রবিবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২০, ০৪:৫৬ অপরাহ্ন

দেশ-বিদেশের মুসল্লিরা আসছেন তুরাগ তীরে: আ’ম বয়ান শুরু

টঙ্গী প্রতিনিধি: তাবলীগ নিউজ বিডি.কম:

টঙ্গীর তুরাগ তীরে তাবলিগ জামাতের ৫৫তম বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় দফা দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাযের শীর্ষ মুরুব্বিদের আ’ম বয়ানের মধ্যদিয়ে শুরু হওয়ার কথা ছিল শুক্রবার। কিন্তু একদিন আগেই বুধবার রাতে ময়দানে মুসল্লীদের ঢল নামে। তাই একদিন আগেই আজ বৃহস্পতিবার সকালে বম বয়ান শুরু হয়ে গেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ৮ হাজার সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত ৫ স্তরের নজিরবিহীন নিরাপত্তায় রয়েছেন।রোববার আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের বিশ্ব ইজতেমা। এ পর্বের প্রথমদিন শুক্রবারের জুমার নামাজেও লাখ লাখ মানুষ অংশ নেবেন ইজতেমা কর্তৃপক্ষের ধারণা।

এ পর্বেও মুসল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার্থে থাকছে বিশেষ ট্রেন ও বাস সার্ভিস। নেয়া হয়েছে নিরাপত্তা সার্বিক বিশেষ ব্যবস্থা। প্রথম পর্বের ন্যায় দ্বিতীয় পর্বেও থাকছে বিশ্ব ইজতেমার পুরো ময়দান সিসি ক্যামেরার আওতায়।

সরেজমিন দেখা গেছে, তুরাগ পাড়ের প্রায় ১৬৫ একরেরও বেশি এলাকার বিশাল প্যান্ডেলজুড়ে ইজতেমার মূল সামিয়ানায় ২য় পর্বে মুসল্লিদের অবস্থানের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। যাতে করে দেশ-বিদেশ থেকে আগত মুসল্লিরা অবস্থান নিয়ে ইবাদত-বন্দেগি করতে পারেন। সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি সাদ অনুসারী মুসল্লিরাও অংশ নিয়েছেন মাঠ প্রস্তুতের জন্য।

তারা সোমবার রাতে ময়দান খালি করে চলে যাওয়ার পর দিল্লীর নিজামুদ্দিন মারকাযের মাওলানা সা’দ আহমদ কান্ধলভী অনুসারী বাংলাদেশের শূরা সদস্য সৈয়দ  ওয়াসিফুল ইসলামের নেতৃত্বে শুক্রবার থেকে শুরু হচ্ছে ৩ দিনব্যাপী দ্বিতীয় দফার ইজতেমা। এ পর্বের ইজতেমায়ও আগত মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে ইমান আমলের ওপর তাবলিগ জামাতের শীর্ষস্থানীয় দেশি-বিদেশি বুজুর্গ আলেম মাওলানাগণ গুরুত্বপূর্ণ বয়ান করবেন। আজ বুধবার বাদ মাগরিব মাওলানা সা’দ আহমদ কান্ধলভী মনোনীত দিল্লীর নিজামুদ্দিন মারকাযের ৩২ সদস্যবিশিষ্ট একটি জামাত টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে এসে পৌঁছেছেন। এ জামাতের নেতৃত্বে রয়েছেন দিল্লীর নিজামুদ্দিন মারকাযের শূরা সদস্য মাওলানা আবদুস সাত্তার।

এ দফায়ও দেশের ৬৪টি জেলার কয়েক লাখ মুসল্লিসহ বিশ্বের প্রায় শতাধিক দেশের ১০ সহ¯্রাধিক মেহমান ইজতেমায় অংশগ্রহণ করবেন বলে জানিয়েছেন ইজতেমা আয়োজক কমিটি। রোববারের আখেরি মোনাজাতের মধ্যদিয়ে শেষ হবে দ্বিতীয় দফা তথা এবারের বিশ্ব ইজতেমা।  ইতোমধ্যে কনকনে শীত, ঘন কুয়াশা উপেক্ষা করে বুধবার থেকেই মুসল্লি¬রা দলে দলে জামাতবন্দি হয়ে তুরাগ তীরে সমবেত হচ্ছেন।


