’ এর অধিনে দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স) ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার অধিনে মেশকাত (স্নাতক) পরীক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চিত ১৭৭জনের পরীক্ষা যথাসময়ে নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ প্রদান করেছে হাইকোর্ট। আগামী রোববারের মধ্যে প্রবেশপত্র প্রদান ও (ক্ষেত্রবিশেষে) সংশোধন করে পরিক্ষা গ্রহণ করতে মহামান্য আদালত এই নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া কওমি শিক্ষাবোর্ডের অনিয়মের কারণে কর্তৃপক্ষকে চরম ভর্ৎসনা করেছে হাইকোর্ট। যা কওমি অঙ্গনের জন্য একটি লজ্জাজনক অধ্যায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টগণ।

আজ (৪এপ্রিল, বৃহস্পতিবার ) একটা রীটের আবেদনের প্রেক্ষিতে মাননীয় বিচারপতি এফ.আর.এম. নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে.এম. কামরুল কাদের মহোদয়ের দ্বৈত বেঞ্চ এ আদেশ প্রদান করে। ৬টি কওমি মাদরাসার পক্ষে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবি মোহাম্মদ আব্দুল কদ্দুস বাদল এর এক রীট আবেদনের প্রেক্ষিতে মাননীয় আদালত এই আদেশ প্রদান করেন।

রীটের আবেদনকারী মাদরাসাগুলো হলোঃ
১. মুফতী আতাউর রহমান পরিচালিত আল মাদরাসাতুল মঈনুল ইসলাম, বারিধারা, ঢাকা
২. মাওলানা জিয়া বিন কাসেম পরিচালিত মারকাজুল উলূম আশ শরীয়াহ, সাভার, ঢাকা
৩. মুফতী শফিউল্লাহ শাফী পরিচালিত মাদরাসাতুস সুফফা আল ইসলামিয়া, নন্দিপাড়া, ঢাকা
৪. মুফতী আব্দুর রশীদ তালুকদার পরিচালিত জামিয়া মাদানিয়া আশরাফুল উলুম, চাঁদপুর
৫. মাওলানা আমিনুল ইসলাম পরিচালিত মাদরাসায়ে রাহমানিয়া, গাইটাইল, কিশোরগঞ্জ
৬. মাওলানা উমর ফারুক পরিচালিত জামিয়া ইসলামিয়া রাহে জান্নাত মহিলা মাদরাসা, ভালুকা, ময়মনসিংহ

উক্ত মাদরাসাগুলোর মুহতামিমগণ উক্ত বোর্ড দু’টির অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির ফলে এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন মর্মে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবোর্ড দু’টির বিপক্ষে পিটিশন দায়ের করেন। সেই আলোকে মহামান্য আদালত আজ এই আদেশ প্রদান করেন।

গত বছর দশম সংসদের শেষ অধিবেশনে ‘কওমি মাদরাসাগুলোর দাওরায়ে হাদিসের (তাকমিল) সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রি (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান আইন, ২০১৮’ পাসের মধ্য দিয়ে ‘আল-হাইআতুল উলিয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’ নামে সর্বোচ্চ বোর্ডের অধীনে কওমি শিক্ষাক্রমের দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমানের সনদ প্রদানের যে দায়িত্ব দেয়া হয়, সেই আইন পাস হওয়ার পর এই প্রথমবারের মতো দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে আগামী ৮ এপ্রিল। আইন পাশের পরই শিক্ষাবোর্ডটির এমন নিয়ম বহির্ভূত কার্যক্রম ও স্বেচ্ছাচারী আচরণের প্রতিকারে গতকাল হাইকোর্টে বাংলাদেশের ৬টি বৃহৎ কওমি মাদরাসা রীট আবেদন করে।

