বৃহস্পতিবার, ০৮ এপ্রিল ২০২১, ০৪:০৫ পূর্বাহ্ন

তাবলীগে মাস্তুরাতের মেহনত যেভাবে শুরু হল

মাওলানা দাউদ আঠাড়বী, ভারত, তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম

প্রত্যেক মহিলাকে মাহরামেরসাথে বের করা হচ্ছে। স্বামী, ছেলে, পিতা অথবা ভাই সাথে থাকতে হবে। যেখানে জামাত যাচ্ছে, তাদের আগেভাগেই সে সম্পর্কে অবগত করে দেয়া হয়। যাতে করে সেখানে গিয়ে জায়গাটি খালি করে আসে। যে যে স্থানে মহিলারা অবস্থান করেন, তারা সেই স্থানেই থাকেন। গ্রামবাসী জামাতের কাছে আসে। গাশত মহিলাদের মাহরাম ও স্থানীয় পুরুষরা
মিলে করেন আনুমানিক ১৯৪১ সালে আমি নিযামুদ্দীনে হযরত মাওলানা শাহ মুহাম্মাদ ইলিয়াস (রহ)-এর খেদমতে হাজির হই। আমি মাদরাসায়ে সুবহানিয়ায় অধ্যয়নরত ছিলাম। হযরত মাওলানা আব্দুস সুবহান (রহ)-এর স্ত্রীকে আমরা আম্মাজী ডাকতাম। আম্মাজী দিল্লির নানান স্থানে কিতাব পড়ে শুনাতেন। আমি তার কারগুজারী হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রাহ)কে শুনাতাম। হযরতজীর দিক-নির্দেশনা ও হেদায়াত আম্মাজীকে শুনাতাম। একদিন আম্মাজী বললেন, হযরতজীকে বলবে—আপনি পুরুষের জামাত পাঠাচ্ছেন, কিন্তু মহিলা জামাত কেন বের করছেন না?
আমি হযরতজীকে একথা শোনালাম। তিনি একথা শুনে খুবই আনন্দিত হলেন এবং অনেক দোয়া করলেন। আমি মাসতুরাত জামাত পাঠাতে চাই। তুমি সেই তিনজনের সাথে পরামর্শ কর। তারা এ ব্যাপারে কী বলেন? আমি প্রথমে মাওলানা ইনামুল হাসান সাহেবের কাছে যাই। বলি হযরত মাসতুরাত জামাত পাঠাতে চাচ্ছেন, আপনি কী বলেন? হযরতজীর কথার সারমর্ম এরূপ— পুরুষকে পাঠানোর উদ্দেশ্যই তো এখনো উলামা হযরতদের বুঝে আসছে না। মহিলাদের তাবলিগে পাঠানোটা তারা কিভাবে মানবেন? তাই আমার কোনো মতামত নেই। ক্বারী দাউদ সাহেবও এমন কথাই বললেন। এরপর হযরত মাওলানা শাহ মুহাম্মাদ ইউসুফ সাহেবের খেদমতে যাই। তিনি বলেন, আমার তো কোনো মতামতই নেই।
তারা তিনজন যেমন বলেছেন আমি হযরতজীকে তদ্রূপ শোনাই। তিনি ইউসুফ সাহেবের বক্তব্য শুনে অনেক রাগ করলেন। আমাকে বললেন, যেসব মহিলা তাবলিগে যেতে আগ্রহী, তুমি তাদের দিল্লির একটি ঘরে সমবেত করে কথা শুরু করে দাও। আমি দেখতে চাই সেই মুসলমানদের, তাদের কেন কোনো মতামত নেই। পাহাড়গঞ্জ, মুলতানীর ঢানডা এর এক ঘরে একত্রিত করে আলোচনা শুরু করি। জহরের নামাজের পর মাওলানা নূর মুহাম্মাদ বাঝুটকে সঙ্গী করে হযরতজী পাহাড়গঞ্জ পৌঁছে যান। মাওলানা নূর মুহাম্মাদ (রহ) বয়ান আরম্ভ করেন। তিনি বয়ানের মধ্যে বলেন, দীন শিক্ষা করার জন্য নারীদের এপথে বের হওয়া খুবই আবশ্যক। কিন্তু মাহরাম ছাড়া মহিলারা বের হতে পারবেন না।