বিশ্ব ইজতেমার নিয়ম অনুসারে শুক্রবার বাদ ফজর আম বয়ানের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক বয়ান শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বুধবার ইজতেমার দায়িত্বে নিয়োজিত মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে বিশেষ বয়ান (নজমের বয়ান) করেন ভারতের মাওলানা মুফতি রিয়াজুর রহমান। তিনি তার বয়ানে, আগত মুসল্লিরা যাতে কষ্ট না পায়, তাদের যাতে কোনো প্রকার সমস্যা না হয় সে দিকে নজর রাখার জন্য তিনি ইজতেমার দায়িত্বে নিয়োজিত সাথীদের আহবান জানান।

তুরাগ নদে পারাপারের জন্য সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় প্রথম পর্বের আগেই ভাসমান ব্রিজ তৈরি মোতায়েন রয়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য র‌্যাব-পুলিশের পক্ষ থেকে ২য় পর্বেও পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, সিসিটিভি রয়েছে। বিদেশিদের জন্য থাকছে আগের আলাদা স্বাস্থ্য ক্যাম্পও। বিদেশি নিবাসে গ্যাস সংযোগ ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা প্রথম পর্বের ন্যায় এ পর্বেও থাকছে।

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম মঙ্গলবার রাতে মাঠ পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, সরকার মুসল্লিদের সুবিধার্থে ইজতেমা মাঠে ব্যাপক উন্নয়ন করেছে। এর মধ্যে ১৩টি নলকূপের মাধ্যমে প্রথম পর্বের ন্যায় দ্বিতীয় পর্বেও প্রায় সাড়ে ৩ কোটি গ্যালন খাবার ও ওজু-গোসলের পানি সরবরাহ করবে। ৮ হাজারের বেশি মুসল্লি একসঙ্গে টয়লেট ব্যবহার করতে পারবে।

তিনি আরও বলেন, দেশ-বিদেশের ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা প্রথম পর্বের ন্যায় এ পর্বেও তারা সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে সব সুযোগ-সুবিধা পাবেন। আমরা তাদের অবস্থানের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছি। বৃহস্পতিবারের মধ্যেই মুসল্লিরা ইজতেমা মাঠে অবস্থান নিতে পারবেন।

বিশ্ব ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের সুবিধার্থে ইজতেমা ময়দানের পাশে নিউ মন্নু ফাইন কটন মিলে স্থাপন করা হয়েছে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প। এ সব মেডিকেল ক্যাম্প থেকে ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের স্বাস্থ্যসেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেয়া হচ্ছে বিনামূল্যে।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ মো. আনোয়ার হোসন বলেন, দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমায় ইতিমধ্যে অধিকাংশ মুসল্লিরা আসছেন। এ পর্বের বিশ্ব ইজতেমায়ও প্রথম পর্বের মতো পুলিশ কাজ করছে। ইজতেমায় সার্বিকভাবে সফল ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার জন্য গত পর্বের তুলনায় এ পর্বে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে।

তিনি বলেন, খিত্তায় খিত্তায় সাদা পোশাকের পুলিশ মোতায়েনসহ পুরো ময়দান সিসিটিভি ও ওয়াচ টাওয়ারের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ইজতেমার প্রবেশ পথগুলোতে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এসএম তরিকুল ইসলাম বলেন, সোমবার রাতে মাওলানা যোবায়ের অনুসারীদের নিকট থেকে মাওলানা সাদ অনুসারীদের নিকট মাঠের সব দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হয় আনুষ্ঠানিকভাবে। এ সময় সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও ইজতেমার দু’পক্ষের মুরুব্বীরাও উপস্থিত ছিলেন।

তাবলীগের সাদপন্থী মুরুব্বী সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম জানান, দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমায় পুরো ময়দানকে ৮৩টি খিত্তায় ভাগ করা হয়েছে। ইজতেমা ময়দানে আগের পর্বের মুসল্লিদের ফেলে যাওয়া ময়লা, আবর্জনা তথা নোংরা এবং মাঠে জমে থাকা পানি নিষ্কাশন করে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের কর্মীদের সঙ্গে তাবলিগের কর্মীরা মাঠকে ব্যবহার উপযোগী করেছে।