জানা যায়, ‘আল হাইয়াতুল উলিয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’ ও ‘বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ’ বোর্ড দু’টির নিয়ম বহির্ভূত কার্যক্রমের শিকার হয় এসব মাদরাসা। ‘হাইয়াতুল উলয়া’ সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে কয়েকটি মাদরাসার পরীক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন ফি নেয়ার পরেও প্রবেশপত্র প্রদান করেনি। আরো কিছু মাদরাসার শিক্ষার্থীদের সমাপনি পরিক্ষার প্রবেশপত্র প্রেরণ করলে দেখা যায়, প্রবেশপত্রে সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসার নাম না লিখে “বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া” লেখা রয়েছে। নিচে আবার সংশ্লিষ্ট মাদরাসার মুহতামিম (প্রিন্সিপাল) এর সীল ও স্বাক্ষর দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু বোর্ডের কোন মুহতামিম হয় না। তাই সংশ্লিষ্ট মাদরাসাগুলো নিজেদের প্রতিষ্ঠানের মান অক্ষুন্ন রাখার জন্য সেখানে স্বাক্ষর করতে অপারগতা প্রকাশ করছেন। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সমাপনি পরিক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এটি অসতর্কতামূলক ভুল উল্লেখ করে এসব মাদরাসার মুহতামিমগণ কওমী শিক্ষাবোর্ডে “ভুল সংশোধন” আবেদন করলে বোর্ড কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ করে নি। তাই অনিয়মের বিরুদ্ধে গতকাল হাইকোর্টে রীট করে সংশ্লিষ্ট মাদরাসাসমুহ।

রীটের আবেদনকারী আইনজিবী এডভোকেট আবদুল কদ্দুস বাদল বলেন, বেফাক ও হাইয়াতুল উলিয়ার মতো জাতীয় শিক্ষাবোর্ড কোন প্রকার লিখিত নোটিশ ছাড়া এই মাদরাসাগুলোর সাথে এমন আচরণ করার কোন আইনী অধিকার রাখে না। এতে করে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়ার পাশাপাশি ছাত্ররা পরিক্ষা দিতে না পারলে তাদের ভবিষ্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাবে। যা সম্পূর্ণ অমানবিক, অন্যায়, বৈষম্যপূর্ণ ও বেআইনি। হাইয়াতুল উলিয়া সংসদে কওমী স্বীকৃতির আইন পাশের পরই প্রথম পরিক্ষায় এমন অনিয়ম দেখে মহামান্য আদালত বিস্ময় প্রকাশ করেন। আদালত কওমী শিক্ষাবোর্ড কর্তৃপক্ষের এমন আচরণে ভর্ৎসনাও করেন। পরিক্ষার আগেই যথার্থ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে মহামান্য আদালত কওমী মাদ্রাসার এই দুটি বোর্ডকে নির্দেশ প্রদান করেছেন।

এ বিষয়ে আল মাদরাসাতু মুঈনুল ইসলাম বারিধারা মাদ্রাসার মুহতামিম মুফতী আতাউর রহমান বলেন, মহামান্য আদালতের রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। আমরা আমাদের ন্যায্য ও আইনসম্মত অধিকার ফিরে পেয়েছি। হাইকোর্টের এই ঐতিহাসিক রায় মাইলফলক হয়ে থাকবে। বোর্ডে কেউ আগামীতে এমন অন্যায় ও নিয়ম বহির্ভূত কাজ করার সাহস করবে না বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

মারকাজুল উলুম আশ শরিয়া সাভার এর মুহতামিম মাওলানা জিয়া বিন কাসেম বলেন, কোন প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কোনো নোটিশের মাধ্যমে আমাদেরকে জানানো হয়নি। সে জন্য আমরা এ সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক মনে করে হাইকোর্টে রীট করেছিলাম। মহামান্য আদালতের এই রায়ের ফলে ছাত্ররা এখন সুষ্ঠুভাবে পরিক্ষা দিতে পারবে বলে আমরা আশা করছি।

দারুল উলূম উত্তরার মুহতামিম মাওলানা মু’আয বিন নূর বলেন, মযলূমের দু’আ কখনো প্রত্যাক্ষাত হয় না। আমরা মযলূম ছিলাম। আশা করি, হাইয়াতুল উলিয়া ও বেফাক এই ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে এবং ভবিষ্যতে ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিবে। ‘দায়িত্ব’ একটি আমানত। এটি কোন স্বেচ্ছাচারিতা কিংবা কর্তৃত্ব প্রদর্শনের হাতিয়ার নয়। হাইয়াতুল উলিয়া ও বেফাকের কর্তৃপক্ষগণ প্রতিবছর প্রায় অর্ধলক্ষাধিক পরীক্ষার্থীর দায়িত্ব গ্রহণ করে থাকেন। আশা করি, হাইকোর্টের আজকের সিদ্ধান্তের পরে তারা ‘আমানত’ রক্ষার ব্যপারে আরো যত্নবান হবেন।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com