মেওয়াত এলাকায় বার বার জামাত যেতে থাকে। মুফতী কেফায়াতুল্লাহ সাহেব যখন এ সংবাদ জানতে পারেন, তখন তিনি অনেক রাগ করেন। মুফতী সাহেবের রাগের কথা হযরতজী জানতে পেরে একটি টাঙ্গা নিয়ে মাদরাসায়ে আমীনিয়্যা হতে চলে আসেন। তিনি মুফতী সাহেবের সামনে মহিলাদের তাবলিগে যাওয়ার উপকারিতা বর্ণনা করেন। প্রত্যেক মহিলাকে মাহরামের সাথে বের করা হচ্ছে। স্বামী, ছেলে, পিতা অথবা ভাই সাথে থাকতে হবে। যেখানে জামাত যাচ্ছে, তাদের আগেভাগেই সে সম্পর্কে অবগত করে দেয়া হয়। যাতে করে সেখানে গিয়ে জায়গাটি খালি করে আসে। যে যে স্থানে মহিলারা অবস্থান করেন, তারা সেই স্থানেই থাকেন। গ্রামবাসী জামাতের কাছে আসে। গাশত মহিলাদের মাহরাম ও স্থানীয় পুরুষরা মিলে করেন। এই পুরুষরা পুরুষদের সাথে কথা বলেন যে, আপনার মাসতুরাতকে অমুক ভাইয়ের ঘরে জামাতের কাছে পাঠিয়ে দেবেন। এই জামাতের নারীরা কোথাও যান না। পর্দার প্রতি পূর্ণ খেয়াল রাখা হয়। মুফতী সাহেব বর্ণনা শুনে পূর্ণ আশ্বস্ত হয়ে যান। যে জামাত মাসতুরাতের কাজ করে আসে, তারা হযরত মাওলানা ইউসুফ সাহেবকে কারগুজারী শুনাতেন।
সর্বপ্রথম ঘাসীরাহ ও নূহ এর আশপাশের এলাকাতে ৮ দিন জামাত সময় দিয়ে চলে আসে। আমি জামাতের সাথেই ছিলাম। যখন আটদিনের মধ্যে ফিরে আসি, তখন বড় হযরত খুব ক্ষিপ্ত হন। এত তাড়াতাড়ি কেন চলে এলে? আমি বলি, হযরত মহিলাদের কাপড়ের অভাব ছিল। তিনি বলেন, তুমি নূহ থেকে নতুন কাপড় বানিয়ে দিতে এবং ফিরে এসে আমার থেকে টাকা নিয়ে নিতে। আমি বলি, হযরত মশওয়ারাদাতারা বললেন, এটি প্রথম জামাত, তাদের আগ্রহের প্রতি লক্ষ রাখতে হবে। এ কারণে তাড়াতাড়ি চলে আসি। মশওয়ারার কথা শুনে হযরত অনেক খুশি হলেন এবং অনেক দোয়া করলেন। এ জামাত যখন ঘাসীরাহ ও অন্যান্য এলাকায় যায়, তখন হযরতজী চৌধুরীদের নামে পত্র লিখেন। আমি তোমাদের কাছে দিল্লির পর্দানশীল মহিলাদের পাঠাচ্ছি। তোমরা তাদের খুব ভালোভাবেই সাহায্য করবে। তারা অপেক্ষা করতে থাকেন। তারা ইস্তিকবালের জন্য রাস্তায় নেমে আসেন। জামাত পৌঁছার সাথে সাথে গ্রামবাসী বন্দুক চালিয়ে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইস্তিকবাল জানায়। তারা এই বলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে যে, মাসতুরাতের প্রথম জামাত আমাদের গ্রামে এসেছে। আমরা যেখানে গিয়েছি, সেখানেই এমনই ইস্তিকবাল হয়েছে। এরপর সামান্য বিরতি দিয়ে কয়েকটি জামাত বের হয়।
মেওয়াত থেকে জামাতের তাকাযা আসতে থাকে। মাসতুরাতের কাজ আনুমানিক ১৯৪২ সালে শুরু হয়। কেননা আমি ১৯৪১ সালে মারকাযে আসি। আমি মারকাযে আসার পর মাসতুরাতের কাজ আরম্ভ হয়। যদি হযরতের ইন্তেকালের ১০ বছর আগে শুরু হতো, তা হলে হিন্দুস্তানের অনেক জায়গাতেই মাসতুরাত জামাত পৌঁছে যেত। হযরতের জীবদ্দশায় মেওয়াত ছাড়া অন্য কোথাও জামাত বের হয়নি। (হিজরি ১০/০৩/১৪৩১ সালে হাজী বাশীর আহমাদ সাহেবের উদ্দেশ্যে লেখা মৌলভী দাউদ আঠাড়বী’র চিঠি অবলম্বনে, সূত্র: দাওয়াত ও তাজকিয়া)

মাওলানা দাউদ আঠাড়বী : তাবলিগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ইলিয়াস (রহ)-এর
সুযোগ্য ছাত্র। উর্দু থেকে অনুবাদ : আলেমা মারজিনা হারুন।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com