নিজামুদ্দিন মারকাযের ৩২ সদস্যবিশিষ্ট জামাত ময়দানে : ইজতেমা দ্বিতীয় দফার গণমাধ্যম সমন্বয়কারী মো. সায়েম জানান, মাওলানা সা’দ আহমদ কান্ধলভী মনোনীত দিল্লীর নিজামুদ্দিন মারকাযের ৩২ সদস্যবিশিষ্ট একটি জামাত আজ বাদ মাগরিব টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে এসে পৌঁছেছেন। এ জামাতের নেতৃত্বে রয়েছেন দিল্লীর নিজামুদ্দিন মারকাযের শূরা সদস্য মাওলানা আবদুস সাত্তার। জামাতের অপর সদস্যরা হলেন- মাওলানা শামীম আহমেদ, মাওলানা জামশেদ, মাওলানা মিয়াজী আজমত উল্লাহ, মাওলানা মুফতি শেজাত, মাওলানা রিয়াজুর রহমান, মাওলানা ইকবাল হাফিজ প্রমুখ। মুরুব্বিদের জামাতকে এস্তেকবাল (অভ্যর্থনা) জানান বাংলাদেশের শূরা সদস্য সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম ও মুফতি ইজাহার আহমেদ।

দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমা সফল করতে বিভিন্ন জামাত তৈরি: দ্বিতীয় পর্বের বিশ্ব ইজতেমা সফল করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন জামাত তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। তারা তাদের জন্য নির্ধারিত কর্মসূচি সূচারুরূপে পালন করছেন। ময়দানের নজমের দায়িত্বে রয়েছে প্রকৌশলী শাহ মো. মুহিব্বুল্লাহসহ ১৩ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি। পানি ও গ্যাসের জামাতে রয়েছেন মো.আসাদ্জ্জুামানসহ ৯জন, বিদ্যুতের জামাতে রয়েছেন প্রকৌশলী সুজাত আলীসহ ১৬জন, মাইকের জামাতে রয়েছেন আফজাল হোসেন মোল্লাসহ ৭জন, নিজামুদ্দিনের মুরুব্বিদের জামাতে রয়েছেন ডা: নাফিজসহ ৫জন, বিদেশি খিমার নজমের জামাতে রয়েছেন মাওলানা বোরহানসহ ৬জন, আন্তুর্জাতিক শূরার জামাতে রয়েছেন প্রফেসর আবদুল হান্নানসহ ৩জন এবং বিদেশি মেহমানদের খেদমতের জামাতে মাওলানা সাইফুল্লাহসহ ৫জন নিয়োজিত রয়েছেন।

দেশি-বিদেশি মুসল্লিদের প্রতিক্রিয়া: যাত্রাবাড়ি থেকে আসা আবুল হোসেন (৬৫) বলেন, জামাতবন্দি হয়ে ইজতেমায় এসেছি আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের আশায়। আখেরি মোনাজাত শেষে আবার চিল্লার জামাতে বের হয়ে যাব, ইনশাআল্লাহ। গাজীপুর থেকে আসা আবদুর রশীদ (৬০) বলেন, ইজতেমায় অংশগ্রহণ করতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে হয়, তাই যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিনই ইজতেমায় অংশগ্রহণ করবো।

ইন্দোনেশিয়া থেকে আসা বিদেশি মুসল্লি মো. সামসুল আরেফিন (৫৫) জানান, প্রথম চিল্লা (নির্দিষ্ট সময়) বাংলাদেশ ও ২য় চিল্লা ভারতে তাবলীগের দাওয়াতের কাজ করে ইজতেমায় এসেছি। আল্লাহকে রাজি খুশি করতে পারলে জিন্দিগী ও আখিরাত সহজ হবে। আখেরি মোনাজাতের পর আবার তৃতীয় চিল্লায় দাওয়াতী কাজে বেরিয়ে যাব।

ইজতেমা আয়োজক কমিটির শীর্ষ মুরুব্বি প্রকৌশলী শাহ মো. মুহিবুল্লাহ জানান, ইতোমধ্যে ইজতেমা ময়দানের প্রস্তুতির কাজ প্রায় ৯০ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি টুকিটাকি যা আছে তা বৃহস্পতিবার সকালের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। ইজতেমার আয়োজক তাবলিগ জামাতের স্বেচ্ছাসেবীদের প্রস্তুতি ছাড়াও ডেসকো, তিতাস, ওয়াসাসহ সরকারের সেবাদানকারী সংস্থাগুলো তাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। ১৯ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্যদিয়ে শেষ হবে মাওলানা সা’দ অনুসারিদের তিনদিনের বিশ্ব ইজতেমা।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com